বাবর জিনের উপর থেকে নেমে অচেতন তরুণের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে বাচ্চাটাকে সে তখনও নিজের বাহু দিয়ে আগলে রেখেছে- বাবর এখন দেখতে পায় একটা বাচ্চা মেয়ে। মেয়েটা তখনও ফোঁপাচ্ছে। শিকনির সরু একটা ধারা তার উপরের ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। বাবরের লোকজন তাকে সরিয়ে নিতে সে এবার ছেলেটাকে পিঠের উপর শোয়ায়। বাবর ভাবে, আমারই মতো বয়স দেখছি। ঈগলের মত বাঁকানো নাক, চোখের নিম্নাংশের হাড় উঁচু এবং থুতনিতে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। অসংখ্য যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চোখে সে ছেলেটার মাথার আঘাত খুটিয়ে দেখে এবং কালো চুলের নিচে একটা জায়গা দেখে যেখানটা থেতলে গিয়ে রক্তে চটচট করছে। তরুণ ছেলেটা যার ভাসাভাসা শ্বাসপ্রশ্বাস দেখে। মনে হয় গভীরভাবে অচেতন হয়ে রয়েছে। বাচ্চা মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে বেচারা বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছে। মেয়েটাকে যে বাঁচিয়েছে এটা জানার জন্য যদি সে জীবিত না থাকে তবে ব্যাপারটা দুঃখজনক হবে।
“একে দূর্গে নিয়ে চলো। দেখা যাক আমাদের হেকিম তার কোনো কিছু করতে পারে কিনা।” বাবর ঘোড়ায় উঠে বসে এবং দূর্গের তোরণের দিকে এগিয়ে যাবার সময়ে সে আগের চেয়েও বিষণ্ণ হয়ে উঠে।
***
সেই রাতে, বাবর বুঝতে পারে তার আয়েশার কাছে যাওয়া উচিত। তার নানীজান আর আম্মিজান তাহলে খুশি হবে এবং একবার গর্ভবতী হলে সম্ভবত আয়েশা নিজেও খানিকটা পরিতৃপ্তি খুঁজে পাবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দৌহিত্রের সম্ভাবনায় হয়তো ইবরাহিম সারু প্রতিশ্রুত তীরন্দাজ বাহিনী দিয়ে বাবরকে তার জন্মস্থান আকশি পুনরুদ্ধারের সহায়তা করবে। এখন ভরা বসন্তকাল। তার সৎ-ভাই জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার উপযুক্ত সময়। অথচ সে যখনই জামমীনে তার বার্তাবাহক পাঠায় কখন তীরন্দাজ বাহিনী পৌঁছাবে জানতে, প্রতিবারই সেখান থেকে একই উত্তর আসে: তীরন্দাজ বাহিনী শীঘ্রই পৌঁছাবে, শীঘ্রই…
হাম্মামখানা থেকে বের হয়ে এসে বাবর তার স্ত্রীর মহলের দিকে কর্তব্যপরায়ন ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু সামনে সবুজ চামড়া দিয়ে মোড়া দুই দরজা বিশিষ্ট প্রবেশপথ চোখে পরতে সে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। না। এসান দৌলতকে যেমন বলেছে, সে কারো আদেশে প্রজনন অশ্বের ভূমিকা পালন করবে না। সে একজন পুরুষ যে নিজেকে জানে তার কি ভাললাগে এবং সে তাই করবে। গোড়ালির উপরে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে দ্রুত ফিরতি পথে রওয়ানা দেয়।
***
তরুণের আঘাতের ব্যাপারে বাবরের আশঙ্কা অবশ্য ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। ছয় ঘণ্টা পরে এক পরিচারক এসে তাকে জানায় যে তার জ্ঞান ফিরে এসেছে। ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু কোনো একটা কারণে বাবর আরও জানতে আগ্রহী হয়ে উঠে এবং দুর্ঘটনার দ্বিতীয় দিন সে আদেশ দেয় যদি সম্ভব হয় তবে একটা খাঁটিয়ায় করে ছেলেটাকে যেনো তার কাছে নিয়ে আসা হয়।
ছেলেটাকে ভীষণ ফ্যাকাশে দেখায়। কিন্তু নিজের অধোমুখ অবস্থান থেকে হাত বুকের উপরে রেখে মাথা নুইয়ে সে বাবরকে অভিবাদন জানায়- ভঙ্গিটা করতে তার কষ্ট হয় সেটা পরিষ্কার বোঝা যায় কারণ বেচারা ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠে।
“বাচ্চা মেয়েটাকে ওভাবে বাঁচিয়ে তুমি দারুণ সাহসের পরিচয় দিয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ যে তোমার নিজের জীবন বখশ দিয়ে আল্লাহ তোমার প্রতি উপযুক্ত করুণা প্রদর্শন করেছেন। তোমার নাম কি?”
