“শোন।” চোখ কুঁচকে তিনি পড়তে আরম্ভ করেন। পঙ্গপালের মতো উজবেকরা আমাদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সংখ্যার ভারে তারা শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তছনচ করে আমাদের বাসিন্দাদের নির্বিচারে কচুকাটা করেছে। বাজারের প্রাঙ্গন আর কুয়োগুলো লাশে বোঝাই হয়ে গেছে, পচছে। আমি আর দরবারের গুটি কয়েক সদস্য এখনও তাদের নজর এড়িয়ে লুকিয়ে আছি কিন্তু আমাদের সামনে সমূহ বিপর্যয়…আমাদের লুকিয়ে থাকার মতো অল্প কয়েকটা স্থানই এখন পর্যন্ত টিকে আছে। মহান আল্লাহতালার অপার করুণা, তার অসীম প্রজ্ঞার বলে যা তিনি অন্যদের দেখানো থেকে বিরত ছিলেন, আমাদের উপরে যেনো বর্ষিত হয়।”
বাবরের মনটা সাথে সাথে ধীর-স্থির হয়ে যায়। সে যখন উত্তেজনায় মনে মনে ছটফট করতে শুরু করেছে এমন সময় বিদ্যুৎ চমকের মতো তার কিছু একটা মনে হয়। “ আমি এখনই আমার দরবার আহ্বান করছি এবং সেখানেই ঠিক করবো। আমাদের কি করণীয়। কিন্তু তার আগে আমাদের আরও তথ্য প্রয়োজন। চিঠির এই সংবাদ অনেক পুরাতন। পশ্চিম দিকে আমি আমার গুপ্তদূত পাঠাবো…”
এসান দৌলত সম্মতি জানান। তাকে দেখে মনে হয় তিনি আর কিছু বলতে আগ্রহী নন। আঙ্গুলের এক তুড়িতে তার দু’পাশে পরিচারিকাদ্বয় এসে দাঁড়ায় এবং তিনি দরজার দিকে হাঁটা ধরেন। বাবর নিজে দরজা খুলে দেয় এবং পেছনে মাথা নত করে অনুসরণরত পরিচারিকাদের নিয়ে মৃদু আলোকিত অলিন্দ দিয়ে দ্রুত জেনানামহলের দিকে হেঁটে যাওয়া তার ঋজু অবয়বের দিকে সে অপলক তাকিয়ে রয়।
সমরকন্দের ঘটনাপ্রবাহে তখনও বিক্ষিপ্ত বাবর দ্রুত হাতমুখ ধুয়ে নেয়। যতো যাই হোক, মাহমুদের এমন নির্মম পরিণতি বাবর কামনা করেনি এবং সাইবানি খানের লোকেরা তৈমূরের অপূর্ব সুন্দর শহরটা কলুষিত করছে, এর লোকদের হত্যা করছে। ভাবতেই তার মন বিষাদ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। সে যদি তার চাচাতো ভাই বা সমরকন্দের দোদুল্ল্যমান বাসিন্দাদের উপরে প্রতিশোধ নিতে চাইতো তারপরেও সে এমন অশ্লীল কষাইয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারত না…।
পৌনে এক ঘণ্টা পরে, আরো একবার সুলতানের উপযুক্ত পোশাকে সজ্জিত হয়ে বাবর তার পারিষদবর্গের দিকে তাকায়। সকালের এই বৈঠকের জন্য অনেকেই মাত্র ঘুম থেকে উঠে এসেছে। তার আঙ্গুলে তৈমূরের অঙ্গুরীয় শোভা পায়- যা পরিস্থিতির গুরুত্বের মাত্রা নির্দেশ করে। “আপনারা নিশ্চয়ই খবরটা শুনেছেন?”
