তবু নাক গলানোটা সার্থক-এর পেছনের উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন। যদি দুর্বলতা হয়েও থাকে, তবু এ হাস্যকর কাহিনীর পিছনে অন্য এক অপরাধী মনকে খুঁজে পাওয়া যাবে সহজেই। এটা ঐ চিরন্তন গুপ্ত হিংসা যা প্রত্যেকেই করে-সম অথবা বিপরীতকামী; সত্যি বলতে গেলে-ফ্লয়েড বুঝতে পারে, ব্যাপারটা বিভিন্নমুখী সমস্যা নিয়ে দারুণভাবে এগিয়ে আসছে সামনে।
ওর আঙুল আবার রেকর্ডারের দিকে ফিরে যায় কিন্তু চিন্তার ধারাটা ভেঙে গেছে এর মধ্যেই। মেঘের মতো ঘনিয়ে আসে পরিবারের খণ্ড খণ্ড ছবিগুলো। ঠেকানো যায় না। চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে স্মৃতি ক্রিস্টোফারের জন্মদিনটাকে ডেকে আনল। বাচ্চাটা কেকের তিন মোমবাতি নেভাতে চাইছে। স্মৃতিটা চব্বিশ ঘন্টার পুরনোও নয়। শুধু শত শত কোটি মাইল দূরের। ও এতবার ভিডিওটা চালিয়েছে যে এখন প্রতিটা নড়াচড়াই মুখস্থ।
আচ্ছা, ক্রিস যেন বাবাকে ভুলে না যায় সে উদ্দেশ্যে ক্যারোলিনা কতবার ওর মেসেজটা প্লে করেছে? নাকি পরের জন্মদিনে যখন ফিরবে তখন ক্রিসের কাছে ও একজন অপরিচিত লোক ছাড়া আর কিছুই হবে না? জিজ্ঞাসা করতেও ভয় পাচ্ছে ফ্লয়েড।
ক্যারোলিনকে ও ঠিক দোষও দিতে পারে না। হাইবারনেশনের কারণে ফ্লয়েডের মনে হয় মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই ক্যারোলিন ছিল ওর কাছে। আর জগৎগুলোর মাঝে ও স্বপ্নহীন ঘুম কাটানোর সময় মেয়েটা দুটা দীর্ঘ বছর পার করে বসেছে। একজন নতুন বিধবা হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ এক লম্বা সময়; অন্তত ক্ষণিকের জন্য।
ভয় হচ্ছে খুব, একদিন হয়ত পৃথিবীতে নেমে যাব কোনো একটা শিপে করে-ফ্লয়েড কখনো এত হতাশায় পড়ে না, ভেঙে গেলে, হেরে গেলেও না-তারপর দেখব সময় আর দূরত্বের সাগরে কোথায় ভেসে গেছে আমার ঘরবাড়ি! হয়ত হারিয়েই বসেছি নিজের অজান্তে। মিশনে আমার ব্যর্থতার পর…অথবা যদি লক্ষ্যে যেতেও পারি, তবু সামনে কী পাব? কালো, নিরেট কালো একটা দেয়াল।
আর এখনো ডেভিড বোম্যানের সেই চিৎকার সবার মনে, মাই গড! আমার সামনেটা তারায় ভরা!
