বাবর আশা করেছিলো সমরকন্দের কিছু যোদ্ধা অন্তত উজবেকদের নাগাল এড়িয়ে পূর্ব দিকে পালিয়ে আসবে। কিন্তু বাইসানগারের প্রেরিত গুপ্তদূতের পাঠানো খবর সে আশায় পানি ঢেলে দেয়। বিজয়ের পথ উজবেকরা কুপিয়ে কেটে পরিষ্কার করায় একটা বিষয় স্পষ্ট যে, সেখানে একটা গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। সমরকন্দের আশেপাশের সমভূমিতে তার সৈন্যদের ফুলেফেঁপে উঠা বীভৎস লাশে ভরে গিয়েছে। সামান্য কয়েকজনই পালিয়ে বেঁচেছে। বাবরের সাহায্যে কেবল অশরীরি সৈন্যদের আত্মাই এখন এগিয়ে আসতে পারে।
জাহাঙ্গীর আর তামবালের উপরে এখন সবকিছু নির্ভর করছে। সন্ধির নিশান উড়িয়ে তার কি নিজেরই প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া উচিত ছিলো? সে ভাবে। কাশিম কি জাহাঙ্গীর আর তামবালকে বোঝাতে পারবে যে তাদের মঙ্গল কেবল- সম্ভবত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষীণ সম্ভাবনা তার প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তি গ্রহণের মধ্যে নিহিত রয়েছে। এবং সাইবানি খানের বিরুদ্ধে জোট গঠন। নাকি তারা তার উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে সাইবানি খানের হুমকি উপেক্ষা করবে।
কাশিমের ফিরে আসবার খবর বাবর যখন পায় তখন সে তার আম্মিজান আর নানীজানের সাথে ছিলো। কোনো ধরণের ব্যাখ্যার ভিতরে না গিয়ে এবং এসান দৌলতের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়িয়ে সে নিজের কামরার দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে সে কাশিমকে নিয়ে আসবার আদেশ দিয়েছে। কাশিমের চিরাচরিত শান্ত সমাহিত ভাব ভঙ্গি দেখে তার বয়ে নিয়ে আসা বার্তা সম্পর্কে সামান্যতম উত্তেজনা বা বিক্ষোভের আঁচ পাওয়া যায় না।
“বেশ?” বাবর তাকে আঁকড়ে ধরার ইচ্ছা প্রাণপণে দমন করে কোনোমতে কেবল বলে।
“সুলতান আমি আপনার প্রস্তাবের উত্তর নিয়ে এসেছি। তারা আপনার শর্ত মেনে নিয়েছে।” এতক্ষণ পরে কাশিমের মুখে একটা মৃদু হাসির আভাস দেখা যায়। “সুলতান, এই দেখুন।” একটা কৃষ্ণ-লাল বর্ণের উটের চামড়ার থলির ভিতর থেকে, যার মুখটা হাতির দাঁতের বন্ধনী দিয়ে বন্ধ, সে একটা চিঠি বের করে।
সেটার দিকে তাকিয়ে বাবরের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠে। হ্যাঁ! সৌজন্যমূলক সম্ভাষণের ফালতু অংশ বাদ দিয়ে সে যা খুঁজছিলো সেটা দেখতে পায়। লেখাগুলো সে নিজে বারবার পরে, শব্দগুলোর মর্মার্থ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। “ভাইজান আপনি যা প্রস্তাব দিয়েছেন উজবেক হুমকির হাত থেকে বাঁচবার সেটাই একমাত্র পথ। এই চিঠিটা আপনি যখন পাবেন ততোক্ষণে আমার সেনাবাহিনী জানবেন শাহরুখিয়ার পথে রওয়ানা হয়ে গেছে। আমি আমার সামর্থ অনুযায়ী চার হাজার অশ্বারোহী আর একহাজার তীরন্দাজের একটা বাহিনী পাঠালাম।” চিঠিটা ফারগানার রাজকীয় সীলমোহরের উপরে জাহাঙ্গীরের দস্তখত সম্বলিত।
