হাল নিঃসন্দেহে দারুণ কাজ দেখিয়েছে; কিন্তু চন্দ্র তার খাঁটি মানবিক সন্তুষ্টি এমনকি খুশি গোপন করার চেষ্টা করেনি একটুও। কিন্তু এর মধ্যেই বাকি সবার চিন্তা ঘুরে গেছে অন্যদিকে বিগ ব্রাদার, এলিয়াস জাগাদকা মাত্র শত কিলোমিটার দূরে!
এমনকি এত দূর থেকেও জিনিসটাকে পৃথিবীর আকাশে চাঁদের চেয়ে বড় দেখায় এবং আশ্চর্যজনকভাবে এর ধারগুলো একেবারে নিখুঁত। নিখুঁত জ্যামিতিক গঠন। পেছনে মহাকাশ রেখে একে দেখার চেষ্টা করলে লাভ নেই, দেখা যাবে না। কিন্তু সাড়ে তিন লাখ কিলোমিটার নিচের দৌড়াতে থাকা বৃহস্পতির রঙিন মেঘের কারণে দেখা যায়। বেশ স্পষ্ট। মেঘগুলো বেশ গর্ব করেই যেন বলছে, একবার আমাকে দেখ, দেখবে মন আরেকবার দেখতে চায়-এবং দেখতেই হবে। কারণ চোখে এর বিস্তার-সৌন্দর্যের কোনোটাই মাপা যায় না। মাঝে মাঝে বিগ ব্রাদারকে দেখলে মনে হয় না যে জিনিসটা বৃহস্পতির সাড়ে তিন লাখ কিলোমিটার উপরে ভাসছে; মনে হয় গ্রহরাজের বুকে বসিয়ে দেয়া বিরাট কোনো শিকারের ট্র্যাপোের।
এমনটা মনে করার কোনো কারণই নেই যে একশ কিলোমিটার দশ কিলোর চেয়ে নিরাপদ বা হাজার কিলোর চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ; এ দূরত্বটা ক্রুদের কাছে প্রথম পরীক্ষা আর পর্যবেক্ষণের জন্য ঠিক মনে হয়েছে। ব্যাপারটা মানসিক। এতদূর থেকে শিপের টেলিস্কোপ জিনিসটার কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখতে পারে-কিন্তু কিছুই দেখার নেই। বিগ ব্রাদারের উদয় হয়েছে একেবারে অবাক পথে। এর গঠন বিশ্লেষণ করা বা টেলিস্কোপ দিয়ে আরেকটু আভ্যন্তরীণ গঠন দেখা সম্ভব না। এর গঠন যা দিয়েই হোক না কেন তা মহাকাশের বিশাল বিশাল বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে; মসৃণতায় একচুল নড়চড় হয়নি।
দূরবীনের আইপিসে চোখ রেখে সেটাকে দেখে সেই চাঁদের মতোই অনুভূতি হল ফ্লয়েডের। যেন মেঘ উঠে এসে সেই কৃষ্ণবস্তুকে ছুঁয়ে যাচ্ছে; যেমন দশ বছর আগে তার গ্লাভ পড়া হাত ছুঁয়েছিল চাঁদের স্তম্ভটাকে। টাইকো মনোলিথকে একটা প্রেশারাইজড ডোম দিয়ে ঢেকে না দিলে সে কি আর খালি হাতে ছুঁয়ে দেখতে পেত।
কোনো পার্থক্য নেই; তার কখনো মনে হয়নি যে সে ছুঁয়ে দেখেছে টি এম এ ওয়ান। তার আঙুলের ডগাগুলো যেন কোনো অদৃশ্য বাঁধার সামনে পিছলে গেল। যত জোরে সে চাপ দেয়, তত বেশি আসে প্রতিরোধ। কে জানে, বিগ ব্রাদারও একই আচরণ করতে পারে।
এত কাছে আসার আগে তাদের যন্ত্রে আর মনে যতোটা কুলায় তার সব পরীক্ষাই করেছে; রিপোর্ট পাঠিয়েছে পৃথিবীতে। একজন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ সম্পূর্ণ নতুন অচেনা কোনো বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় যেমন অনুভব করে তাদের অনুভূতিও একই। যেটুকু বলতে পেরেছে তা হল, সবচে ভাল রাডারগুলোও শুধু একটা অকল্পনীয়, অপার্থিব… হয়ত অ-মহাজাগতিক কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় এর সংকেত দিচ্ছে!
