বোঝার সহজ পথ আছে একটা। আস্তে ধীরে আমাদের তাই করতে হবে। নিনাকে সরাসরি এগিয়ে গিয়ে ওটাকে ছুঁতে হবে।
এর মধ্যেই করে ফেলেছে।
কী বলতে চাও? ক্ষেপে গিয়ে প্রশ্ন করল কার্নো, আমি ওটাকে কন্ট্রোল করছি। আর পাঁচ মিটারের মধ্যে নিইনি।
তোমার ড্রাইভিং ক্ষমতাকে ছোট করে দেখছি না-কিন্তু এটা প্রথম বারের হিসাবে খুবই কাছাকাছি ছিল। আর পাঁচ মিটার খুবই কম, ঠিক না?
মানে?
কাছাকাছি থাকার সময় প্রতিবার প্রাস্টার ছাড়ার পর এটা জাগাদকায় ধাক্কা খেয়েছে-হয়তো।
একটা মাছি হাতির গায়ে টোকা মেরেছে?
সম্ভবত। সোজা কথায় আমরা জানি না। কিন্তু ভাল হয় কী করলে জানো? আমরা এখনো এর থেকে দূরে দেখেই ও-ও আমাদের সহ্য করছে। কিন্তু আমাদের গাধা বানানো পর্যন্ত অপেক্ষা করবে…মনে হয়।
ও না বলা প্রশ্নটা ঝুলিয়ে রাখল বাতাসেই। এর আগে কীভাবে একজন মানুষ প্রায় এমন একটা আয়তাকার স্ল্যাবকে বিরক্ত করেছিল? আর এদের রাগটা ঠিক কীভাবে প্রকাশ পায়?
২৫. ল্যাগ্রেন্স থেকে দেখা
এস্ট্রোনমি সব সময়ই এসব অদ্ভুতুড়ে আর অর্থহীন হঠাৎ ঘটা ব্যাপার স্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায়। এর মধ্যে সবচে বিখ্যাত যেটা সেটা নিয়ে সবাই কোনো না কোনো তত্ত্ব দাঁড় করাতে চেয়েছে। আবার অনেকেই বলেছে যে এটা হঠাৎ ঘটা ঘটনা। পৃথিবীর তের লক্ষগুণ বড় সূর্য আর পঞ্চাশ ভাগেরও এক ভাগ চাঁদ। কিন্তু এ দুটোকেই পৃথিবী থেকে একেবারে একই ব্যাসের দেখায়।
এই এখানেও, এল ওয়ান মুক্ত বিন্দুতে যেখানটাকে বিগ ব্রাদার তার মহাজাগতিক বস্থানের জন্য বেছে নিয়েছে সে জায়গাটা বৃহস্পতি আর আইওর মাঝের মাধ্যাকর্ষণের সবচে পোক্ত জায়গা। আর মজাটা হল, এখানে এই গ্রহ আর উপগ্রহ দুটো ঠিক একই রূপ নিয়ে দেখা দেয়। একই ব্যাসার্ধে।
কী দারুণ আকৃতি! সূর্য আর চাঁদের আধ ডিগ্রি বিস্তৃতি নয়, বরং তাদের ব্যাসের চেয়ে চল্লিশ গুণ বড়। আর আর এলাকার হিসাব রাখলে তা মোলশ গুণ। এই আকৃতিটা মনকে ভয় আর বিস্ময়ে ডুবিয়ে দিতে যথেষ্ট। দৃশ্য একেবারে অপার্থিব।
বেয়াল্লিশ ঘণ্টা পর পর ওরা পর্যায়ের একটা চক্র পূর্ণ করে। এ চক্রটার শুরু ধরা যায় যখন বৃহস্পতি পূর্ণ আর আইও নতুন-সে অবস্থা থেকে। অথবা উল্টো। যখন গ্রহটা সূর্যকে ঢেকে ফেলে তখন এর রাতের অংশই শুধু দেখা দেয় কালো চাকতি হয়ে রাতের নক্ষত্রদের পরাজিত করে দিয়ে। মাঝে মাঝেই এ কালো রাতকে ধারালো করে তোলে ভয়ানক বৈদ্যুতিক ঝড়-বজ্র। বহু পলের জন্য। পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি ভয়াল চেহারা নিয়ে আসে বিজলির এসব চমক।