ঘন মোমের উপর আঙ্গুল বোলাবার সময়ে বাবর একটা যন্ত্রণার খোঁচা অনুভব করে- রাজকীয় সীলমোহর ব্যবহারের অধিকার কেবল তারই রয়েছে: জন্মসূত্রে আর রক্তের অধিকার বলে সেই ফারগানার সুলতান। কিন্তু সে তার পছন্দ বেছে নিয়েছে। এবং তাকে অবশ্যই সেটা মান্য করতে হবে। জাহাঙ্গীর আর তার নিয়ন্ত্রক তামবাল তাদের কথা রাখবে বলে তাকে বিশ্বাস করতেই হবে। এখন যদি তারা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে বিপর্যয়ের হাত থেকে কেউ তাদের বাঁচাতে পারবে না।
২.৪ এক সনাতন পুরঞ্জয়
১০. এক সনাতন পুরঞ্জয়
বাবর তার পেছনে সারিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত ঘোড়সওয়ার বাহিনীর দিকে ঘুরে তাকায়। তাদের বহন করা উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের সগর্বে ঘোষণা করছে তারা সবাই ফারগানা থেকে আগত যোদ্ধা। আভ্যন্তরীণ গোত্র সংঘাত আর শাহী বিবাদ ভুলে তারা সনাতন এক পুরঞ্জয়ের বিপক্ষে যুদ্ধে নেমেছে। তিন ঘণ্টা আগে, দূর্গের জেনানামহলে নিজেদের কামরায় এসান দৌলত আর খুতলুঘ নিগার তাকে তাদের আশীর্বাদ জানিয়েছেন আর আম্মিজান বাবরের বাবার তরবারি আলমগীরের ঈগল আকৃতির বাঁটে চুমো খেয়েছেন ধাতব- নকশা করা বেল্টে যেটা ঝুলছে। সে অবাক হয়েছে এটা দেখে যে দু’জনেই আসলে সেয়ানা পাগল। তার সৎ-ভাইয়ের সাথে আপোষরফায় তারা কোনো আপত্তিই জানাননি- এসান দৌলত আবার এক কাঠি সরেস, তিনি বাস্তবিক অর্থে তার দূরদর্শিতা আর সাহসের প্রশংসাই করেছেন। খানজাদাই কেবল তার আবাল্যের পরিচিত জন্মভূমি আকশি হয়তো আর কখনও দেখতে পাবে না সেই আশঙ্কায় আপাতভাবে খানিকটা বিচলিত।
গতরাতে সে আয়শার কাছে শেষবারের মতো সংক্ষিপ্ত সময় কাটাতে গিয়েছিলো। সে যদি আর ফিরে না আসে, তাহলে তার গর্ভে অন্তত সে একজন উত্তরাধিকারী রেখে যেতে চায়, নিরানন্দ কিন্তু প্রচণ্ড বেগে, তার অনুভূতি শূন্য ঈষৎ ফিরিয়ে নেয়া চোখের দিকে না তাকিয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে, উপগত হবার ফাঁকে ভেবেছিলো। বাবর শীর্ষ অনুভূতির তুঙ্গে পৌঁছাবার সাথে সাথে- আয়েশা বরাবর যা করে থাকে আজও তাই করেছিলো তার কাছ থেকে গড়িয়ে সরে গিয়ে নিজের নগ্ন দেহ চাদর দিয়ে ঢেকেছে। দ্রুত পোশাক পরার অবসরে সে একবারও তার দিকে তাকায়নি এবং কোনো ধরণের বিদায় সম্ভাষণ বা অন্য কোনো কিছু না বলে সে আয়েশার কক্ষ থেকে বের হয়ে এসেছে। আবেগঘটিত আগন্তুক ছাড়া তারা একে অপরের কাছে কখনও অন্য কিছু ছিলো না।
