আয়েশা বাবরের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। বাবর হাসে এবং আয়েশার কাছ থেকে কোনো ধরণের ইঙ্গিতের আশা করে। কিন্তু এক মুহূর্ত নিরবে দাঁড়িয়ে থেকে সে হাতটা টেনে সরিয়ে নেয় এবং মঞ্চ থেকে নেমে যায়। মাঙ্গলিঘ মেয়েরা সাথে সাথে কাঠের আবডালের আড়াল থেকে উঠে দাঁড়ায় এবং সবাই এগিয়ে এসে আয়েশার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাবর তাজ্জব হয়ে দেখে, আনন্দে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠে, তার কাছ থেকে তারা দুধসাদা রঙের নেকাব টেনে নিয়ে, ঘূর্ণির বৃত্তাকারে ঘোরাতে শুরু করে এবং তার পরণের পোশাকের পলকা আবরণ টেনে ছিঁড়ে।
সর্দার আর তার পরিবার এসব কি শুরু করেছে? বাবর তাকিয়ে দেখে তাঁবুতে প্রবেশের মুখের কাছে ওয়াজির খান দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাবর জানে তার নিজের অভিব্যক্তির মতোই তারও অবশ্যই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। আবডালের আড়ালে এখনও নম্র ভঙ্গিতে বসে থাকা খানজাদার চোয়াল ঝুলে পড়ে আমোদর আভাস পেয়ে। এসান দৌলত আর খুতলাখ নিগার সোজা আড়ষ্ঠ ভঙ্গিতে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেনো এসব অদ্ভুত ব্যাপারে আগ্রহী হবার শিক্ষা তাদের দেয়া হয়নি।
আয়েশা তখনও অর্ধেক আবৃত। এমন সময় যন্ত্রীদল তাদের পিতলের লম্বা বাঁশি, করতাল, ঘণ্টা আর শক্ত করে বাঁধা চামড়ার ঢোল একসাথে বাজাতে শুরু করে দেয়। আয়েশার কাছ থেকে মেয়েরা পেছনে সরে আসে এবং হাত দিয়ে তালি দিয়ে পা ঠুকে তালে তালে তারা গান গাইতে শুরু করে। বাবর এবার টের পায় যে ঘরে উপস্থিত লোকেরা তাঁবুর দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছে এবং মেয়েরা নববধূর চারপাশে একটা মানব ব্যুহ তৈরি করেছে যে, সে আর আয়েশার বাবাই কেবল তাকে দেখতে পাবে। আয়েশা এবার সর্পিল ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করে, মোচড়ায়, বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে যতক্ষণ না মুখের নিচের অংশ ঢেকে রাখা নেকাব ছাড়া, ঝালরের শেষ অংশটুকু দেহ থেকে খসে পড়ে।
বাবর এবার দেখে এক জোড়া কয়লার মতো কালো চোখ চঞ্চল দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। তার মাথার চুল পরিপাটি করে বেণী করা এবং ছোট মাথার চারপাশে। সেটা কুণ্ডলী করে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার লম্বা দেহ, পরনের গাঢ় বেগুনী রঙের শালোয়ার গোড়ালীর কাছে কুঁচকে জমে আছে। আর উধ্বাঙ্গের আঁটসাটো কাঁচুলির কারণে তার তলপেট উন্মুক্ত হয়ে আছে, লম্বা, জালি জালি অন্তর্বাস দিয়ে তার বেঁধে রাখা স্তনযুগলকে দেখে মনে হয় ছোট আর পেষল। একটা গাঢ় রঙের পাথর- খুব। সম্ভবত নীলা- তার নাভিতে দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
“তাকে গ্রহণ করো। সে এখন তোমার।” ইবরাহিম সারু আয়েশার দিকে বাবরকে ঠেলে দেন। “বিয়ের শয্যা তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে- যাও। তাকে উপভোগ করো, ভোজসভা তারপরে আরম্ভ হবে…”
বাবরের হতবাক হওয়া অভিব্যক্তি দেখে তার শ্বশুর হেসে ফেলে। “ফারগানার শাহজাদাদের দুপায়ের মাঝে কি আগুন জ্বলে না?”
