কারণ, এর আগে, কখনোই ওদের সামনে অন্য জগৎগুলোর দুয়ার খুলে যায়নি।
দৃশ্যটা এক সেকেন্ডেরও কম সময় ধরে চলল। এর পর ও একটা অনিচ্ছাকৃত পলক ফেলার সাথে সাথেই মিলিয়ে গেল ভোজবাজীর মতো। না। না। হতে পারে না।
ভ্যাসিলি অর্লোভ একটা আকাশ দেখছিল-নাকি একটা এলাকা-হবে কিছু একটা, যাই হোক, দেখেছিল। দেখছিল তারায় ভরা এক জগৎ। না, সূর্যে ভরা। সূর্যে ভরা একটা নীহারিকার মাঝখান। এক কসমিক জোট! ঠিক ঐ মুহূর্তেই ভ্যাসিলি অর্লোভ চিরদিনের মতো পৃথিবীর নীল আকাশকে হারিয়ে ফেলল। ঠিক এখন থেকে ওরা হয়ত অসহ্য আর অসহ্য সব একাকীত্বে, অসহ্য সব শূন্যতায় হারিয়ে যাবে। এমনকি স্করপিও বা বৃশ্চিক নক্ষত্রমালা আর অরিওন এর নিপ্রভ আলোর দিকে বহুকাল তাকিয়ে থাকা যায়। কিন্তু এদিকে…এদিকে একটা মুহূর্তের বেশি নয়। না। ভ্যাসিলি অর্লোভ যদি বেঁচে থাকে, তাহলে সবাইকে জানিয়ে দেবে কেন ডেভ বোম্যান বলেছিল সেই বুক কাঁপানো কথা।
মাই গড! আমার সামনেটা তারায় তারায় ভরা!
ও যখন চোখদুটো খুলতে সাহস পাচ্ছে না তখন আর কিছুই নেই। অবশ্য পুরোপুরি নয়। আবার ঠিক হওয়া পাথুরে কালচে জিনিসটার উপর এক ম্লান সূর্য জ্বলছে এখনো।
কিন্তু ও দেখে থাকলেও একটা সূর্যের পক্ষে নড়াচড়া করা সম্ভব না। আবারো পলক ফেলে নিজের ভেজা চোখটাকে পরিষ্কার করে নিল সে। ঠিক, নড়াচড়া আসলেই হয়েছে। কল্পনা করেনি।
উল্কা নাতো? চিফ সায়েন্টিস্ট ভ্যাসিলি অর্লোভ বিবশ হয়েছিল এত বেশি সময়ের জন্য যে, এটুকুও মনে করতে পারেনি বায়ুশূন্য আকাশে উল্কা পিণ্ড পড়া অসম্ভব। যে কোনো পাথুরে মহাকাশের বস্তু বাতাসের সাথে ঘষা লেগেই উল্কা হয়ে জ্বলতে জ্বলতে পড়ে যায়। জ্বলতে জ্বলতে পড়ে যায়, কিন্তু নিচেই জন্মে না। ওটা আরো হাজারটা সূর্যের সাথে বিগ ব্রাদারের মুখে দেখা দিয়ে নিচেই ঘোরাফেরা করছে একা একা।
একবারের জন্য মলিন হয়ে গেল হালকা আলো হয়ে। আর হৃদপিণ্ডের কয়েকটা ধ ধক্ যেতে না যেতেই হারিয়ে গেল বৃহস্পতির পেছনে।
ভ্যাসিলি একজন শক্ত স্নায়ুর মহাকাশচারী। এর মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে নির্লিপ্ত একজন দর্শক বনে গেল সে।
ওর এর মধ্যেই এ জিনিসটার যাত্রাপথ বোঝা হয়ে গেছে। না। অসম্ভব। ওটা যাচ্ছে পৃথিবীর দিকে।
এক নক্ষত্র শিশু
পঞ্চম পর্ব : এক নক্ষত্র শিশু
৩০. আবার আসিব ফিরে
ও যেন একটা স্বপ্ন দেখে উঠল মাত্র। অথবা একটা স্বপ্ন ক্ষেত্রে বসে স্বপ্নের ভিতর দেখছে স্বপ্ন। তারার রাজ্যের দরজাটা ওকে আবার ফিরিয়ে এনেছে মানুষের জগতে। কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়।
