আরো অদ্ভুত ব্যাপার হল, চন্দ্র যদি কোনো এয়ারলকে ঢুকে যায় অথবা স্মোক ডিটেক্টর বন্ধ করে দেয় তবু কেউ কিছু মনে করে না। কিন্তু ওর সবচে বড় লজ্জা ছিল নিজের ভিতর। ওর একটা অতি সাধারণ মানবিক দুর্বলতা আছে। এটাও হয়ত হালের সাথে যোগাযোগ করে আগের চেয়ে বেশি সময় কাটিয়ে দেয়ার একটা কারণ; সিগার থেকে দূরে থাকা যায়, দূরে সরা যায় আমাদের ঠাট্টা থেকেও।
ফ্লয়েড পজ বাটন চেপে রেকর্ডিং বন্ধ করল। চন্দ্রকে নিয়ে এভাবে মজা করাটা উচিত না। কোনো একদিন এমন কিছু হয়েছে-তবু কাজটা ঠিক না। শেষ কয়েক সপ্তায় ভেসে ওঠা শুরু করে সবার ব্যক্তিত্বের ছোটখাট মজার দিকগুলো। এমনকি কোনো আসল কারণ ছাড়া কয়েকটা ঝগড়াও হয়ে গেছে। এসব দিক থেকে ভাবলে ওর নিজের আচরণ সম্পর্কে কী বলা যায়? এটা কি সব সময় সমালোচনার উর্ধ্বে?
ও এখনো ঠিকভাবে বলতে পারবে না আদৌ কার্নোর সাথে ঠিক ব্যবহার করতে পেরেছে কিনা। কখনোই ঐ বিরাট ইঞ্জিনিয়ারকে অথবা ওর জোর গলাটা ভাল লাগেনি কিন্তু ইদানীং যে ব্যবহার করে তা ঠিক সম্মান দেয়ার ধারে কাছে নেই।
পলিয়োস্কো পলির মতো বিখ্যাত ব্যাপারগুলো হাসি-ঠাট্টায় ভোলার কারণে ওকে রাশিয়ানরা সম্ভবত একদমই পছন্দ করে না। এসব ব্যাপার প্রায়ই কান্নায় শেষ হয়। আর একটা ব্যাপারে ফ্লয়েড অনুভব করল যে ভালবাসা বেশ খানিকটা দূরেই সরে গেছে এ কদিনে।
ওয়াল্টার, ও সতর্কভাবে শুরু করে সেদিন, মনে হয় না এটা আমার কাজের মধ্যে পড়ে, তবু একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার তোমার সামনে তুলতে চাচ্ছি।
কেউ যখন আগেভাগেই বলে তার ব্যাপার না-প্রায় সব সময়ই সে ঠিক। সমস্যাটা কী?
আসলে, ম্যাক্সের সাথে তোমার ব্যবহার…
একটা জমাট নিরবতা চারদিকে। ফ্লয়েড নৈঃশব্দের একপ্রান্ত ধরে রেখেছে দেয়ালের বিশ্রী পেইন্টিংটার দিকে তাকিয়ে থেকে। এরপর কার্নো এখনো নরম থাকা সুরে বলল, ওর বয়স আঠারোর বেশি ভেবে আমি আসলে অবাক হয়েছিলাম।
ব্যাপারটাকে ঘোলা করোনা। আর খোলাখুলিই বলি, ম্যাক্সের ব্যাপারে না, আমি ভয় পাচ্ছি…জেনিয়াও জড়িয়ে গেল।
কার্নোর ঠোঁটদুটো হঠাৎ চেপে বসেছে। বোধহয় ও অবাক এ কথায়, জেনিয়া? ওর আবার আমাদের সাথে কী দরকার?
যে কোনো বুদ্ধিমানের কাছেই তুমি সহজে হজম হয়ে যাবে-বোকাও বনে যেতে পার। জানো নিশ্চই-ও ম্যাক্সকে ভালবাসে। ম্যাক্সকে জড়িয়ে ধরার সময় কীভাবে তাকিয়েছিল তোমার মনে নেই?
