সেক্ষেত্রে আমাকে ক্যাথেরিনার ভুবনখ্যাত তকমাগুলোর একটা ব্যবহার করতেই হচ্ছে। এক ড্রপে বাজীমাৎ! ওগুলো তোমার উপর ভাল তেলেসমাতিই ফলিয়েছে, একাধারে চব্বিশ ঘণ্টা কাৎ… নাকি?
এরপর কার্নো শুরু করল চন্দ্রকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা, অন্তত ফ্লয়েড তাই মনে করেছে, যদিও তার ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত হতে পারবে না-ও সব সময়ই একটা কঠিন মুখে তরল তরল কথা বলে স্বর্গীয় সুখ পায়। রাশিয়ানরা ব্যাপারটা পুরোপুরি সামলে নেয়ার পর পরিস্থিতি এত করুণ হয়েছে যে কার্নোর চরম সিরিয়াস মুহূর্তের কথায়ও খিল ধরে যায় ওদের পেটে।
আর কার্নো-ওকে কেউ কি কখনো হাসতে দেখেছে? একবার ফ্লয়েড দেখেছিল, যখন ওরা বসুন্ধরাকে বিদায় জানাচ্ছে উপরে উঠতে উঠতে। সেটা হাসি নাকি কান্না কে জানে! অনেকেই ব্যাপারটা সহ্য করতে পারে না-এ ভুবনে ফিরে আসার আশা করতে পারে না কেউই পুরোপুরি। ডুবে যায় অ্যালকোহলে। আগে মহাকাশ যাত্রায় মদ জাতীয় তরল ছিল নিষিদ্ধ। পরে পৃথিবী ছাড়ার সময়টার স্মৃতি পুরো অভিযান ধরে কুকে কুরে কুরে খায় দেখে কর্তৃপক্ষ নিজ দায়িত্বেই প্রাচীনতম ফ্রেঞ্চ শ্যাম্পেন বিলিয়ে থাকে। কার্নো হেসেছিল ঐ সময়। অবশ্যই এর পুরো প্রভাবক ছিল সবচে দুর্লভ উত্তেজক পানীয়।
ফ্লয়েড ঐ হাসির আশঙ্কা করেছে এন্ড অব ডিসকভারি অর্বিট পার্টিতে। ডিসকভারির সাথে লিওনভের চুড়ান্ত মিলনের পর। তখন কার্নো পান করেছিল যথেষ্ট। তারপরও ক্যাপ্টেন অর্লোভা যেমন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে-ওও ঠিক তেম্নি। আচ্ছা, ক্যাপ্টেন অর্লোভা সহজে এক ফোঁটা মদ ছোঁয় না–এর কারণ কি ব্যক্তিগত, নাকি কোনো ক্যাপ্টেনই ছোঁয় না? এটা কি কোনো মহাকাশ রুল, যা ক্যাপ্টেন হওয়ার পর আরো হাজারো গোপন রুলের সাথে জানা যাবে? মরুকগে। ফ্লয়েডের স্পেস ক্যাপ্টেন কেন, আর জীবনে স্পেস কিং হওয়ারও কোনো ইচ্ছা নেই।
এই কার্নো ছেলেটা একটা জিনিসই সিরিয়াসলি নেয়। তার কাজ। যখন পৃথিবীর অর্বিট ছেড়ে আসে ওরা, কার্নো একজন যাত্রী যে মাতাল হওয়ার অধিকার রাখে। আর আজকে ও একজন ক্রু, তাই মাতাল হওয়া চলে না। নাহ্। এ ছেলে যথেষ্ট জটিল। মহাকাশ অভিযাত্রী বাছাইয়ে কখনো স্পেস সংস্থা ভুল করে না।
২১. পুনরুত্থান
আমরা-বলছে ফ্লয়েড নিজেকেই-জাগিয়ে তুলতে যাচ্ছি এক ঘুমন্ত দৈত্যকে। হাল আমাদের উপস্থিতি দেখে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে এত বছর পর? অতীতের সব কথা মনে করতে পারবে তো? আর সবচে বড় কথা, ওর মনোভাব বন্ধুর মতো হবে, নাকি থাকবে শক্রতা?