২৯. জরুরি
শাসা শেষবার কর্তৃত্ব ফুটিয়ে ঘোষণা করল:
রাশলিশ বুলেটিন # ৮
বিষয়: টোভারিশ (টোরিশ২৭)
আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের প্রতি:
সত্যি, বন্ধুরা, আমার মনে নেই শেষ কবে আমাকে এভাবে ডাকা হয়েছিল। একুশ শতকের যে কোনো রাশিয়ানের কাছেই যুদ্ধযান পটেমকিন এক স্মৃতি জাগানিয়া নাম। লাল জামা-টুপি আর একই সাথে স্লাদিমি ইলেচের লম্বা বক্তব্যের স্মৃতি। এটা তিনি রেলওয়ের শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে দিয়েছিলেন।
যদিও আমি ছোট ছিলাম, তবু এটা ছেলেখেলা নয়, নয় দ্রুজহক-যাই মনে কর না কেন-তোমাদের ব্যাপার। তোমরা সাদরে আমন্ত্রিত।
কমরেড কোভালেভ।
ফ্লয়েড তখনো পড়তে পড়তে মুচকে হাসছিল যখন ভ্যাসিলি অর্লোভ লাউঞ্জ অথবা
অবজার্ভেশন ডেক থেকে ভেসে এসে ওর সাথে যোগ দেয়।
আমার অবাক লাগছে কী ভেবে জান? টোভারিশ! ইঞ্জিনিয়ারিং আর পদার্থবিদ্যা পড়া ছাড়া আর কিছু করার বা পড়ার সময় পেয়েছে কীভাবে ও? সারাক্ষণই নাটক আর কবিতা থেকে কোটেশন নিয়ে কথা বলে। আমার সন্দেহ ও হয়ত ওয়াল্টারের মতো ইংরেজিও বলতে পারবে।
কারণ ও প্রবেশ করেছে বিজ্ঞানের জগতে। শাসা হল-তুমি ওকে কী বলবে?-পরিবারের গর্ধভ? ওর বাবা ছিলেন নোভোসিবিরস্ক এর একজন ইংরেজির অধ্যাপক। বাসায় একটা পাগলাটে নিয়মও ছিল। সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত বাসায় রাশিয়ান চলবে। বৃহস্পতি, শুক্র আর শনিবারে ইংরেজি।
আর রবিবার?
আর বলো না! ফ্রেঞ্চ অথবা জার্মান। বিকল্প সপ্তাগুলোও ভয়াল।
এবার বুঝলাম নিকোলটোনি দিয়ে তোমরা আসলে কী বোঝাও। ঠিক একটা গ্লাভের মতো খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। আসলেই কি শাসা ওর নিজের…দুর্বলতার কারণে হীনমন্যতায় ভোগে? আর এমন একটা ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও কেন ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেল?
নোভোসিরভিস্ক পড়লে জানতে পারতে কারা সার্ফ আর কারা অ্যারিস্টোক্রেট। শাসা ছিল এক তরুণ উচ্চাকাতক্ষী। তার আরো একটা প্রাস পয়েন্ট-মেধা।
ঠিক তোমার মতো, ভ্যাসিলি।
এট টু টে! ফাজলামি করো না। তবে ঠিক, আমি শেক্সপিয়র বলতে পারি যেমন পারি বোহে মোয়ি! কিন্তু আবার কী হল?
ফ্লয়েড দুর্ভাগা-বেচারা অবজার্ভেশন উইন্ডোর ভিতরে ভাসতে ভাসতে ঢুকে পড়েছে। তাও ভাল, শুধু পেছনটা! আর কথা বলায় এত বেশি মজে গেছে যে টেরই পায়নি। ব্যাপারটা হাস্যকর। অন্তত ফ্লয়েড ভাবল ওর ক্ষেত্রেও একবার হল হাস্যকর ঘটনা। যথারীতি এটা ছড়িয়ে দেয়ার মহান দায়িত্বটা নিজ থেকেইে কাঁধে নিয়ে নেবে ভ্যাসিলি।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরে যখন মুচড়ে ভেতরে ঢুকল ও, অবজার্ভেশন উইন্ডোর ভিতর দিয়ে দেখা যায় বৃহস্পতির বিরাট বৃত্ত। কিন্তু ওটা কোনো ঘটনা না। ঘটনা
অন্য কোথাও। বৃহস্পতির আলোয় বিগ ব্রাদারকে দেখা যাচ্ছে। কেন যেন একটা হিম স্রোত বয়ে গেল ওর শিরদাঁড়া বরাবর। অকারণেই ফ্লয়েড ভাবল একটা কথা।
ওরা আসার পর এই প্রথম বিগ ব্রাদার তার সক্রিয়তা দেখালো। এই প্রথম। এবং শুরু।
হয়ত ভ্যাসিলির স্মৃতিতে চিরদিনের জন্য এটা বসে গেছে। ঐ তীক্ষ্ণ ধারওয়ালা জিনিসটা দেখে একেবারে অন্যরকম, অতিমানবীয় অনুভূতি হচ্ছে যেন। অনুভূতিটা আসলেই ভয়াল হওয়ার কথা। কারণ ওরা মানুষ। আর মানুষের একটা অদ্ভুত গুণ হল, যা না বোঝার, তাও কেমন করে যেন বুঝে যায়। তবু ওরা বোঝেনি অনুভূতিটা কীসের।