“বাবুরী, সুলতান।”
বাবর স্পষ্টতই বিস্মিত দৃষ্টিতে এবার তার দিকে তাকায়। বাবুরী একটা অপ্রচলিত নাম। কিন্তু সেই সাথে তার নিজের নামের সাথে দারুণ মিল রয়েছে নামটার। “তুমি কোথাকার বাসিন্দা? তোমার গোত্রের নাম কি?”
“আমার বাবা ছিলেন বারীন গোত্রের একজন যোদ্ধা এবং আপনার মরহুম পিতার অধীনে লড়াই কিন্তু আমি যখন নিতান্তই শিশু তখন তিনি মারা যান। আমার বাবার কথা আমার মনে নেই। আমার মা আমাকে নিয়ে সমরকন্দ চলে যান। কিন্তু সেখানে আমার যখন সাত বছর বয়স, তখন গুটিবসন্তে তিনি মারা যান। তখন থেকেই আমি একা একা মানুষ হয়েছি।”
“তুমি কি করো? যোদ্ধা?”
“না, সুলতান।” বাবুরী এবার বাবরের চোখের দিকে তাকায়। চোখের মণি গাঢ় প্রায় ধূম্রনীল।
“কিছু দিন আগেও আমি বাজারে বাজারে ফেরি করে বেড়াতাম। সমরকন্দের সড়কে আমি বাঁধাকপি ফেরি করেছি।”
“তুমি শাহরুখিয়ায় কিভাবে এসেছো?”
“সুলতান, আপনি যখন সমরকন্দ অবরোধ করেছিলেন তখন আমি আপনার এক সর্দারের অধীনে পানি বাহকের কাজ নেই। তিনি ফারগানা চলে যাবার পরে আমি থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেই।” কোনো রকমের ভনিতা না করে বাবুরী কথা বলে যায়।
“কিন্তু আমি তোমাকে আগে কখনও দেখিনি?”
“এতে অবাক হবার কিছু নেই। আমি এখন রসুইখানায় কাজ করি। ভেড়ার চামড়া ছাড়াই, মুরগীর নাড়িভূড়ি পরিষ্কার করি। বলবার মতো কোনো কাজ না তবে কাজ।” তার ঠোঁটের কোণে একটা আধো হাসি ফুটে উঠে। “আরও খারাপ কিছু কপালে জুটতে পারতো।”
বাবর বিস্মিত হয়ে ভাবে সে আমাকে নিয়ে রসিকতা করছে। আমি তার কাছে আনন্দের উপকরণ। “আমি নিশ্চিত আরো খারাপ কিছু হতে পারতো- মাঝে মাঝে নিয়তি যা নির্ধারিত করে রেখেছে আমাদের সেটাই মেনে নিতে হয়, এমনকি সেটা মুরগীর নাড়িভূড়ি বের করা হলেও। কিন্তু নিয়তি সম্ভবত এবার অন্য কিছু ঠিক করেছে। তোমার সাহসিকতা দেখে মনে হয়েছে সৈন্য হবার যোগ্যতা তোমার রয়েছে।”