পারিষদবর্গ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
“আমার আশঙ্কা ঘটনাটা সত্যি। কিন্তু আকশি আক্রমণ থেকে আমাদের বিরত রাখতে এটা কোনো ষড়যন্ত্র কি না সেটা জানতে, আমি চাই বাইসানগার আপনি পশ্চিমে সমরকন্দের অভিমুখে গুপ্তদূতের দল পাঠাবেন। দেখতে যে তারা কি জানতে পারে। তাদের অনুসন্ধানের প্রাত্যহিক প্রতিবেদন আমি চাই সবকিছু শান্তি পূর্ণ হলেও। শহরের কাছে তারা যখন পৌঁছাবে- আমি তার একটা বিশদ বিবরণ চাই। উজবেকরা যদি সত্যি সেখানে থাকে তাহলে আমি জানতে চাই সাইবানি খান শহরটা দখলে রাখার পরিকল্পনা করেছে, নাকি এটা কেবলই একটা ঝটিকা হামলা। এখন আপনি যেতে পারেন।”
বাইসানগার যাবার জন্য উঠে দাঁড়ায়।
বাবর এবার তার মুনশির দিকে তাকায়। “আমি একটা চিঠি পাঠাতে চাই।” কাঠের লেখার টুকরোর উপরে লোকটা একটা কাগজ সমান করে বিছায়। তারপরে গলায় চামড়ার ফালি দিয়ে ঝোলানো পাথরের দোয়াতদানে কলম ডোবায়। যেখানে সে প্রতিদিন সকালে ঘন কালো কালির মিশ্রণ প্রস্তুত করে রাখে।
“আমার পরম শ্রদ্ধেয় আব্বাজান।” বাবর বলতে আরম্ভ করে। তারপরে দ্রুত সৌজন্যমূলক সব বিশেষণ আউড়ে যায়- ইবরাহিম সারুর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়, তার সীমাহীন সমৃদ্ধি কামনা করে, আন্তরিকতাহীন অথচ বলার জন্য অনেক কিছু বলে বাবর আসল প্রসঙ্গে আসে: “আপনার বদান্যতা, আমার মসনদ পুনরুদ্ধারে এবং আপনার মেয়েকে আক্ষরিক অর্থে সালতানাতের সুলতানা হতে সাহায্য করতে আপনি তীরন্দাজবাহিনী দিয়ে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমি মর্মাহত যে আমার বারংবার তাগিদ সত্ত্বেও সেই প্রতিশ্রুত বাহিনী এসে এখনও পৌঁছেনি। আমার দরবারে কানাঘুষো শুরু হয়েছে যে আপনার কথার বোধহয় কোনো দাম নেই। এমন ভাবনা আমি আমার চিন্তাতেও আনতে চাই না। আপনি যদি আমাকে এখন নিশ্চিত করতে না পারেন যে, তীরন্দাজ বাহিনী শাহরুখিয়ার পথে রওয়ানা হয়েছে, তাহলে আমি ধরতে বাধ্য হবো যে আপনি আসলেই আমাদের মধ্যে হওয়া চুক্তির বরখেলাপ করেছেন।”
সে স্বাক্ষর করে এবং মুনশীকে বলে তার সীলমোহর সংযুক্ত করতে। ইবরাহিম সারুর এটাই শেষ সুযোগ। তার সাথে একটা গ্রাম্য গোত্রপতির এমন ছলনা মেনে নেয়া যায় না।
বাবর আর তার পারিষদবর্গ, চিন্তিত চেহারায় এবং আন্তরিকভাবে আলোচনা করে। কিন্তু তাদের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় তারা কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে ব্যর্থ হয়। তারা সবাই কেবল প্রশ্ন উত্থাপন করে, যার উত্তর তাদের কারো জানা নেই। বাবর হতাশ হয়ে একটা পর্যায়ে দরবার ভেঙে দেয়, কেবল ওয়াজির খানকে থাকতে বলে।
“সুলতান?”
“সাইবানি খান যদি সমরকন্দ দখল করেই থাকে, তাহলে আমি ভাবছি তার জায়গায় আমি থাকলে তারপরে আমি কি করতাম। আর আমি কেবল একটাই উত্তর পাচ্ছি। আমি আমার সৈন্যদের পূর্বে পাঠাতাম এখানে আমাদের পরাস্ত করতে। তারপরে আকশি গিয়ে তামবাল আর জাহাঙ্গীরকে পরাজিত করতাম। সাইবানি খান তৈমূরের বংশ নির্বংশ করার শপথ নিয়েছে। ফারগানার শেষ দুই বংশধরকে নিমূর্ল করার এই সুযোগ ঘটে বুদ্ধি থাকলে সে হাতছাড়া করবে না।”
