বাবর নিজের সৎভাই জাহাঙ্গীর, চাচাতো ভাই মাহমুদ আর তামবাল তার সাথে কি করেছে ভেবে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে ভ্রুকুটি করে। “আমি তারপরেও রাস্তার জীবনের চেয়ে দূর্গের জীবনই বেছে নেবো- আর তুমিও তাই চাও, নতুবা আজ তুমি এখানে থাকতে না।”
“আমার অন্তত পছন্দ করার সুযোগ ছিলো। আপনি হয় সর্দার হবেন নতুবা আপনার জীবন বৃথা। আপনার পক্ষে কখনও অখ্যাত অবস্থায়, নিরূপদ্রব জীবন কাটানো সম্ভব না। কেউ না কেউ আপনাকে হুমকি হিসাবে দেখবে আর হত্যা করবে। নিজের ভাগ্য বেছে নেবার স্বাধীনতা আমার রয়েছে, আমার সামনে তাই। সম্ভাবনা প্রচুর, যদিও সবই কম উত্তেজনাপূর্ণ। হ্যাঁ, আমি এখানে থাকতে পছন্দ করি, কিন্তু এখানে থাকাটা আমি আমার অভ্যেসে পরিণত করবো না।”
“খুবই সত্যি কথা। আমার মরহুম আব্বাজান প্রায়ই একটা কথা বলতেন, নিজের ভালো একজন খুব ভালোই বুঝতে পারে এবং আমার মনে হয় কথাটা একজন শাহজাদা আর ভিখারীর জন্য সমান প্রযোজ্য।” কথাটা বলেই বাবর ঘুরে দাঁড়ায় এবং শেষ কথাটার জন্য সে নিজেই নিজেকে বাহবা দেয়।
***
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সে বারবার যা করেছে, বাবর নিজের কোমরে আরও একবার মোটা নীল কাপড়ের একটা ফালি কষে বাঁধে। তার পরণের কালো সালোয়ার ছেঁড়াফাটা এবং পিঙ্গল বর্ণের জোব্বার উপরের পরা চামড়ার আঁটসাট জ্যাকেট চকচকে আর পুরাতন।
“সুলতান, সাবধানে থাকবেন।” ওয়াজির খানকে উদ্বিগ্ন দেখায়।
বাবর ধারণা করে, তার এইসব নৈশ অভিযান আর তারচেয়েও বড় কথা বাবুরীর সাথে তার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা, আর রাতের বেলার এইসব অভিযানে তার সঙ্গী হওয়ার ব্যাপারটা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু তার লোকজন কিভাবে বসবাস করছে সেটার একেবারে আসল অবস্থা দেখার এইসব অভিযান বাবরের কাছে ক্রমশ একটা নেশার মতো হয়ে উঠছে। “আমি সতর্ক থাকবো।” তার বুড়ো হয়ে উঠা বিশ্বস্ত বন্ধুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বাবর চুপিসারে কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে পেছনের একটা সংকীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে দূর্গের পেছনের অংশে অবস্থিত একটা ছোট প্রাঙ্গণে নেমে আসে, যেখানে অন্ধকারে বাবুরী তাদের আগে থেকে ঠিক করা স্থানে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
তারা নিরবে পাশের একটা দরজার দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে অবস্থানরত ওয়াজির খানের প্রহরীকে আগে থেকেই সতর্ক করে দেয়া হয়েছে তাদের ব্যাপারে। ফলে সে, নিরবে তাদের বাইরে যেতে দেয়। বাবর চোখ কুঁচকে তাকিয়ে দূর্গ থেকে কয়েকশ গজ দূরে তার আদেশমতো দুটো টাটু ঘোড়াকে জিন চাপানো অবস্থায় দড়ি দিয়ে বাঁধা দেখতে পায়।
