একটাই বাঁচোয়া, আয়েশার বাবার অন্তত সুমতি হয়েছে। লম্বা সামরিক সারির একেবারে শেষ মাথায়, ফারগানার হলুদ নিশানের শেষে, কালো আর লাল পোশাক পরিহিত অশ্বারোহী মাঙ্গলিঘ তীরন্দাজ বাহিনীর একটা দলকে দেখা যায়। সাইবানি খানের বিরুদ্ধে বাবর আর জাহাঙ্গীরের মাঝে সন্ধির বিষয়টা আঁচ করতে পারার সাথে সাথে ইবরাহিম সারু তাদের শাহরুখিয়ায় পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ওয়াজির খান আর বাইসানগার তার দু’পাশে রয়েছে এবং তার অশ্বারোহী বাহিনীর মাঝে কোথাও অবস্থান করছে বাবুরী। সমরকন্দ পতনের সংবাদ পাবার পর থেকে বন্ধুর সাথে তার একটা কি দুটো কথা হয়েছে এবং তার চপল সঙ্গের অভাব সে বোধ করেছে। কিন্তু বন্ধুত্ব- সাহচর্য- এসব বোধহয় রাজাদের জন্য নয়। বাবর ভাবে, আরও বড় কিছুর প্রতি তাদের সর্বদা দৃষ্টি সজাগ রাখতে হয়।
গ্রীষ্মের দাবদাহে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া সমভূমির উপর দিয়ে তারা ঘোড়াগুলি দুলকিচালে দাবড়ে যায়। তাদের সঙ্গে জিনিসপত্রও খুব অল্প রয়েছে। বাবর সিদ্ধান্ত নিয়েছে গন্ধমাদন অবরোধ অনুষঙ্গগুলোর এবার তাদের প্রয়োজন হবে না। দ্রুত অপ্রত্যাশিত আক্রমণের উপরেই সে তার বাজি রেখেছে। আজ পর্যন্ত তৈমূরের কোনো না কোনো বংশধর সমরকন্দের শাসক ছিলো। সমরকন্দের অধিবাসীদের যারা বেঁচে গিয়েছে- সাইবানি খানের মতো অনাহুত, নিষ্ঠুর লুণ্ঠকের হাত থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে উঠা উচিত। তার বাহিনীকে অগ্রসর হতে দেখলে, নিপীড়কের বিরুদ্ধে তারাও রুখে দাঁড়াবে বলেই তার ধারণা।
সবকিছুর পরে, শেষ কথা হলো সাইবানি খানের নিজস্ব পরিকল্পনা। শরৎকাল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সে কি সমরকন্দেই শীতকাল কাটাবার ফন্দি এঁটেছে? বাবর তার বাদামী রঙের আজদাহাটার ছন্দোবদ্ধ খুরের শব্দে এগিয়ে যেতে যেতে, ভ্র কুচকে তার শত্রুর মনে ভেতরে প্রবেশ করতে চেষ্টা করে। সে আসলে কি চায়? সমরকন্দ লুণ্ঠন আর ধর্ষণের অপমানে ডুবিয়ে দিয়ে তারপরে সে কি তার লুণ্ঠনকারী নেকড়ের দল নিয়ে কি উত্তরের তৃণভূমিতে ফিরে যাবে লুট করা মালামাল উপভোগের অভিপ্রায়ে? নাকি তার অন্য কোনো মহাপরিকল্পনা রয়েছে? সমরকন্দে তার আক্রমণ কি কেবলই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি তার নিজের একটা রাজবংশ আর সাম্রাজ্য স্থাপনের অভিপ্রায় রয়েছে?
