জিনিসটাকে যা-ই ডাকো না কেন, আর মাত্র দশ হাজার কিলোমিটার। কয়েক ঘণ্টার বেশি লাগবে না যাত্রা শেষ করতে। কিন্তু তোমাকে বলতে ইতস্তত করব না-আসলে এই পুরো অভিযানের মধ্যে সবাই যে জার্নিটাকে ভয় পেয়েছে আজ পর্যন্ত–এটাই সেই যাত্রা।
আশা করি কোনো না কোনো নতুন খবর পাব ডিসকভারির বুকে। এটাই আমাদের একমাত্র ব্যর্থতা যা আশা করেও পাইনি আমরা। ডেভ বোম্যান সেই স্ত টার মুখোমুখি হওয়ার অনেক আগেই বিচ্ছিন্ন হয়েছে হাল। এ নিয়ে তার কোনো স্মৃতি নেই; স্বাভাবিক। বোম্যানতো যাওয়ার সময় সাথে করে সব রহস্যই নিয়ে গেল। শিপের লগ আর অটোম্যাটিক রেকডিং সিস্টেমে কোনো তথ্যই নেই-এটাতো আর আগে জানতাম না।
একমাত্র যা আমরা পেয়েছি তা হল মায়ের জন্য রেখে যাওয়া বোম্যানের চিঠি, একেবারেই ব্যক্তিগত জিনিস। ভেবে অবাক হয়েছি কেন পাঠায়নি। বোঝাই যায় ও ভাবেওনি যে যাচ্ছে চিরদিনের জন্য। সমস্যা আছে আরো। বৃহস্পতির জগৎ যত বড়ই হোক, আটকে যাওয়া বস্তুতো পাক খাবে। আমরা ঠিকই ধরে ফেলতাম বোম্যানের পোডটাকে। অবশ্য যদি কোনো উপগ্রহের উল্কা না হয়ে থাকে অথবা বৃহস্পতির শক্তিকে দোলনা করে সৌর জগতের বাইরে একটু ঘুরতে না গিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রেও ভরসা থাকে। ওর পোডের ইঞ্জিনের যেমন ঐ কৌণিক ভরবেগে ঘোরার ক্ষমতা নেই তেমনি ওটার কম্পিউটারের পক্ষেও হিসাব করে সেই বাঁকা পথটা বের করার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
অবশ্যই, মিসেস বোম্যানের সাথে যোগাযোগ করেছি। তিনি একটা নার্সিং হোমে। ফ্লোরিডার কোথাও না কোথাও। কিন্তু এখন আর এ মেসেজ তাঁর কাছে। কোনো অর্থই বয়ে নেয় না।
এটুকুই সব খবর আজকের মতো। আমার পক্ষে বলা সম্ভব না তোমাদের কেমন মিস করি… কেমন মিস করি পৃথিবীর নীল আকাশ আর সবুজ বন। এখানকার সব রঙই লাল গোত্রের। কমলা, হলুদ। মাঝে মাঝে অবশ্যই দারুণ সূর্যাস্তের মতো। কিন্তু ঐ বর্ণালীর পেছনের হাড় জমিয়ে ফেলা শীত প্রত্যেককে অসুস্থ করে তোলে।
তোমাদের সবার জন্য আমার রাশি রাশি ভালবাসা। যখনই পারব কল করব। যখনই পারি।
২৩. মিলনমেলা
নিকোলাই টার্নোভস্কি লিওনভের কন্ট্রোল এবং সাইবারনেটিক্স এক্সপার্ট। একমাত্র সেই ডক্টর চন্দ্রের সাথে নিজের মতো করে কথা বলতে পারে। যদিও হালের প্রধান স্রষ্টা ও মানসিকতার নির্মাতা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে তার কাজে নাক গলাতে দিতে, তবু তার শরীরের দুর্বলতা তাকে বাধ্য করেছে অন্য কারো সাহায্য স্বীকার করতে। একটা অস্থায়ী জোট গড়েছে রাশিয়ান আর ইন্দো আমেরিকান মিলে। অবাক ব্যাপার, জোটটা কাজ করছে চমৎকার। এর বেশিরভাগ কৃতিত্ব ভাল স্বভাবের ক্রু নিকোলাইয়ের পাওনা। সে কীভাবে যেন সময়মতো বুঝেছে যে এবার চন্দ্র টার্নোভস্কির প্রয়োজন অনুভব করবে। অথচ সে সময় চন্দ্র একা থাকতে চেয়েছে আরো বেশি। নিকোলাইয়ের ইংরেজি যে শিপে সবচে খারাপ তা তেমন গুরুত্ব পায়নি। কারণ আছে, পুরোটা সময় তারা কম্পিউটারের বিভিন্ন শব্দ আর ভাষা ব্যবহার করেছে, বাকি কারও পক্ষে তাতে নাক গলানো অসম্ভব।
এক সপ্তাহের ধীর আর সতর্ক পুননির্মাণের পর হালের সব রুটিন আর যত্ন নেয়া হচ্ছে ঠিকমতো। সে এখন একজন মানুষের মতো-যে একটু আধটু হাঁটতে পারে, সাধারণ কাজ আর কম হলেও কিছু পরিশ্রম পারে দিতে; যে নিম্নস্তরের কথাবর্তায় থাকতে পারে ব্যস্ত। মানুষের হিসাবে বলতে গেলে তার সাধারণ জ্ঞান আর আই কিউ পঞ্চাশ ভাগ; তার আসল ব্যক্তিত্বের অতি সামান্যই ধরা দিয়েছে এ পর্যন্ত।
হাল এখনো ঘুমের মাঝে হাঁটে। কিন্তু চন্দ্রের দাবী অনুযায়ী সে এখনি ডিসকভারিকে উড়িয়ে নিয়ে বিগ ব্রাদারের কাছাকাছি মিলনমেলা বসিয়ে দিতে পারবে।
আরো সাত হাজার কিলোমিটার উপরে উঠে নিচের জ্বলন্ত দোজখটাকে এড়াতে সবাই উদগ্রীব। এস্ট্রোনমিক্যাল হিসাবে নিতান্তই তুচ্ছ দূরত্ব, কিন্তু দান্তে বা হিরোনিমাস বসের লেখার মতো একটা পরিবেশকে ছেড়ে যেতে এটাই তাদের জন্য বহুদূর, প্রায় স্বর্গের কাছাকাছি। সবচে ভয়াল বিস্ফোরণগুলো এখনো শিপের আশপাশে আসতে পারেনি। কিন্তু ভবিষ্যতে যে আসবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আইওতে হরদম বিস্ফোরণগুলো নতুন রেকর্ড করার মতলব আঁটে; আজ যেখানে সালফারের মৃদু স্তর পড়তে পারে কাল সে স্থানটা চলেও যেতে পারে সেসব ভয়ের গর্ভে।
শুধু কার্নো আর চন্দ্র শিপে ছিল যখন হালের হাতে ডিসকভারিকে ছেড়ে দেয়া হয়। খুবই সীমিত নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ তো! সে তার মেমোরিতে দেয়া প্রোগ্রামটাকেই বার বার চালিয়েছে-তারপর দেখেছে এর কাজ করার ক্ষমতা। অন্যদিকে মানব-কুরা দেখেছে তাকে। একটু এদিক সেদিক হলেই পদক্ষেপ নেবে।
প্রথম প্রজ্বলন চলল দশ মিনিট ধরে; এরপর হাল রিপোর্ট করল যে ডিসকভারি ট্রান্সফার অর্বিটে চলে এসেছে। লিওনভের রাডার আর অপটিক্যাল ট্র্যাকিং সেটা নিশ্চিত করার সাথে সাথে শিপটা নিজেকে নিয়ে গেল একই কক্ষপথে। পথের ব্যাপারে ছোট দুটো সংশোধনের তিন ঘণ্টা পনের মিনিট পরে দু শিপই প্রথম ল্যান্সে পয়েন্ট এ হাজির হয় যেটাকে লোকে বলে এল ওয়ান বা ল্যাগ্রে ওয়ান। সাড়ে দশ হাজার কিলোমিটার উঁচুতে সেই রেখার উপর অবস্থিত-যেটা আইও আর বৃহস্পতির কেন্দ্রের যোগাযোগ সরলরেখা।
