খোঁচা খেয়ে সে পাল্টা চিৎকার করে, “আপনি মোটেই আমার মালিক নন, আর আমিও কোনো প্রজনন ঘোড়া নই যে আদেশ করা মাত্র প্রজনন ঘুড়ির উপরে উপগত হবো।”
বিয়ের ব্যাপারে সে কোনো আপত্তি করেনি, এবং এর প্রয়োজনীয়তা সে অনুধাবন করতে পেরেছে। কিন্তু সে নিজে যেচে পড়ে বিয়ে করতে চায়নি এবং তার স্ত্রীর শীতল অবজ্ঞা- তাদের বিয়ের দিনই যা আপাতভাবে প্রতিয়মান হয়ে উঠেছিলো একটুও কমেনি বরং দিন দিন সেটা আরও কঠিন হয়েছে। আয়েশা বাবরের সাথে কদাচিৎ কথা বলে, আর যা বলে সেটাও তার কোনো অনুরোধ বা প্রশ্নের জবাবে এক শব্দের উত্তর। সে কখনও তার মুখে হাসি দেখেনি- একবারের জন্যও না। হাসলে হয়তো তার চেহারা একটু কোমল হয়তো এবং আয়েশার প্রতি তার নিজের অনুভূতিও হয়তো বদলাতো। আয়েশার সাথে শয্যায় তার কেবল মনে হয় একটা। উষ্ণ মৃতদেহের সাথে সে শুয়ে আছে তার অপ্রতিরোধী দেহের মাঝে সে নিজেকে যখন নিঃশেষ করছে, তখন তার আপাত পলকহীন কালো চোখ দুজনের মাঝের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কোনো আবেগ, কোনো প্রতিক্রিয়া বা কোনো ধরণের নৈকট্য ব্যাতিরেকে।
আয়েশার মনের ভিতরে কি খেলা করে? বসন্তের আগমনে অঙ্কুরোদগমের ফলে সবুজ হয়ে উঠা বনানীর মাঝে একটা পথ ধরে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যাবার সময়ে বাবর আবারও কল্পনা করতে চেষ্টা করে মানসিক বা শারীরিক কোনোভাবেই কেননা আয়েশা কোনো ধরণের প্রতিক্রিয়া তার প্রতি প্রদর্শন করে না। দোষটা কি তার নাকি আয়েশার? আয়েশারই দোষ নিশ্চয়ই। মেয়েটার সমস্যাটা কোথায়? আয়েশার অনুরোধে জেনানামহল থেকে দূরে তার আর তার মাঙ্গলিঘু পরিচারিকাদের জন্য আলাদা বাসস্থানের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সে যখনই আয়েশার মহলের দিকে হেঁটে যায় দূর থেকে তাদের বিচিত্র ভাষায় কথা বলতে শোনে। কখনও তাদের। হাসির আওয়াজও ভেসে আসে। কিন্তু সে যাহা মাত্র ভিতরে প্রবেশ করে তারা সাথে সাথে নিরব হয়ে যায়। আয়েশা তার মাথা নুইয়ে তাকে আনুষ্ঠানিক অভিবাদন জানায়। তারপরে তার উদ্যোগের জন্য, ভাবলেশহীন চোখ নিচের দিকে নামিয়ে নিরবে অপেক্ষা করে। স্ত্রীর চেয়ে ক্রীতদাসীর সাথেই তখন তার সাদৃশ্য বেশি। অবশ্য একটা পার্থক্য আছে সেটা হলো ক্রীতদাসী বিনয়ী হয় কিন্তু আয়েশার মাঝে সেটাও নেই।
বাবরের কাছে মনে হয় আয়েশা তার অহংকার বর্মের মতো ব্যবহার করছে নিজেকে আড়াল করে রাখতে। তার এই নির্লিপ্ততা তাকে তাড়িত করে। মাঝেমাঝে তাদের যান্ত্রিক রমণক্রিয়ার সময়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে তার সাথে কঠোর আচরণ করে, নিজের শারীরিক শক্তির রূঢ় প্রয়োগ করে আশা করে সে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে- তা সে যাই হোক। কিন্তু তার মনোবাসনা পূর্ণ হয় না, এবং আয়েশা যদিও তাকে কোনো ধরণের বাধা দেয় না কিন্তু বাবরের নিজেকে আইনসঙ্গত স্বামীর চেয়ে নারীর প্রতি নিপীড়নকারী বলে তখন মনে হয়। আবার কখনও সে তার সাথে নম্র আচরণ করে প্রেমিক পুরুষের মতো তার দেহের কোমনীয় বাঁকে স্পর্শ করে, তার স্তনবৃন্তে চুম্বন দিয়ে তার নিটোল উদরে মুখ রাখে- বয়ঃসন্ধিক্ষণের স্বপ্নে সুখনম্য রমণীদের প্রতি সে যেমন আচরণ করেছে। কিন্তু আয়েশা তাদের মতো কোনো প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন না করে, আড়ষ্ঠভঙ্গিতে ততোধিক অনীহার মাঝে নিজেকে আড়াল করে রাখে।