আকাশের আরেক প্রান্তে দৈত্য মনিবের দিকে সব সময় মুখটা ফিরিয়ে রেখেছে আইও। যেন লাল আর কমলার তপ্ত কড়াই। মাঝে মধ্যে হলুদ লাভারা উঠে আসে কোনো এক অগ্নিগিরি থেকে আবার থিতিয়েও যায় সময় মতো। বৃহস্পতিতেও ঘটে; তবে এরচে দ্রুত। আইও একটা ভৌগোলিক চেহারা বিহীন দুনিয়া। এর চেহারা যুগে যুগে পাল্টায়। বৃহস্পতিরটা দিনে দিনে।
আইও চলে গেছে কক্ষের শেষ কিনারায়। আর ছড়ানো, বিশাল সব পতীয় মেঘ ঝিকিয়ে উঠছে অনেক দূরের ছোট্ট সূর্যের আলোয়। যদি কখনো বৃহস্পতির উপর আইও বা আর কোনো উপগ্রহ বড় হয়ে দেখা দেয় তাহলে প্রতি ঘূর্ণনে দেখা যাবে গ্রহ আকৃতির বিশাল হ্যারিকেন দ্যা গ্রেট রেড স্পটকে। ঝড়টা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলছে যদি সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ ধরে না চলে থাকে।
এসব আশ্চর্যের মাঝে পড়েই লিওনভের ত্রুরা দু একটা জীবন পার করে দিতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা হল, বৃহস্পতি জগৎ ওদের প্রাধান্যের তালিকার সবচে নিচে বসে আছে। বিগ ব্রাদারই এক নম্বরে। যদিও বিগ ব্রাদারের মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূর দিয়ে শিপ দুটো ওড়াউড়ি করছে তবু ক্যাপ্টেন তানিয়া বাতিল করে দিয়েছে দু শিপকে এক করার আবেদন।
আমি আরো অপেক্ষা করতে চাই… ও বলল, যে পর্যন্ত সময়মতো দ্রুত পালানোর প্রস্তুতি না নিচ্ছি। এখন বসে বসে শুধু অপেক্ষা করব-যা করার করব আমাদের লঞ্চ উইন্ডো খুলে যাওয়ার পর।
অবশেষে নিনা বিগ ব্রাদারের উপর ল্যান্ড করল। পঞ্চাশ মিনিটের মুক্ত পতনের পর। এর ফলেই ভ্যাসিলি বের করেছে এর ভর। দশ লাখ টনের চেয়েও কম, মাত্র সাড়ে ন লাখ। আশ্চর্য! ঘনত্ব বড়জোর বাতাসের সমান! এবার সবাই ধরে নিয়েছে যে এটা ফাঁপা আর ভিতরে যে কোনো জিনিসকে ধরে রাখতে পারে সহজেই। যদি ও চায়। অথবা প্রথম আন্দাজটাই ঠিক, এখানে এ জিনিসের নিজের কোনো ভর নেই। শুধু যে বাতাসটুকু ছিল প্রথমে এ এলাকায় তারই ভর এটা। এর অর্থও একই। এর ভিতরে যে কোনো কিছু ঢুকে যাবে। হয়ত।
প্রতিদিনের হাজার বাহ্যিক কাজ আছে যা তাদের এ চিন্তা থেকে সরিয়ে রাখতে পারে সার্থকভাবে। লিওনভ আর ডিসকভারি দুটোতেই তাদের কাজের নব্বই ভাগ কেড়ে নিয়েছে ঘরদোরের কাজকর্ম। এর কারণ আছে যথেষ্ট। এ দুই শিপ একটা স্থিতিস্থাপক সংযোগ পথের মাধ্যমে একত্র হয়েছে এবার। সুবিধার সাথে সাথে বেড়ে গেল কাজও।
কানো ক্যাপ্টেন অলোভাকে নিশ্চিত করেছে হঠাৎ করে ডিসকভারির করাসেলের নষ্ট হওয়ার বা কারো দখলে চলে যাবার কোনো আশাই নেই। তাই এখন দুটো এয়ার প্রেশার দরজা খোলার মাধ্যমেই এক শিপ থেকে অন্যটায় যাওয়া যায়। স্পেসসুট আর সময় নষ্ট করা ই ভি এগুলোর কোনো দরকারই নেই। একমাত্র ম্যাক্স অসন্তুষ্ট কারণ ও বাইরে না যেতে পেরে আর ঝাড় শলা ব্যবহার না করে যার পর-নেই অতৃপ্তি পায়।
