“এবং, তারপরে কি হবে, সুলতান?” বাইসানগার জানতে চায়।
“ভাগ্য যদি আমাদের সহায় থাকে, উজবেকরা তাহলে ধাওয়া করবে এবং আমরা তখন আমাদের কাঙ্ক্ষিত সুযোগটা পাবো। কান-ই-গিল তৃণভূমির লাগোয়া ঝোপঝাড় আর করকটে গাছের বনে আমাদের বাকি সৈন্যদের লুকিয়ে রাখি লোহার দরোজার পূর্ব দিকে। আমরা তাহলে দেখতে পাবো যে ঠিক কি ঘটছে। আল্লাহতালা যদি আমাদের সহায় থাকেন এবং উজবেকরা সত্যিই বিভ্রান্ত হয় সবুজাভ-নীল তোরণদ্বারের কাছে শহরের পূর্ব দিকের দেয়ালে আমরা হামলা করবো।”
বালির উপরে আঁকা মানচিত্রটার দিকে চিন্তিত মুখে ওয়াজির খান তাকিয়ে থাকেন, যার উপর দিয়ে লম্বা-দেহের পিপড়ার একটা সারি, যোদ্ধার মতো নিষ্ঠায় এগিয়ে চলেছে। কেউ কেউ তাদের বাসার জন্য পাতার টুকরো বয়ে নিয়ে চলেছে। “উজবেকদের শহর থেকে টেনে বের করে আনতে আমরা যাদের পাঠাবো তাদের অবশ্যই আমাদের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আর দ্রুতগামী অশ্বারোহী দলের সদস্য হতে হবে। ধাওয়াকারীদের যেনো তারা সহজেই পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়। বৃত্তাকারে ঘুরে এসে মূল বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে শহর আক্রমণে অংশ নিতে পারে।”
“হ্যাঁ।” বাইসানগার জোরে জোরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। “দক্ষিণে আর পূর্ব দিকে তাদের এভাবে অগ্রসর হতে হবে…” বাবরের ফেলে দেয়া কাঠিটা সে তার বাম হাত দিয়ে তুলে নেয় এবং বালির উপর তীরচিহ্ন আঁকতে আরম্ভ করে। চাহাররাহা তোরণদ্বার অতিক্রম করে দক্ষিণের দেয়াল ঘুরে এসে সুইপ্রস্তুতকারকদের তোরণদ্বার অতিক্রম করে সেটা সবুজাভ-নীল তোরণদ্বারের কাছে এসে শেষ হয়। আর পুরো পরিকল্পনাটা বালির বুকে আঁকতে গিয়ে সে কতিপয় পিঁপড়ের ভবলীলা সাঙ্গ করে ফেলে। কিন্তু তাদের বাকী বেঁচে থাকা সহযোদ্ধার দল কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গি করে পুনরায় সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে তাদের এগিয়ে যাবার গতি অব্যাহত রাখে।
“সুলতান, পুরো পরিকল্পনাটা কিন্তু সাংঘাতিক বিপজ্জনক।” বাইসানগারকে উদ্বিগ্ন দেখায়। আমরা জানি না ঠিক কত উজবেক শহরে অবস্থান করছে বা এর রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে। আমরা যদি তাদের একটা অংশকে বাইরে টেনে বের করে আনতে পারিও, ভেতরে প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থেকে যাওয়া বাহিনীর সংখ্যা। তখনও হয়তো আমাদের জন্য অনেক বেশি বলে প্রতিয়মান হতে পারে। আমাদের প্রথমে বোধহয় গুপ্তচরদের সাহায্য নেয়া উচিত।”
“আমি যেমন এক সময়ে গুপ্তচর ছিলাম?” নর্দমায় বাস করা ইঁদুরের মতো কিভাবে সে গুঁড়ি দিয়ে শহরে প্রবেশ করেছিলো, বাবর সে কথা ভাবে। “না, আমাদের হাতে এতো সময় নেই। আমরা যদি উজবেকদের ফাঁদে ফেলতে চাই তাহলে সেটা অবশ্যই দ্রুত করতে হবে আর ঝুঁকিও নিতে হবে।”