সে এখন ডক্টর চন্দ্রের পেছনে ভেসে বেড়াচ্ছে। ভাল দিকটা হল, ডিসকভারি এখন এতই স্বয়ং সম্পূর্ণ যে তুলতে পেরেছে জিরো গ্র্যাভিটি। তার মন এখন কয়েক ঘন্টা আগে বসানো কাট অফ সুইচ থেকে অনেক অনেক দূরে। হাতের কয়েক সেন্টিমিটার দূরেই রেডিও সেটটা। এটা আনায় নিজেকেই খুব বোকা মনে হচ্ছে। এখন হাল সারা ডিসকভারির সব অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন। ও যদি আবার জেগেও ওঠে, হবে স্নায়ুতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়া মাথার মতো। বড়জোর যোগাযোগ করতে পারবে, প্রভাব ফেলবে না কোনো।
কার্নো জিনিসটা বসানোর সময় বলেছিল, ও বড়জোর ইনিয়ে বিনিয়ে আমাদের কাছে ওয়াদা করতে পারে, আর কক্ষনো করব না। কানে ধরলাম। এরচে বেশি কিছুই না।
আমি প্রথম পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত, ক্যাপ্টেন। বলল চন্দ্র, এবার কথায় মহাকাশ রিপোর্টের ভঙ্গী, সব হারিয়ে যাওয়া মডিউল এনে জোড়া দেয়া হয়েছে। আমি ডায়াগনস্টিক প্রোগ্রাম চালিয়েছি সব সার্কিটে। সব কিছুই একেবারে স্বাভাবিক,
অন্তত এখন।
ক্যাপ্টেন অর্লোভা একবার তাকায় ফ্লয়েডের দিকে। জবাবে ফ্লয়েড একবার নড করল মাথা নিচু করে। চন্দ্রের অনুরোধের কারণে প্রথম চলার সময় মাত্র তিনজন উপস্থিত ডিসকভারিতে; প্রথম স্টার্টিং জটিল-এ উসিলায়। এটাও বোঝা যাচ্ছে এ তিনজনও ঠিক স্বাগত নয় চন্দ্রের দ্বারা।
ভাল, ডক্টর চন্দ্র। সে নিয়ম কানুনের ব্যাপারে সচেতন, তবু দ্রুত যোগ করল, ডক্টর ফ্লয়েড তার অনুমোদন জানিয়েছে। আমার নিজের পক্ষ থেকেও কোনো আপত্তি নেই।
আমার আসলে ব্যাখ্যা করা উচিত। বলল চন্দ্র, তার স্বভাবসুলভ অননুমোদনের সুরে।
ওর ভয়েস রিকগনিশন৫ আর স্পিচ সিন্থেসিস সেন্টারগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আবার আমাদেরকে কাজ করতে হবে। ওকে কথা বলা শিখাতে হবে। আমাদের সৌভাগ্য যে ও মানুষের চেয়ে কয়েক লাখ গুণ দ্রুত শেখে।
বিজ্ঞানীর আঙুলগুলো নেচে বেড়ায় কি-বোর্ডের উপর ডজনখানেক শব্দ টাইপ করার সময়। একই সাথে পাইকারি হারে পরীক্ষাও করা হচ্ছে প্রতিটা শব্দ; স্ক্রিনে ওঠার সাথে সাথেই। বিকৃত প্রতিধ্বনির মতো কথাগুলো স্পিকার থেকে ভেসে আসছে। প্রাণহীন। আসলে এ শব্দ থেকেই বোঝা যায় যেখান থেকে আসছে সেখানটায় কোনো বুদ্ধিমত্তা কাজ করে না। একেবারেই যান্ত্রিক। এ সেই হাল নয়-ভাবল ফ্লয়েড। আমার ছোটকালে দেখা প্রাথমিক কথা বলা যন্ত্রের চেয়ে বেশি আবেগ নেই এসব কথায়।
ডক্টর চন্দ্র রিপিট বাটন টিপল। আবার সেই শব্দের সিরিজ আবৃত্তি করল হাল। তোতা পাখির মতো। এর মধ্যেই দেখার মতো উন্নতি হচ্ছে যদিও এখনো কণ্ঠটাকে মানব প্রজাতির কারো সাথে গুলিয়ে ফেলেনি কেউ-তবু তোতার মুখে আবেগ ফুটছে মনে হয়।