বাবর তার বাল্যকালে যে সব গল্প শুনেছিলো, তা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে সমরকন্দের প্রতি সাইবানি খানের একটা আক্রোশ রয়েছে। তার মরহুম আব্বাজানের বলা গল্পগুলো সে মনে করে। কিভাবে এক উজবেক বসতিতে সমরকন্দের শাহী বাহিনীর এক হামলার সময় সাইবানি খান তাদের হাতে ধরা পড়েছিলো, তার তখন নিতান্তই অল্প বয়স। তার বাবা আর ভাইয়েরা সেই হামলার। সময়ে মারা যায়। কিন্তু কেবল দশ বছর বয়স হবার কারণে তার গলায় একটা চামড়ার দড়ি বেঁধে সেটা উটের লেজের সাথে আটকে ক্রীতদাস হিসাবে তাকে সমরকন্দের দাসবাজারে নিয়ে আসা হয়। উপস্থিত বুদ্ধি আর ভীষণ চালাক হবার কারণে সে কামারশালার কঠিন পরিবেশে মানিয়ে নেয়। সেখানেই ক্রীতদাসের প্রতীক তার বাম গালে পুড়িয়ে এঁকে দেয়া হয় এবং সে কোক সরাইয়ের এক অমাত্যের চোখে পড়ে।
অভিজাত সেই ভদ্রলোক তার উপযুক্ত শিক্ষার বন্দোবস্ত করেন এবং মুনশি হিসাবে তাকে একটা ভালো পরিচয় দান করেন। কিন্তু একই সাথে তাকে বাধ্য করেন তার শয্যাসঙ্গী হতে। এক রাতে সাইবানি খান তার প্রভুর গলা দু’ফাঁক করে দেয়। নিহত প্রভুর রক্তে আঙ্গুল ডুবিয়ে মুনশি হিসাবে সে তার শেষ বাণীটা লিখে দেয়ালে লেখা সেই বাণী শহরটার উপরে যেনো একটা অভিশাপ বয়ে নিয়ে আসে। সে পুনরায় তার নিজের লোকদের মাঝে ফিরে যায়। নিজের গোত্রের সাথে পুনরায় মিলিত হয়ে সে ধীরে ধীরে নিজেকে উজবেকদের অবিসংবাদিত অধিরাজে পরিণত করে এবং তখন থেকে তৈমূরের বংশধরদের প্রতি একটা আক্রোশ সে লালন করে আসছে। সে এখন আনুমানিক পঁয়ত্রিশটা গ্রীষ্মকাল দেখেছে এমন একজন পূর্ণবিকশিত পুরুষ। একজন দুর্ধর্ষ শত্ৰু, যে সামনে ধ্বংসের অশুভ ছায়া বিস্তার করে পেছনে কেবল মৃত্যুর বরাভয় রেখে যায়। এমন একজনকে পরাস্ত করাটা মোটেই সহজ কাজ না…
এক্ষেত্রে শক্তির চেয়ে কৌশলের আশ্রয় নেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আনুমানিক চারদিনের ভিতরে, যদি তারা তাদের বর্তমান এই গতিবেগ বজায় রাখতে পারে তবেই, তারা সমরকন্দে হামলা চালাবার মতো দূরত্বে পৌঁছে যাবে। কিন্তু সাইবানি খানকে তার অভিপ্রায়ের ব্যাপারে একটা ধন্দে রাখাটাই বোধহয় ভালো হবে- বা, তারচেয়েও ভালো হয় যদি তাকে ভুল পথে পরিচালিত করা যায়। সে যদি গাড়লটাকে বোঝাতে পারে যে, সে ফারগানা থেকে পালাতে চাইছে সমরকন্দকে পাশ কাটিয়ে তার অভিপ্রায় পশ্চিমে গমন করা- সে হয়তো তাহলে তার শত্রুকে শহর থেকে বের করে আনতে পারবে।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা, বাবর, ওয়াজির খান, আর বাইসানগারের সাথে অস্থায়ী শিবিরে একটা অগ্নিকুণ্ডের পাশে বসে, স্থির দৃষ্টিতে আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে এখনও নিজের মাঝে উদ্দীপনার অভাব বোধ করছে। তারা যেখানে শিবির স্থাপন করেছে সে জায়গাটা কেমন বালুময়। সহসা সে উঠে দাঁড়ায়, এবং মাটি থেকে একটা কাঠি তুলে নিয়ে সমরকন্দের একটা মানচিত্র অঙ্কন করে- পাঁচ মাইল বিস্তৃত দেয়ালের একটা ব্যুহ যা ছয়টা তোরণদ্বার দ্বারা সম্পূর্ণ, আশেপাশে তৃণভূমি, ফলের বাগার আর উদ্যান, উত্তর আর পূর্বদিকে নহর আর নদীর আবছা ধারা বহমান। “আমরা যদি আব-ই-সিয়া নদীর অপর পারে, সমরকন্দের উত্তর ধারের দেয়ালের সমান্তরালে, আমাদের সেনাদলের একটা অংশ পাঠাই তাহলে কি হবে… লোহার দরোজা আর শেখজাদা তোরণদ্বারের পাহারায় নিয়োজিত প্রহরীর দল তাদের দেখতে পাবে বটে কিন্তু উজবেকরা তাদের শক্তিমত্তা যাচাই করানো পক্ষে অনেক দূরেই থাকবে। আমরা হয়তো তাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করতে পারি যে, ওটাই আমাদের পুরো সেনাবাহিনী…”