কতদিন ও দূরে ছিল? এক জীবন, নাকি দু জীবন? দু জীবনই। একটা সামনের দিকে এগিয়ে চলতে গিয়ে হারিয়ে যায় অন্যটা ফিরে এসে। ডেভিড বোম্যান হিসেবে-ইউনাইটেড স্টেটস স্পেসশিপ ডিসকভারির একমাত্র ক্রু ও অধিনায়ক হিসেবে ও আটকা পড়েছিল এক বিশাল, অপ্রতিরোধ্য ফাঁদে। ত্রিশ লক্ষ বছর আগে পাতা ফাঁদ। যে ফাঁদ শুধু সময়েই কার্যকর হবে। সঠিক সময়ে।
সে একের পর এক জগতে পরে গেছে এর মধ্য দিয়ে। পতন আর পতন। মিলিত হয়েছে সেসব আশ্চর্যজনক ঘটনার সাথে, সৃষ্টির সাথে, বিস্ময়ের সাথে যার কিছু কিছু বোঝে, আর কিছু বোঝে না। হয়ত কোনোদিনই বুঝবে না।
চির ত্বরণের গতিতে দৌড়ে চলে। এক অসীম আলোর গুহাপথ ধরে। নিজেই একটা আলো না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত চলেছে ছুটে। ও জানতো এটা অসম্ভব। কিন্তু আজ জানে কীভাবে সম্ভব। আসলেই আইনস্টাইন ঠিক ঠিক বলেছিলেন, মহান কর্তা রহস্যময় হতে পারেন, ঝগড়াটে নন।
সে এক মহাজাগতিক সুইচিং পদ্ধতির ভিতর দিয়ে গড়িয়ে গেছে তখন। এক বিশাল, অকল্পনীয় মহিমাময় জায়গার ভিতর দিয়ে-যেটা সবগুলো নীহারিকার কেন্দ্র। আবার বেরিয়েও এসেছে কোনো এক অজানা শক্তির দ্বারা রক্ষিত হয়ে। শক্তিটা কোনো লাল দানো নক্ষত্রের চারধার ছেয়ে ফেলতে পারে।
ও বিপরীত বৈশিষ্ট্যের সূর্যোদয়ও দেখেছে ওখানে, যখন ঐ উদিত হতে থাকা নক্ষত্রের সাদা বামন৩১ সাথী তারাটা আকাশে উঠে আসে। উঠে আসে ওর নিচের নক্ষত্রের গায়ে বিরাট আগুন উচ্ছ্বাস নিয়ে। আগুন জোয়ার হয় সাঁদা বামনেরই আকর্ষণে। ওর কোনো ভয় নেই। শুধু অবাক করা কল্পনা। এমনকি যখন নিচের আগুন খনির দিকে স্পেস পোডটা ওকে টেনে নেয় তখনো…
…থাকার জন্য একটা দারুণ হোটেল স্যুট ছিল যাতে প্রাত্যহিক কিছুরই অভাব নেই। এর প্রায় সবটাই মেকি। শেলফের বইগুলি ডামি। আইস বক্সের সব খাবারের কার্টন আর বিয়ারের ক্যানগুলোয় বিখ্যাত বিখ্যাত সব কোম্পানীর নাম লাগানো থাকলেও ছিল একই রকম তরল খাবারে ভর্তি। গন্ধটা যেমন তেম্নি স্বাদটাও অপূর্ব!
ডেভ বোম্যান কোনোকালেই বোকা ছিল না। দ্রুত বুঝতে পারল কোনো হোটেল স্যুট নয় বরং একটা মহাজাগতিক চিড়িয়াখানায় ও সামান্য এক নমুনা। বন্দীখানাটা খুব যত্নে গড়া। সমস্যা অন্য কোথাও। ওর জন্য এটা তৈরি করা হয়েছে ওরই দেখা এক টিভি প্রোগ্রামের বিলাসবহুল কোনো এক হোটেল কামরা থেকে। এবং বানানো হয়েছে ওর কল্পনা থেকে নিয়ে। ওর বইয়ের না পড়া পাতাগুলো সাদা আর পড়া পাতাগুলো লেখায় ভরা! তার মানে স্মৃতিতে যা আছে তা নিয়েই জগত গঠিত। ভয় ছিল একটাই। যারা আটকে রেখেছে তারাতো আসবে-কিন্তু কোন রূপে?