ফ্লয়েড কখনো ভাবেনি কার্নোকে অবাক চোখে তাকাতে দেখবে। আঘাতটা বোধ হয় বেশি হয়ে গেল, জেনিয়া? আমি মনে করেছি প্রত্যেকেই ঠাট্টা করে। ও একটা ছোট ইঁদুরছানা ছাড়া কি না। আর প্রত্যেকেইতো ম্যাক্সের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। এমনকি বিশালদেহী ক্যাথেরিনাও। তবু…হু, আমার মনে হয় আরেকটু সচেতনভাবে চলাফেরা করলেই আমার ভাল হয়। অন্তত জেনিয়া আশপাশে থাকার সময়।
সামাজিক তাপমাত্রা সাধারণ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একটা লম্বা বিরতি ঝুপ করে নেমে এসেছিল। কোনো অসুস্থ অনুভূতি নেই যে সেটা প্রমাণ করতেই কার্নো কথাবার্তার ঢঙে বলল, তুমিতো জানো, মাঝেমধ্যেই আমি জেনিয়াকে দেখে অবাক হতাম। কেউ একজন ওর মুখে প্লাস্টিক সার্জারির দারুণ কাজ দেখিয়েছে। কিন্তু সবটা ঠিক করতে পারেনি। চামড়া দারুণ টানটান। আর মনেও করতে পারব না কখনো ওর একটা পরিপূর্ণ হাসি দেখেছি কিনা। এজন্যেই বোধ হয় ওর দিকে না তাকানোর চেষ্টা করেছি সব সময়। তুমি কি আমাকে এটুকু সৌন্দর্যে অভিভূত মানুষের মর্যাদা দেবে, হেউড? ওর জন্যে হিংসায় পড়ে আমি ম্যাক্সের সাথে…
পুরোপুরি অন্যরকম ডাক, হেউড টা প্রাতিষ্ঠানিকতা বহন করে। হিংস্রতার বদলে ভদ্রতাই উঠে আসছে ওর তরফ থেকে। ফ্লয়েড নিজেকে একটু সহজ করে নিল, আমি তোমার কয়েকটা আগ্রহের জবাব দিতে পারি-ওয়াশিংটন জানে ব্যাপারটা। বোঝা যায় যে, ও কোনো ভয়ানক এয়ারক্রাশে পড়েও বেঁচে গেছে। এখানে কোনো রহস্যই নেই-যতটুকু আমরা জানি। কিন্তু আজকাল এয়ারক্রাফটে দুর্ঘটনা হওয়ার কথা না।
বেচারি। ওকে স্পেসে আসতে দিয়েছে এটাই আমার প্রথম প্রথম অবাক লাগত। তবু ইরিনার অ্যাক্সিডেন্টের পর একমাত্র ও ই ছিল যোগ্য মানুষ। ওর জন্য দুঃখ হয় আমারো। শারীরিক আঘাতের চেয়ে মানসিক কষ্টটা নিশ্চই বেশি ভয়ংকর।
আমিও নিশ্চিত। কিন্তু এর মধ্যেই কাটিয়ে উঠেছে পুরোপুরি। তুমি পুরো সত্যিটুকু বলছ না-ফ্লয়েড বলছে মনে মনে নিজেকেই, আর কখনোই কাউকে বলবে না। বৃহস্পতির মুখোমুখি হওয়ার পর তাদের সবার মধ্যে একটা বন্ধন গড়ে ওঠে। হয়ত ভালবাসার না-হয়ত শুধু একটু কোমলতা। কিন্তু এর মূল্যই মাঝে মধ্যে অমূল্য। হঠাৎ করেই ও কার্নোর প্রতি নরম হয়ে গেছে-বুঝতে পারে। কার্নোও জেনিয়ার জন্য নিজের উদ্বেগটার কথা ভেবে আশ্চর্য। তবু এটা নিয়ে নিজের কথার পক্ষে কিছু দাঁড় করাচ্ছে না কেউ।
কিন্তু ফ্লয়েড যুক্তি দেখালে বোধহয় ভুল হত না। কয়েকদিন পর ফ্লয়েড নিজেই ভাবতে বসে; ওর আচরণে জেনিয়ার প্রতি নরম মনোভাব বোঝা যায় না তো? কার্নো রেখেছে নিজের ওয়াদা। আসলেই প্রথমে না জানলে যে কেউ ভাববে যে জেনিয়া আশেপাশে থাকায় ও ম্যাক্সকে অবহেলা করে। ও জেনিয়াকে একটু বেশি ভালভাবেই নিচ্ছে। আসলেই বেশ কিছু সময়ে ও মেয়েটাকে জোরে হাসিয়ে ছাড়ে।