খানজাদাকে সে যখন লাল হয়ে তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করে- যে শাহী বিয়ের সহযাত্রী হবার জন্য মুখিয়ে ছিলো আর যত্ন নিয়ে বাছাই করা উপহার সামগ্রীর ব্যাপারে ছিলো এত উদার- আয়েশা তার বা তার আচরণের ব্যাপারে তার সাথে কখনও কোনো আলাপ করেছে কিনা, সে মাথা নেড়ে অপারগতা প্রকাশ করে। সে অবশ্য তাকে একটা কথা বলে যে, বিয়ের পর পর সে যখন আয়েশার সাথে তার মহলে দেখা করতে যেতো, তখন সে সব সময়ে তাকে শীতল উদাসীন ভঙ্গিতে অভ্যর্থনা জানিয়েছে। কোনো ধরণের আবেগ দেখানো দূরে থাক, আলাপ করার কোনো ইচ্ছাই সে দেখাতো না- সে তাই বাধ্য হয়ে একতরফা যাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। খানজাদা বলে, ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে, আয়েশা যেনো অন্য কোথাও থাকতে চায়, আর সেখানেই রয়েছে বলে মনে মনে ধরে নিয়েছে।
শাহরুখিয়ার দূর্গপ্রাকারের নিচে যত্রতত্র গড়ে উঠা কাঠের চালাঘর। মাটির ইটের বাসা এবং চামড়ার গোলাকৃতি তাঁবুর দঙ্গলের ভিতর দিয়ে বাবর আর তার লোকেরা ঘোড়া ছুটিয়ে অতিক্রম করার সময়েও সে নিজের ভাবনায় বিভোর হয়ে থাকে। হতদরিদ্র কাপড় পরিহিত অধিবাসীরা আগুনের ধোয়ার পাশে আসনপিড়ি হয়ে বসে রাতের খাবারের আয়োজন করছে, যখন তাদের বাচ্চারা ঢালু গলিপথে খালি পায়ে দৌড়ে বেড়ায়। সংকীর্ণ নালা, যেখান দিয়ে বর্জ্য প্রবাহিত হয় তার উপর দিয়ে লাফিয়ে যায় আর অন্যরা আবর্জনা এবং জঞ্জালের ঢিপির উপর দিয়ে বীরবিক্রমে লাফ দেয়। তারা পাথর নির্মিত তোরণদ্বারের লোহা দিয়ে বাঁধানো দরজার দিকে এগিয়ে যেতে, একটা বাচ্চা ছেলে- দুই কি তিন বছরের বেশি বয়স হবে না সহসা দৌড়ে বাবরের সামনে এসে পড়ে। আতঙ্কে চিহি শব্দ করে উঠে তার ঘোড়া পিছনের পায়ে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
বাবর গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে লাগাম টেনে ধরে বাদামী আজদাহাটার মুখ ঘুরিয়ে নেয়। যাতে আতঙ্কিত হয়ে এলোপাথাড়ি চালাতে থাকা ঘোড়ার খুরের আঘাত থেকে বাচ্চাটা বেঁচে যায়, যে এখন চোখ বড় বড় করে উচ্চস্বরে কাঁদছে এবং ভয়ে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাবরের ঠিক পেছনের একজন অশ্বারোহীর ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হয়ে যায় এবং মনে হয় যেনো সে বাচ্চাটাকে মাড়িয়ে যাবে। কিন্তু। পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠামদেহী এক তরুণ সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে শুয়ে পড়ে নিজের দেহ দিয়ে তাকে আড়াল করে রাখে। উচ্চস্বরে অভিশাপ দিতে দিতে আগুয়ান অশ্বারোহী তার বিশাল কালো ঘোড়াটা। নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করে। কোনোমতে তাদের উপর দিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যায়। কিন্তু ঘোড়ার পেছনের পায়ের একটা খুর তরুণের মাথার পেছনে খুব জোরে আঘাত করে।
