“আমারও সেটা পছন্দ যে…তাছাড়া, আমি প্রমাণ করেছি আঘাত সহ্য করার মতো যথেষ্ট মোটা মাথা আমার রয়েছে…এবং রসুইখানায় কাজ করার চেয়ে সেটা অনেক বেশি কাম্য- কখনও কখনও যদি আমাকে মানুষের নাড়িভূড়ি বা নিজেরও কিছু খোয়াতে হয়, তারপরেও।” ছেলেটা এখনও হাসছে।
“খুব ভালো কথা। তুমি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠো, আমার অশ্বারোহী বাহিনীতে তুমি যোগ দেবে।”
বাবর ভেবেছিলো ছেলেটা আনন্দে অধীর হয়ে তাকে কৃতজ্ঞতা জানাবে। কিন্তু দেখে উল্টো তার মুখের হাসি উবে যায়। তার অভিব্যক্তিতে একটা আড়ষ্ঠতা ফুটে উঠে এবং তার ফ্যাকাশে মুখ লাল দেখায়। “কি ব্যাপার কি হয়েছে?”
“সুলতান, আমি ঘোড়ায় চড়তে জানি না।”
নিজের নির্বুদ্ধিতায় বাবর নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে। যাযাবর সমাজে যেখানে কেবল হতদরিদ্ররাই ঘোড়ার ব্যাপারে অজ্ঞ হয়, সেখানে সেটা স্বীকার করাটা লজ্জাজনক। এক গরীব ফেরিওয়ালা কিভাবে অশ্বারোহী বাহিনীতে যোগ দেবার মতো দক্ষ ঘোড়সওয়ার হবে?
বাবুরীকে আরও অস্বস্তিতে ফেলার আগেই সে দ্রুত বলে, “তুমি ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছো যে ঘোড়া দেখে তুমি মোটেই ভীত বোধ করো না। সুস্থ হয়ে অশ্বশালার আধিকারিকের কাছে গিয়ে বলবে সে তোমাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে অশ্বারোহী বাহিনীর যোগ্য করে তুলবে।”
***
“আমরা তাহলে একমত। আগামী পূর্ণিমার পূর্বে যদি জামমীন থেকে মাঙ্গলিঘ তীরন্দাজের দল এসে না পৌঁছে, আমরা তারপরেও আকশির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেব।” বাবর তাকে অর্ধবৃত্তাকারে ঘিরে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে থাকা পারিষদবৃন্দের দিকে তাকায়।
মাঙ্গলিঘ থেকে আগত অতিরিক্ত সৈন্যবাহিনীর এখনও কোনো খবর নেই এবং বাবরেরও ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটেছে। তার অধিকৃত ভূখণ্ড এখনও নিরাপদে তার আয়ত্ত্বে আছে। দূর্গগুলোতে তার বিশ্বস্ত সর্দারদের অধীনে ভালোমতো রক্ষীবাহিনী মোতায়েন করা রয়েছে, কিন্তু তার পক্ষে আর অপেক্ষা করা সম্ভব না। আকশি তাকে অতিসত্ত্বর পুনরায় দখল করতে হবে। তারপরেই সে কেবল নিজেকে ফারগানার সত্যিকারের সুলতান বলে অভিহিত করতে সক্ষম হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিতে পারবে।
“সুলতান ইত্যবসরে আমাদের উচিত সৈন্যবাহিনীর কুচকাওয়াজ অব্যাহত রাখা। অবরোধ যন্ত্র আর নিক্ষেপক আমাদের যথেষ্ট রয়েছে কিন্তু সৈন্যবাহিনীর একটা বিরাট অংশ এখনও সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসাবে জমাট বাঁধেনি। যুদ্ধাবস্থায় আমরা তাদের মাথায় যা ঢোকাতে চেয়েছি, সেটা হয়তো তারা বেমালুম ভুলে বসে থাকবে। আর আমাদের উচিত রসদের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। আমরা যদিও দীর্ঘ অবরোধের পক্ষপাতি নই, শেষ পর্যন্ত হয়তো সেটাই অবধারিত হয়ে উঠতে পারে, ওয়াজির খান বলেন।