প্রথম চব্বিশ ঘণ্টায় তারা প্রভাব ফেলে না এমন সব যন্ত্র দিয়ে চালিয়েছে কাজ-যেমন টেলিস্কোপ, ক্যামেরা, প্রতি ওয়েভলেংথ এ সেন্সর। ভ্যাসিলি অর্লোভ জিনিসটার মাত্রা মাপার কাজ হাতে নিয়ে অবাক হয়েছে, সেই সে ১:৪:৯! সেই ছ তল ওয়ালা বস্তুর সবচে সরল, সবচে সুদৃশ্য, সবচে সহজ গাণিতিকতা। বিগ ব্রাদারেরও আনুপাতিক চেহারা হুবহু টি এম এ ওয়ানের মতো-শুধু এটা দু কিলোমিটারের বেশি লম্বা; চাঁদের বুকে থাকা এর ছোট ভাইয়ের চেয়ে এটা সাতশো আঠারো গুণ বড়।
এরপরে সেই চিরাচরিত গাণিতিক রহস্যতো আছেই, মানুষ বছরের পর বছর ধরে সেই ১:৪:৯ অনুপাত নিয়ে চালাচ্ছে তর্ক-এ তিন সংখ্যা হল প্রথম তিন মৌলিক সংখ্যার বর্গ, তাও একের পর এক। যতদূর বোঝা যায়, এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার না; এবার এ তর্কে আরো প্রবল যুক্তি পাওয়া যায়।
আর পৃথিবীতে মেসেজ যাওয়ার সাথে সাথে গণিতবিদ আর গাণিতিক পদার্থবিদরা তাদের কম্পিউটারের সাথে খুশি মনে শুরু করেছে খেলা; উঠে পড়ে লেগেছে অনুপাতটাকে প্রকৃতির মূল গঠনের সাথে মিলিয়ে নিতে-আলোর গতি, পোটন-ইলেক্ট্রন ভরের অনুপাত, দৃষ্টিনন্দন গঠনের ধ্রুব মান… খুব দ্রুত তাদের সাথে যোগ দিয়েছে একদল নিউমেরোলজিস্ট, ভবিষ্যৎ-গণক, অতিন্দ্রীয়বিদ যারা এর মধ্যেই দ্য গ্রেট পিরামিডের১৫ উচ্চতা, স্টোনহেঞ্জের১৬ কেন্দ্রের মাঝ দিয়ে যাওয়া রেখার দৈর্ঘ্য আর ইস্টার দ্বীপের অবাক করা ব্যাপার, নাজকা লাইনের কৌণিক উচ্চতার রেখাগুলো নিয়ে হল্লা করে মরছে। এগুলোর সাথে ভবিষ্যতের কোনো একটা সম্বন্ধ পাতাতে পারলেই তাদের চলে যায়। তারা বিন্দুমাত্র অবাক হয়নি যখন ওয়াশিংটনের একজন বিখ্যাত ভঁড় বলেছিল যে উনিশো নিরানব্বইয়ের একত্রিশে ডিসেম্বর পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে। অবশ্য যারা বিশ্বাস করেনি তারাও অনেক উদ্বেগ নিয়ে দিনটার জন্য অপেক্ষা করেছিল।
মস্ত শিপদুটো যে তার এলাকায় এসে বসে আছে তা দেখার জন্য বিগ ব্রাদার বিন্দুমাত্র আগ্রহী নয়। এমনকি রাডার বিমের সাহায্যে যখন একে পরীক্ষা করছে তখনো না… রেডিও পালসের সাহায্যে যখন এর আশপাশটায় বিস্ফোরণের চেয়ে ভয়াবহ শব্দ করছে তখনো না। আশা করা হয়েছিল যে এসব চললে কোনো বুদ্ধিমত্তা হয়ত সাড়া দেবে একই পথে।
দুটো হতাশ করা দিনের শেষে মিশন কন্ট্রোলের অনুমতি নিয়ে শিপগুলো দূরত্ব অর্ধেক করে নিল। পঞ্চাশ কিলোমিটার দূর থেকে বিগ ব্রাদারকে পৃথিবীর আকাশে চাঁদের ব্যাসের চেয়ে চারগুণ বড় লাগছে-যথেষ্ট বড়, কিন্তু এখনো মানসিক বিকার আনার মতো দেখায় না। এখনো সে বৃহস্পতির সাথে পাল্লা দেয়নি, গ্রহরাজ দশগুণ বড়। এবং হঠাৎ করেই মিশনের পরিস্থিতি ভয় থেকে সরে গিয়ে অধৈর্যের দিকে মোড় নিল।
