সহসা শিবিরের অন্যপ্রান্ত থেকে কর্ণবিদারী একটা চিৎকার ভেসে উঠে। “সুলতান, জেনানামহলের দিক থেকে আসছে।” বাবরের অভিব্যক্তিতে বিভ্রান্তির ছায়া দেখতে পেয়ে তার একজন পরিচারক বলে। “বধূকে তারা বিদায় জানাচ্ছে ঠিক যেভাবে আর কয়েক ঘণ্টা পরে সে নিজের কুমারীত্বকে বিদায় জানাবে।” মেয়ের কণ্ঠের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রায় আর্তনাদের মত শোনায়। আওয়াজটা মোটেই শ্রুতিমধুর না- ফারগানার গ্রামে বিয়ের সময় যেমন হর্ষোৎফুল্ল গানের আওয়াজ শোনা যায় তার সাথে এর কোনো মিলই নেই। বিলাপের সাথেই বরং এর মিল বেশি।
বাবরের তাঁবুর পাশে তৈরি করা আরেকটা তাঁবুর নিচু প্রবেশপথ দিয়ে সুন্দর পোশাকে সজ্জিত ওয়াজির খানকে ঝুঁকে বের হয়ে আসতে দেখে বাবরের মনটা খুশিতে ভরে উঠে। “সুলতান, আপনার বিবাহ দিবসে আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।” ওয়াজির খানের এক চোখের দৃষ্টিতে উষ্ণতার ছোঁয়া এবং সে আজ তার পাশে থাকবে ভেবে বাবর কৃতজ্ঞবোধ করে। “সুলতান, আপনি কি প্রাতঃরাশ করেছেন?”
“আমি মোটেই ক্ষুধার্ত নই। কিছুক্ষণ আগেই আমি পানি পান করেছি।”
ওয়াজির খানের অভিব্যক্তিতে বাবর সহমর্মিতা দেখতে পায়।
“আমাদের রক্ষীদল শীঘ্রই এখানে এসে উপস্থিত হবে আপনার সাথে সহচর হিসাবে বিবাহ মণ্ডপে যাবে বলে।”
“ওয়াজির খান…” বাবর বুঝতে পারে না সে কি বলতে চায় এবং সে কিছু ভাববার আগেই আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে ঢাক ঢোল বেজে উঠতে রমণীদের আতঙ্কজনক বিলাপের শব্দ চাপা পড়ে যায় এবং সে দেখে ওয়াজির খানের লোকেরা ফারগানার উজ্জ্বল হলুদ রঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে দু’সারিতে এগিয়ে আসছে এবং তাদের সামনে রয়েছে তার নিজস্ব যন্ত্রীদল। একটা সহিস বাবরের বাদামী বর্ণের আজদাহাটার লাগাম ধরে টেনে আনে। আজকের বিশেষ উপলক্ষের জন্য একটা উজ্জ্বল হলুদ রঙের পর্যানের কাপড় তার বস্ত্রাবরণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। লেজ আর কেশর হলুদ ফিতা দিয়ে বেণী করা আর মাথায় সোনালী-বাদামী বর্ণের বাঘের চোখ পাথরের তৈরি সাজ।
বাবর জিনে উঠে বসে এবং তার লোকদের ঘোড়ার লাগাম ধরে গত রাতে যেখানে ভোজসভা হয়েছিলো সেই একই তাঁবুর সভাগৃহের দিকে নিয়ে যাবার অনুমতি দেয়। এখন সেখানে ইবরাহিম সারু তার মেয়েকে নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছেন। বাবর জিনের উপর থেকে নামতে, কালো পোশাকে সজ্জিত মাঙ্গলিঘ রক্ষীবাহিনী তাকে অভিবাদন জানায়। তূর্যনাদের মাঝে ধীরে ধীরে সে গাঢ় বেগুনী মখমলের আলখাল্লা পরিহিত ইবরাহিম সারুর দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে।