“আপনি ঠিকই বলেছেন। আর আমরা যখন অভিযান শুরু করবো, আমাদের উচিত হবে আগেই হামলাকারী বাহিনী পাঠিয়ে গবাদি পশুর পাল দখল করে নেয়া। আকশির রক্ষীবাহিনী নিজেদের খাবার জন্য সেগুলো দখল করার আগেই। বাইসানগার, এই কাজের উপযুক্ত বাহিনী গড়ে তোলার জন্য আমি আপনার উপরে নির্ভর করছি- এমন লোক যাদের আমরা বিশ্বাস করতে পারি। আমার লোকেরা হত্যাযজ্ঞের শিকার যেন না হয় বা তাদের উপরে যেন লুটতরাজও চালান না হয়। আমরা সব কিছু অর্থের বিনিময়ে কিনে নেব। আমি একজন সুলতান যে তার নিজের রাজ্যে ফিরে আসছে, লুটতরাজে প্রবৃত্ত কোনো উজবেক দস্যু নই।”
বাবর উঠে দাঁড়ায়, নিজে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে বলে খুশি হয় এবং অপেক্ষার পালা শীঘ্রই শেষ হবে। অস্থিরবোধ করতে, সে আঙ্গিনায় বের হয়ে আসে এবং তার প্রিয় ঘোড়াকে প্রস্তুত করতে বলে। বিস্মিত সহিসের দল দৌড়ে যায় তার আদেশ পালন করতে। তার দেহরক্ষীর দল নিজেদের ঘোড়ার জন্য চেঁচামেচি শুরু করতে বিভ্রান্তি আরো বেড়ে যায়। সবাই অলস আর অগোছালো হয়ে পড়েছে। সে বাবুরীর চওড়া কাঁধ আর সরু কোমরযুক্ত অবয়ব লক্ষ্য করে, ঝাড়ু হাতে আস্তাবল থেকে বের হয়ে আসতে সে তাকে হাতের ইশারায় কাছে আসতে বলে।
“সুলতান?” আজ বাবুরীকে কোনো কারণে বাবরের চোখের দিকে তাকাতে অনিচ্ছুক মনে হয়।
“তোমার ঘোড়ায় চড়ার প্রশিক্ষণ কেমন চলছে?”
নিরবতা।
“আমি আদেশ দিয়েছিলোম অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্য হবার জন্য তুমি প্রশিক্ষণ নেবে?”
আবারও নিরবতা।
“আর আমি আদেশ অমান্য করা দেখতে অভ্যস্ত নই।” বাবর বিস্মিত হয়। ছেলেটাকে তার আগ্রহী বলেই মনে হয়েছিলো। কিন্তু সে এখনও প্রশিক্ষণ আরম্ভ করেনি। সে বাবুরীকে সাহায্য করতে চায় এবং ভেবেছিলো তার ভিতরে সে একটা আগ্রহ দেখতে পেয়েছে। কিন্তু তার নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হয়েছে। বাবুরী যে বাঁধাকপি ফেরি করতে সে সেগুলোর মতই অকর্মণ্য। হতাশ হয়ে বাবর ঘুরে দাঁড়ায়। ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে সে বাবুরীর চোখের নিচের হাড়ে একটা কালশিটে দাগ দেখতে পায়। “দাঁড়াও, দাঁড়াও। ওটা কিসের দাগ?”
“আপনার অশ্বশালার প্রধান আমাকে মেরেছে।”
“কেন?”
বাবুরী এতক্ষণ পরে এবার চোখ তুলে তাকায়। “কারণ আমি তাকে বলেছিলাম অশ্বারোহী বাহিনীতে যোগ দেবার জন্য ঘোড়ায় চড়া শিখতে চাই। সে বলেছে আমি ঘোড়ার বিষ্ঠা পরিষ্কার করার যোগ্য।”
“তুমি কি তাকে বলেছে যে আমি ব্যক্তিগতভাবে এর জন্য ইচ্ছা পোষণ করেছি?”
