“সম্ভবত এভাবে আমি কথাটা তাকে বলিনি। আমি ভেবেছিলাম সে বিষয়টা জানে। আর আঘাত করার আগে সে আমাকে সেটা বলবার কোনো সুযোগও দেয়নি। পরে, আমি কেবল তাকে পাল্টা আঘাত করা থেকে বহু কষ্টে নিজেকে বিরত রেখেছি। ব্যাখ্যা করার জন্য সেটা উপযুক্ত সময় ছিলো না, বা আর্জি জানাবার। আপনি যদি সত্যিই চান আমি ঘোড়া চালনা শিখি তবে সেটার বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। আর তা যদি না হয়, তাহলে রসুইখানার চেয়ে আস্তাবল অনেক ভাল, বলতেই হবে।”
বাবর তার এক দেহরক্ষীর দিকে তাকায়। “আলী গোসতকে ডেকে আন।”
কিছুক্ষণ পরে, লোকটাকে তার সামনে নতজানু অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়। সে বাবরের মতই, চেঙ্গিস খানের বংশধর, সাগরিচি গোত্রে অন্তর্গত আর ঘোড়ার ব্যাপারে তার দক্ষতা সর্বজনবিদিত। বলা হয় সে একটা স্ট্যালিয়ন মাত্র দু’দিনে বশ মানাতে পারে। বদরাগী আর নিজের বহু কষ্টে অর্জিত মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন আলী গোসত বিশ্বস্ত আর বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন। বাবরের ধারণা বাবুরী নিজের বক্তব্য পেশ করার সময় বা তরিকার ব্যাপারে খুব একটা সচেতন ছিলো না। কোনো সন্দেহ নেই আলী গোসত ভেবেছে বাবুরী বড়াই করছে- বারীন গোত্রের এ ব্যাপারে আবার দারুণ সুনাম রয়েছে। বাবর ভাবে, তারই ভুল হয়েছে, পরিষ্কার করে আদেশটা না দিয়ে।
“আমি চাই এই লোকটা আমার অশ্বারোহী বাহিনীর একজন সদস্যে পরিণত হোক। আমরা এখন তার প্রশিক্ষণ আরম্ভ করবো। শাহী আস্তাবল থেকে তার জন্য একটা ঘোড়ার ব্যবস্থা করো।”
“এখনই করছি, সুলতান।”
কয়েক মিনিট পরে বাবর, সাথে বাবুরী তার বাহনের কেশর আঁকড়ে- একটা শান্ত ঘোটকী- শাহরুখিয়ার দূর্গ থেকে দুলকি চালে বের হয়ে আসে। রক্ষীবাহিনী বরাবরের মতো একটু পেছনে থেকে তাকে অনুসরণ করে। চমৎকার উষ্ণ এক দুপুরবেলা এবং তৃণভূমিতে ফুটে থাকা গবাদি পশুর ভোজ্য এক বোঁটায় তিনপাতা বিশিষ্ট ছোট গাছের সাদা পুষ্ট ফুলে মৌমাছির দল ব্যস্ত ভঙ্গিতে উড়াউড়ি করছে এবং বাতাসে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আছে। বাবর লাগাম টেনে ধরে এবং ঘুরে তাকায় বাবুরীর হালহকিকত দেখতে। সামান্য সোজা অবস্থায় তাকে এখন উপবিষ্ট দেখা যায়, ঘোটকীর কেশর টানা বন্ধ করেছে। “হাঁটু দিয়ে আঁকড়ে ধরে থাকো। গোড়ালির গাঁট ভিতরের মুখ করে নিচের দিকে নামিয়ে রাখবে এবং পায়ের পাতা থাকবে রেকাবের উপরে।”
বাবুরী মাথা নাড়ে, মনোসংযোগের তাগিদে তার ভ্রু কুঁচকে আছে। বাবর ভাবে, ব্যাটার জিনে বসার একটা সহজাত ভঙ্গি রয়েছে এবং ভালো অশ্বারোহী হবে। তার জীবন এতোদিন কেমন কেটেছে? বাবরের পক্ষে সেটা কল্পনা করাটা কঠিন। বাবরের চোখে কেবল সুড়ঙ্গ পথে লুকিয়ে সন্তর্পনে সমরকন্দে প্রবেশের পরে লুকিয়ে থাকার সময়ে প্রাঙ্গনের সেই হাড্ডিসার বুড়ো আর তার সেই ছত্রাক আক্রান্ত পেঁয়াজের দৃশ্য ভাসতে থাকে। সেইদিন সকালে বাবুরীও সম্ভবত প্রাঙ্গণের কোথাও দাঁড়িয়ে ছিলো।