তিন ফুট উঁচু জাফরিকাটা কাঠের পর্দা দিয়ে আলাদা করা একপাশে ইবরাহিম সারুর দরবারের রমণীরা রয়েছে। তাদের মুখের নিচের অংশ নেকাবের আড়ালে। কিন্তু হাল্কা আবরণীর উপরে তাদের ঘন আর লম্বা পাপড়ির নিচের কালো চোখ তাকে পরিষ্কার কৌতূহলে জরিপ করছে। তাদের কেন্দ্রে, সম্মানিত স্থানে, সে তার। নানীজান, আম্মিজান আর বোনকে দেখতে পায়। মাথা আর ঘাড় ভালো করে সোনার তারাখচিত একটা নীল রঙের শাল দিয়ে আবৃত করে পিঠ সোজা করে বসে আছেন এসান দৌলত। খুতলাঘ নিগারের পরণে একটা ঢিলেঢালা হলুদ জোব্বা এবং কয়েক গাছি মুক্তার মালা গলার শোভা বাড়িয়েছে। গর্বিত চোখে বাবরের দিকে তাকিয়ে আছেন। যখন খানজাদার চোখ- মাঙ্গলিঘ রমণীদের চেয়ে অনেক বেশি কমনীয়- চকচক করে।
বিশাল তাঁবুটার ঠিক কেন্দ্রে, মেরুন রঙের গালিচা পাতা মঞ্চের উপরে তার স্ত্রী সোনালী তাকিয়ায় বসে আছে। ধূপ দিয়ে সুবাসিত করা কয়লা ভর্তি ঝুড়ি তার সামনে জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে সোনালী কাপড়ের তৈরি মস্তকাবরণের নিচে থেকে বের হয়ে আসা দুধসাদা রঙের ভারী কাপড়ের নেকাবই তাকে আড়াল করে রাখেনি, মাথার উপরের ছাদে অবস্থিত গবাক্ষের খুলে রাখা পর্দার দিকে বাতাসের সাথে পাঁক খেয়ে উঠে যাওয়া ধোঁয়ার কুণ্ডলীও তাকে ঢেকে রেখেছে। বাবর তার দিকে হেঁটে যেতে, আয়েশা স্থাণুর ন্যায় বসে থাকে। বাবর যে শীঘ্রই তার শৌহর হবে সে বিষয়ে কোনো ধরণের সচেতনতা তার মাঝে প্রকাশিত হয় না। আয়েশার অভিব্যক্তি দেখতে তার ইচ্ছা করে।
ভেরীর আওয়াজ স্লান হয়ে আসে এবং মুহূর্তের জন্য চারপাশে নিথর নিরবতা নেমে আসে।
“আয়েশা!” তার বাবার ডাক শুনে, মেয়েটা উঠে দাঁড়ায়। তাকে লম্বাই দেখায় কিন্তু স্থূলকায়া নাকি ক্ষীণাঙ্গী, দেহসৌষ্ঠব সাবলীল নাকি অন্যরকম, বাবর কিছুই বুঝতে পারে না। সে কেবল মেয়েটার লম্বা পায়ে মেহেদীর ভরাট বরফিকাটা নকশা লক্ষ্য করে।
“এদিকে এসো।” ইবরাহিম সারু বাবরকে মঞ্চে উঠে তার হবু বধূর মুখোমুখি হতে ইশারা করে। এরপরে, তিনি নিজের মেয়েকে বোরখার ভেতর থেকে ডান হাত বের করে তার দিকে এগিয়ে দিতে বলে। হাতটা ধরে। তিনি সেটা বাবরের ডান হাতের উপরে স্থাপন করেন। আয়েশার হাত শুষ্ক আর শীতল।
কালো আলখাল্লা পরিহিত, শ্মশ্রুমণ্ডিত লম্বা এক মোল্লা এবার এগিয়ে আসে এবং মন্দ্র, অনুনাদক কণ্ঠে কিছু আবৃত্তি করে। কিছু সুরেলা কণ্ঠে সুর করে বলে, যা সম্ভবত দোয়া বা আশীর্বাদ হবে বলে বাবর মনে করে। সে যদিও পুরোটা মনোযোগ দিয়ে শুনে, কিন্তু সে বুঝতে পারে না কোনো ভাষায় লোকটা কথা বলছে। খুব সম্ভবত ফার্সী হবে। অবশেষে মোল্লার দোয়া শেষ হয় এবং বুকের কাছে কোরান শরীফ ধরে সে পিছিয়ে আসতে, ইবরাহিম সারু এক মুঠো শস্য তরুণ দম্পতির উপরে ছিটিয়ে দেন। পুরুষকণ্ঠের সম্মিলিত ঐক্যতানে পুরো তাবুটা গমগম করে উঠে এবং সহসা মুঠি ভর্তি আঁশযুক্ত শস্যদানা বাতাসে ভাসতে থাকে। মাঙ্গলিঘ মেয়েরা বাতাসে ডানামেলা পাখির ঝাঁকের মতো উঁচু আর কর্ণবিদারী উলুধ্বনি দিতে শুরু করে।