বাবর নিশ্চিত তার কোনো ভুল হয়নি কিন্তু তার পরিকল্পনা যদি ব্যর্থ হয় তাহলে বিপর্যয়ের মাত্রা কতটা ভীষণ হতে পারে? সে মাত্রা নিয়ে ভাববার কোনো চেষ্টাই করে না। ফারগানায় একটা কথা প্রচলিত আছে: “সুযোগ নেবার সাহস যার নেই, বুড়ো বয়স পর্যন্ত সে এর জন্য আফসোস করবে।”
বুড়ো বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার চেয়ে আফসোস করে জীবননাশ করাও শ্রেয়।
***
তিনদিন পরের কথা- বাবর যেমন আশা করেছিলো তার চেয়েও দ্রুতগতিতে তারা দেড়শ মাইল পথ অতিক্রম করে সামনের দু’সারি পাহাড়ের পেছনেই, যা এই মুহূর্তে গ্রীষ্মের দাবদাহে খয়েরী বর্ণ ধারণ করেছে, রয়েছে সমরকন্দ যা কয়েক সপ্তাহ পরেই পাহাড়গুলো আবার তুষারপাতে রূপালি বর্ণ ধারণ করতে আরম্ভ করবে। গত তিন ঘণ্টা যাবৎ বাবরের প্রত্যক্ষ আদেশে, তার লোকেরা প্রায় নিঃশব্দে ধৌরিতক চালে ঘোড়া হাঁকিয়েছে। সামনে কেউ ওঁত পেতে আছে কিনা জানতে গুপ্তদূতের দল নিয়মিত বিরতিতে ফিরে এসে জানিয়েছে যে তারা কিছুই দেখেনি, শোনেনি যা তাদের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে পারে।
বাবর, তারপরেও কোনো সুযোগ নিতে চায় না। উজবেকরা পোড়খাওয়া সব যোদ্ধা। তাজা মাংসের জন্য বেপরোয়া শেয়ালের ধূর্ততা তাদের সহজাত। আর তারা সেভাবেই হত্যা করে থাকে। মুরগির খোঁয়াড়ে প্রবেশ করা শেয়ালের মতো নির্বিচারে তারা প্রতিটা মুরগিকে হত্যা করে। কিন্তু চোয়ালে করে কেবল একটাই চুরি করে নিয়ে যায়।
অন্ধকার রক্তাভ হতে দৃশ্যপট অস্পষ্টভাবে আকার নিতে শুরু করলে, যোদ্ধাদের একটা নিঃশব্দ সারি অবশেষে কোলবা পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। সমরকন্দের আগে শেষ উঁচু পাহাড়ের সারি। পাঁচ বছর আগে বাবর যেখান থেকে প্রথমবারের মতো শহরটা দেখেছিলো। এইবার অবশ্য চূড়োর দিকে না উঠে সে দলটাকে দাঁড়াতে বলে। ওয়াজির খান, বাইসানগার আর অন্যান্য সর্দারদের ডেকে এনে তার শেষ আদেশ দেয়। “কোলবা পাহাড়কে আড়াল হিসাবে ব্যবহার করে। আমরা পশ্চিমে যাবে এবং কোলবা তৃণভূমির লাগোয়া গাছের সারির নিচে ছাউনি স্থাপন করবো। সেখানেই আক্রমণের চুড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে। আমাদের অবস্থান জানাজানি হতে পারে। সেজন্য কোনো আগুন জ্বালান হবে না। আগামীকাল সূর্য উঠবার ঠিক আগে, বাইসানগার তুমি আমাদের হয়ে ফাঁদ পাতা শুরু করবে। আমাদের তিনশ শ্রেষ্ঠ ঘোড়সওয়ার তোমার সাথে থাকবে। আব-ই-সিয়ার তীর ধরে নিচে নেমে তারপরে পশ্চিমে রওয়ানা দেবে। শহরের দেয়ালে নিয়োজিত প্রহরীরা যেনো তোমাদের দেখতে পায় সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করবে। সকালের কুয়াশায় তোমাদের প্রকৃত সংখ্যা প্রহরীর দল বুঝতে পারবে না। কোনো ধরণের ঝুঁকি নেবে না। শেখজাদা তোরণদ্বার অতিক্রম না করা পর্যন্ত নদী অতিক্রম করতে যেও না। আমাদের সাথে তোমাদের পুনরায় মিলিত হবার উপরে আমি অনেকাংশে নির্ভর করছি এবং আমরা দুটো দলে বিভক্ত হবার পরে সবুজাভ-নীল তোরণদ্বারের কাছে শহরের প্রতিরক্ষা দেয়াল আক্রমণ করার সময়ে আমাদের সাথে আবার যোগ দিতে তোমাদের যেনো চার ঘণ্টার বেশি দেরি না হয়।”
