ওয়াজির খান আশ্বস্ত করার মতো কোনো কথা খুঁজে পান না। তারা দুজনেই চুপচাপ বসে থাকে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভাবনার রাজ্যে হারিয়ে গেছে।
নতুন সংবাদের জন্য অবশ্য তাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। শাহরুখিয়ার পশ্চিম থেকে প্রলয়ংকরী বিপর্যয়ের খবর সূর্যাস্তের আগেই এসে পৌঁছে। সওদাগরদের একটা ক্ষিপ্ত কাফেলা যারা সমরকন্দ ছাড়িয়ে এসে পাহাড়ে ছাউনি ফেলেছিল তারা শহর রক্ষাকারী দেয়ালের বাইরে ঘোড়সওয়ার বাহিনীর মাঝে খণ্ডযুদ্ধের খবর দেয়। তারা যুদ্ধের ফলাফল দেখার জন্য অপেক্ষা করেনি। নিজেদের মালবাহী পশুর পাল নিয়ে কোনমতে পূর্বদিকে পালিয়ে এসেছে। অন্য মুসাফিররা চলার পথে শোনা গল্প এসে বলে যে উত্তর থেকে সাইবানি খান আর তার দস্যু বাহিনী এসে সমরকন্দের উপর হামলে পড়েছে।
বাবর সে রাতে ঘুমাতে পারে না, উষ্ণ, গুমোট বাতাস ভারী আর দম আটকানো তার অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তোলে। গতকালই সে হয়তো বাবুরীকে ডেকে পাঠাতো মজার সব গল্প বলে তাকে উৎফুল্ল রাখতে বা ইয়াদগারের কাছে যাবার সময় তাকে সঙ্গ দিতে। কিন্তু এখন সব কিছু বদলে গেছে। সে একাকী জানালায় বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার আঙ্গুলের ভারী আংটিটা চকচক করে। তৈমূর তার স্থানে থাকলে কি করতো? তিনি কি নিয়তির উপরে নির্ভর করে চুপচাপ বসে থাকতেন, কি হয় সেটা দেখার জন্য? না। তিনি পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে আনতে কোনো একটা উপায় ঠিকই বের করতেন।
একটার পরে একটা নিভে আসা মোমবাতির আলোয় বাবর গালে হাত দিয়ে বসে থাকে এবং একটা সময়ে সে অন্ধকারে ডুবে যায়। বারবার সে সব কিছু নিজের মনে বিবেচনা করে। পূর্বের আকাশে সোনালী আভা দেখা দিতে তার হতাশ মনের কোণে আশার ঝিলিক উঁকি দিতে আরম্ভ করে। সহসা নিজের কর্তব্যকর্ম সম্পর্কে সে নিশ্চিত হয়ে যায়। একটা ঝুঁকির কথা সে বিবেচনা করছে এবং ব্যর্থ হলে ঘুরে দাঁড়ানো তার জন্য মুশকিল হবে। কিন্তু এটাই তার একমাত্র সুযোগ…
ভোরের আলো ঠিকমতো ফোঁটার সাথে সাথে সে তার সব পারিষদকে ডেকে পাঠায়। “সাইবানি খান তৈমূরের বংশের সবার জন্য একটা জলজ্যান্ত হুমকী। সে যদি আমাকে পরাস্ত করতে পারে, তাহলে তার পরবর্তী লক্ষ্য হবে আমার সৎ-ভাই জাহাঙ্গীর। সেটা তখন কেবল সময়ে ব্যাপার। সে তৈমূরের পুরো এলাকা দখল করতে চায় এবং সে ঠিক তাই করবে- যদি না আমরা আমাদের মধ্যকার বিরোধ আপাতত ভুলে না যাই। তামবাল আর জাহাঙ্গীরের সাথে আমি ঠিক এ কারণেই মিত্ৰতা করতে আগ্রহী। এই উজবেক বলদটাকে সমরকন্দ থেকে বিতাড়িত করতে সদি তারা আর তাদের অনুগত গোত্র আমাকে সহায়তা করে, তাহলে আমি কথা দিচ্ছি ফারগানার উপর থেকে আমি আমার দাবি প্রত্যাহার করে নেবো…”
ওয়াজির খানের আঁতকে উঠে শ্বাস নেবার শব্দ শুনে বাবর আন্দাজ করে বুড়ো লোকটাকে সে কতোখানি চমকে দিয়েছে। কিন্তু, সুলতান-”।
“আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। কাশিম, তুমি আমার বিশেষ দূত হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে।”
বাবর কঠোর দৃষ্টিতে তার পারিষদবৃন্দের দিকে তাকায়, সহসা নিজের মাঝে সে নতুন দৃঢ়তা অনুভব করছে। “আকশি থেকে কোনো সংবাদ না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে আপনারা কারো সাথে কোনো ধরণের আলোচনা করবেন না। এটা আমার আদেশ।”
বাবর উঠে দাঁড়াবার ফাঁকে ওয়াজির খানের দিকে তাকিয়ে দেখে তাকে কেমন বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। আগের দিন হলে সে তার পরিকল্পনা নিয়ে বৃদ্ধ শার্দুলের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করতে চেষ্টা করতো, তাকে রাজি করাতে। কিন্তু এখন কেউ তাকে সাহায্য করতে পারবে না। তার নিয়তি এটা, নিজেরই বেছে নেয়া। তার সাহসিকতায় যদি কাজ হয়, তবে শীঘ্রই সে আবার সমৃদ্ধ সমরকন্দের মসনদে অধিষ্ঠিত হবে। একে নিজের ন্যায়সঙ্গত সম্পত্তি হিসাবে সে সবসময়ে ভেবে এসেছে বা এটা হারাবার শোক তার কখনও কমেনি। তার মরহুম আব্বাজান এই শহরটার জন্য নিজের মনে গুমরে কষ্ট পেয়েছেন এবং যার কাছে পার্বত্যময় ক্ষুদ্র ফারগানা আর তার অবাধ্য সর্দার আর ভ্যা ভ্যা করা ছাগলের পাল সবসময়েই দ্বিতীয় পছন্দ। তার স্বর্গীয় পিতার ব্যর্থতাকে যদি সে সাফল্যে পর্যবসিত করতে চায়, তাহলে আবেগের বদলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা হবে তার মূল চালিকাশক্তি।
***
পরবর্তী দিনগুলোতে শাহরুখিয়ার চারপাশে প্রথমে একজন দু’জন করে শরণার্থী এসে হাজির হতে শুরু করে। একটা পর্যায়ে গিয়ে সেটা আশেপাশের বসতিতে বাধভাঙা ঢলের মত হাজির হতে শুরু করে। বাবর তার লোকদের পাঠায় তাদের জেরা করতে এবং জানা যায় বেশিরভাগ লোকই সমরকন্দের আশেপাশের গ্রামাঞ্চল থেকে এসেছে। মূল শহর থেকে আগত লোকজনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক রকমের অল্প এবং তাদের ভিতরে সাহায্য চেয়ে আকুল হয়ে খবর পাঠানো মাহমুদের মহাফেজকে খুঁজে পাওয়া যায় না। মাহমুদের স্ত্রী, গ্রান্ড উজিরের কন্যারও কোনো খবর নেই…
দূর্গের প্রকারবেষ্টিত সমতল ছাদ থেকে বাবর ভ্রমণ ক্লান্ত লোকদের বিষণ্ণ শোভাযাত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে। হাতের কাছে যা কিছু পেয়েছে তাই নিয়ে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে- বৃদ্ধ আর নাকে শ্লেষ্ম জমা বাচ্চারা গাড়িতে, যার কোনোটাকে দেড়শ মাইল পথ হাতে টেনে আনা হয়েছে। দিশেহারা মায়েদের শুকনো স্তনবৃন্তে নবজাতকের দল মুখ দিয়ে বৃথাই দুধের সন্ধান করে। ক্ষুধার্ত এসব মুখ- কোনো সাহায্য করবে না বরং তারা একটা বোঝ। বাবর তার সব দূর্গের শস্যভাণ্ডার খুলে দিতে বলে। কিন্তু সেসবও বেশি দিন চলবে না।