বাবরের মুখ লাল হয়ে উঠে এবং সে আয়েশার হাত ধরে। ইবরাহিম সারু একটা আলখাল্লা নিজের মেয়েকে পরিয়ে দিয়ে, দু’বার হাততালি দিতে যন্ত্রীদল উঠে দাঁড়ায়। দু’সারি অবস্থান নিয়ে তারা এখনও তাদের সেই উদ্দাম বাদ্য বাজাতে থাকে।
“তোমার বাসরশয্যা পর্যন্ত তারা বাজনা বাজিয়ে যাবে। আমি আমার অভিজাতদের সাথে তোমাকে অনুসরণ করবো।” ইবরাহিম সারুর মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে আছে।
যন্ত্রদলের বিড়ালের মতো চিৎকার করে বাজনার সাথে বিয়ের শোভাযাত্রা ইবরাহিম। সারুর দৃষ্টিনন্দন তাঁবু থেকে সূর্যালোকে বের হয়ে আসতে বাবরের মাথা দপদপ করতে শুরু করে। জেনানামহলের কাছেই বাসরশয্যার তাবু স্থাপন করা হয়েছে। ফারগানার হলুদ আর জামমীনের কালো লাল নিশানে সেটা জমকালোভাবে সাজানো। বাবর ভাবে, এটা মোটেই প্রীতিকর দৃশ্য নয়।
যন্ত্রীদল ছড়িয়ে গিয়ে, প্রবেশ পথের দু’পাশে অবস্থান নেয়। বাবর আয়েশাকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার সময়ে পরিচারকের দল ভূমিতে কপাল ঠেকিয়ে সেজদার ভঙ্গিতে অবস্থান করে। তাদের পরণে লাল আর কালো পোশাক। বিশাল তাঁবুটা পুরু গালিচা দিয়ে ঢাকা। কিন্তু বাবর যেমনটা আশা করেছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি নিরাভরণ। তাঁবুর ঠিক কেন্দ্রে একটা ঢাউস গদি ধূসর ফুলের ছোপ দেয়া রেশমের কিংখাব দিয়ে ঢাকা। যা দুপাশে দুই বিশাল মোমবাতির ঝাড় আলোকিত করে রেখেছে। গদির উপরে একটা চতুর্ভূজাকৃতি কাঠের কাঠামো থেকে সারি সারি কাঠবিড়ালের চামড়া ঝুলছে। যা টেনে দিয়ে শয্যার চারপাশে একটা আবডাল তৈরি করা যায়। পুরো তাঁবুতে আর কিছু নেই। না কোনো আয়না, না কোনো সিন্দুক বা না কোনো বসার টুল।
বাবর পুরো পরিস্থিতির সাথে ধাতস্থ হবার আগেই কোলাহলরত মেয়েরা আয়েশাকে নিয়ে এসে গদির উপরে বসিয়ে চারপাশে পর্দা টেনে দেয়। যাতে তাকে দেখা না যায়। এক মুহূর্ত পরে পুরুষ পরিচারকবৃন্দ বাবরের পোশাক খুলতে শুরু করে। ব্যগ্র, কৌতূহলী আঙ্গুল মাথা থেকে পাগড়ি তুলে নিয়ে তার বর্হিবাস আর জোব্বার বাঁধন আলগা করে। শালোয়ার বন্ধনমুক্ত করে দু’পা থেকে পর্যায়ক্রমে বুট খুলতে শুরু করলে বাবর বহু কষ্টে তাদের ধমক দেয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখে। নিমেষের ভিতরে বাবর নিজেকে নগ্ন দেখতে পায়। পরিচারকের দল এবার একটা রেশমের আলখাল্লায় তাকে মুড়ে দিয়ে, কিছু একটা বলতে শুরু করে। তারা কি বলছে বাবর বুঝতে পারে না, কিন্তু আন্দাজ করে পর্দার পেছনে থাকা মেয়েদের উদ্দেশ্যে কিছু একটা বলেছে যারা দ্রুত চোখের দৃষ্টি অন্যদিকে করে তাবু থেকে বেরিয়ে যায়। পুরুষ পরিচারকের দল তাদের অনুসরণ করে যাবার আগে তাঁবুর প্রবেশপথের পর্দা শক্ত করে আটকে দিয়ে যায়।