“জলদি এসো।” বাবর তাড়া দেয়। “দ্রুত ঘোড়া হাঁকাও।”
“আমি সেটাই চাইছি, কিন্তু সুলতান আমি এই ঘোটকীটাকে মোটেই রাজি করাতে পারছি না।”
***
কয়েকদিন পরের কথা, আস্তাবলের বাইরে বাবর তার ঘোড়ার লাগাম একজন সহিসের কাছে বুঝিয়ে দিচ্ছে যখন, সে বাবুরীকে আস্তাবলের ভিতরে দেখতে পায়। তার দিকে পেছন ফিরে ঝুঁকে নিজের ঘোড়ার পা মালিশ করছে। বাবর সন্তর্পনে তার দিকে হেঁটে যায় এবং তার প্রশিক্ষণ কেমন চলছে জানার জন্য হাত বাড়ায় তার কাঁধে টোকা দেবে বলে। টোকা দিতে গিয়ে সে তার কাঁধ আঁকড়ে ধরে এবং তার দিকে মোচড় দেয়। বাবুরী ধনুকের ছিলার মতো ছিটকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকে আঘাত করার জন্য জড়িয়ে ধরে। সে কাকে ধরেছে সেটা দেখা মাত্র অবশ্য সে বাবরকে ছেড়ে দেয় এবং হাঁটু মুড়ে নতজানু হয়। “আমাকে মার্জনা করবেন, সুলতান। আমি বুঝতে পারিনি।”
“অবশ্যই তুমি বুঝতে পারনি। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়ার কি বিশেষ কোনো কারণ আছে?”
“সহজাত প্রবৃত্তি। আপনার বাল্যকাল যদি রাস্তায় কাটে এবং টের পান আপনার পেছনে কিছু একটা ঘাপটি মেরে রয়েছে, আপনার যথাসর্বস্ব হতে পারে সেটা একটা তামার পয়সা, খাবার বা হয়তো আপনার নিজের স্বাধীনতা- বাঁচাতে আপনাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনেক লোক আছে যারা বাচ্চাদের অপহরণ করে ক্রীতদাস বা আরো জঘন্য উদ্দেশ্যে বিক্রি করে দেয়।”
“তোমার খেয়াল রাখার মতো কেউই কি ছিলো না?”
“আমার আম্মিজান মারা যাবার পরে আর কেউ ছিল না। কিছু মানুষ আসলেই দয়ালু কিন্তু বাকী সবাই সাধারণত বিনিময়ে কিছু চায় হতে পারে সেটা নিতান্তই কতজ্ঞতা বা চাটুবাদিতা কিংবা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো কিছু করা। আপনি সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতে পারেন- রুটির টুকরো চুরি করতে রুটিঘরের পেছনের পথের দিশা বা শীতের রাতে ঘুমাবার গরম জায়গা কোথায় পাওয়া যাবে আরেকটা রাস্তার ছেলের উপরে যদিও সেও আগে নিজের খেয়ালই রাখবে।” “বাইরের পৃথিবীটা কি আসলেই এমন? মানুষ কি এতোই স্বার্থপর?”
“হতে পারে আমি বাড়িয়ে বলেছি। আমার কিছু ভালো বন্ধু ছিলো” বাবুরী বলে, তারপর তার মুখে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। “দরবারের কথা একেবারেই আলাদা? আপনার পারিষদবর্গের ভিতরে কতোজনের উপরে আপনি নির্দ্বিধায় নির্ভর করতে পারেন? নিজের সমগোত্রীয়দের উপরে উঠার জন্য তুচ্ছ সম্মান বা উপহার বা মামুলী সুবিধার জন্য আপনার স্বার্থের বিনিময়ে কে এমন আছে যে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে না? আপনার সমগোত্রীয় কতজন শাসক- আত্মীয় হোক বা না হোক- রুটিঘরের মালিক অন্য খদ্দেরকে বিদায় করতে যখন ব্যস্ত, সেই সুযোগে আমি যেমন রুটিঘরে চুরি করেছি, ঠিক তেমনি, আপনার মনোযোগর বিক্ষিপ্ততার সুযোগ নিয়ে আপনারই রাজ্যে লুটতরাজ চালানো থেকে বিরত থাকবে?”