তারা ঘোড়াগুলোর বাঁধন খুলে লাফিয়ে পিঠে চেপে বসে এবং টাকরার সাহায্যে একটা শব্দ করে আর ঘোড়াগুলোর পুষ্ট পাঁজরে গোড়ালি দিয়ে তবলার বোল তুলে, অর্ধবল্পিত বেগে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। অসাধারণ একটা ব্যাপার। বাবুরী যেভাবে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে, বাবর ভাবে, তার কখনও ছিলো এমন রক্ত সম্পর্কীয় ভাইয়ে পরিণত হয়েছে। সে তাকে অসি চালনা, আর কুস্তি করতে শিখিয়েছে। এমন কি কিভাবে ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় তীর ছুঁড়তে হয়- ঠিক যেমন ওয়াজির খান তাকে একসময়ে শিখিয়েছিলো। বাবুরী যে আসলেই একজন সহজাত ঘোড়সওয়ার সেটা সে প্রমাণ করেছে এবং কয়েকবার পটকান খেয়ে তার বোধবুদ্ধিও ভালোই হয়েছে, এখন সে বাবরের সাথে প্রায় সমান তালেই ঘোড়া ছোটাতে পারে।
বাবুরী তাকে এর বদলে শিখিয়েছে লোকগান আর নৃত্য- এবং ছিঁচকে চোর হতে হলে লুকিয়ে থাকার যে কৌশল আর পটুতা দরকার সেটাও বাবর তার কাছে থেকে শিখেছে। কিভাবে একজন কৃষকের মতো পোশাক পরতে হবে, যা তাদের নৈশ অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেটাও বাবুরীই তাকে শিখিয়েছে। তারা যখন রাতের বেলা ঘোড়া নিয়ে বেড়াতে বের হয়, তখন গ্রামে আর অস্থায়ী বসতির আশেপাশের বাজারে জিনিসপত্রের দরদাম করে এবং উবু হয়ে গ্রামের বারোয়ারী আগুনের পাশে বসে ধূমায়িত চা পানের ফাঁকে বয়স্কদের গল্প শোনে।
কখনও তার আর অন্যান্য গোত্রপতিদের বিরুদ্ধে বাবর তাদের বিষোদগার করতে শোনে। যাদের কল্যাণে সাধারণ মানুষের জীবন এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রথম প্রথম এইসব মন্তব্য তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলতো, কিন্তু এখন সে শোনার চেষ্টা করে বুঝতে চায়, তার লোকদের মনে আর মননে কি ভাব খেলা করছে। অবশ্য দূর্গে বসবাসকারীদের চারিত্রিক দুর্বলতার বিষয়ে যেসব সম্ভব অসম্ভব গুজব বাজারে প্রচলিত রয়েছে তারা দুজনেই সেসব দারুণ উপভোগ করে। কাশেম- বাবরের নির্বিরোধী আর ধীরস্থির উজির- গুজব রয়েছে তার নাকি এমন একজন পুরুষ সঙ্গী রয়েছে যার যন্ত্র নাকি প্রজনন অশ্বকেও ঈর্ষান্বিত করবে। কিন্তু মুশকিল হলো মেয়েদের মতো পোশাকে সজ্জিত হলে আর বিছানায় বাধা অবস্থায় কেবল তার রমণ প্রবণতা জাগ্রত হয়।
অবশ্য আজ রাতে কাশেমের রুচি রমণের চেয়ে আরেকটা বীর্যবান আকর্ষণ রয়েছে। আজ রাতে তারা যে গ্রামে যাচ্ছে, জহাজাক, সেটা আসলে একটা বেশ্যালয়। যেখানে তারা আগেও অনেকবার গিয়েছে- কাঠের একটা প্রায় ধ্বসে পড়া চালাঘর। যেখানে আগুনের আলোয় মেয়েরা নাচে, সগর্বে নিজেদের পোশাক জাহির করে এবং পুরুষরা তাদের মধ্যে থেকে পছন্দসই মেয়ে নিজের অঙ্কশায়িনী করতে বেছে নেয়। এইসব মেয়েদের একজন ইয়াদগার, তার আকর্ষণীয় স্তন আর প্রশস্ত কটিদেশের কথা চিন্তা করতেই বাবরের শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি দ্রুততর হয়ে উঠে। আজকের পুরোটা দিন আসন্ন অভিযানের প্রস্তুতির ভাবনায় তার কেটেছে। কিন্তু এখন রাত নামতে ইয়াদগারের কোমল আঁধারে নিজেকে প্রোথিত করার তাড়না সে কোনোমতেই দমন করতে পারে না।
