সমরকন্দের সাথে এর কোনো তুলনাই চলে না কিন্তু ইবরাহিম সারু অতিথিদের জন্য এমন জাঁকজমকপূর্ণ শিবির স্থাপন করতে তার সাধ্যের অতীত চেষ্টা করেছে। আগের দিন রাতে তারা যখন এখানে এসে পৌঁছায়, দেখে সারি সারি তাঁবু বাবরের লোকদের জন্য যে তাঁবুগুলো সেগুলোর উপরে ফারগানার হলুদ নিশান উড়ছে এবং তার কেন্দ্রে রয়েছে বাবরের নিজস্ব বিশাল আনুষ্ঠানিক তবু একটা। দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য। কোনো সন্দেহ নেই ইবরাহিম সারুও ঠিক তাই চেয়েছে।
কারুকাজ করা ধাতব বকলেশ দিয়ে আটকানো প্রবেশ দ্বারের পর্দার ফাঁক দিয়ে গুটিগুটি পায়ে প্রবেশ করা আলোর তীব্রতা দেখে বাবর ধারণা করে অনেক আগেই সকাল হয়েছে। সে গত রাতে ইবরাহিম সারুর কারুকাজ করা চাদোয়া আর প্রবেশ পথ পর্যন্ত গালিচা বিছানো তাঁবুর দরবার মহলে আয়োজিত পোলাও, ভেড়ার মাংসের কাবাব, মাটির নিচে জন্মানো সজি আর কড়া পানীয় সহযোগে আয়োজিত নৈশভোজের কথা চিন্তা করে। বাবরের ইচ্ছা ছিলো সন্ধ্যেটা এসান দৌলত, খুতলাঘ। নিগার আর তার বোনের সাথে মেয়েদের তাবুতে কাটায়। কিন্তু সেটা অবশ্য সম্ভব না। পুরোটা সন্ধ্যাটা তাকে হাসি হাসি মুখে বসে বাজিকরের ভেল্কি, আগুন-খেকোর দক্ষতা, নিপূণ দড়াবাজের কসরত, এবং নাদুসনুদুস দেখতে বাঈজিদের কোমরের দুলুনি দেখতে হয়েছে। যারা নিজেদের ভরাট বুক আর নিতম্ব আঁকাবার ফাঁকে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। এরপরে, সে হাসি হাসি মুখে বসে তার নিজের আর ইবরাহিম সারুর লোকদের একসাথে নাচগান করার ফাঁকে, শীঘ্রই তারা একে অপরের সহযোদ্ধায় পরিণত হবে বলে পরস্পরের স্বাস্থ্য পান করতে দেখেছে। যতক্ষণ না তারা সুরার নেশায় বিভ্রান্ত হয়ে মেঝেতেই শুয়ে ঘুমিয়ে না পড়েছে।
বাবর যে অনায়াসে যে কোনো লোকের মত পান করতে পারে। গত রাতে অল্পই পান করেছে, আশা করেছে যে ইবরাহিম সারু হয়তো তাদের আসন্ন মৈত্রীর বন্ধন সম্পর্কে তার সাথে কথা বলতে চাইবেন। অনেক কিছু আলাপ করার বাকী আছে। সে নিশ্চিত, তার হবু শ্বশুরের সাহায্যে আকশি আক্রমণ করে কয়েক সপ্তাহ না হোক অন্তত কয়েক মাসের ভিতরে সে তার সিংহাসন উদ্ধার করতে পারবে। তারপরে সমরকন্দ থেকে তার চাচাতো ভাই মাহমুদকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করাটা কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ইবরাহিম সারু এসবের আশপাশ দিয়ে যায় না, কেবল সামাজিকতা রক্ষার্থে মামুলি কথাবার্তা বলে এবং বাবরও অনুভব করে এমন আনন্দের সময়ে যুদ্ধের আলোচনা করাটা অভদ্রতা হবে, সে তখন নিজেকে সংযত করে।
গায়ের উপর থেকে বাবর নরম চামড়ার কম্বল, যার নিচে সে আরামে রাত কাটিয়েছে, সরিয়ে উঠে বসে। ভবিষ্যতের গর্ভে কি অপেক্ষা করছে ভেবে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নিজের পরিস্থিতি আর নিজের উপরে সে যুগপৎ অস্থির হয়ে উঠছে। এই মুহূর্তে এক অচেনা তরুণীকে বিয়ে করার বদলে সে তার লোকদের নিয়ে যুদ্ধে যাবার জন্য যে কোনো কিছু করতে রাজি আছে। কিন্তু সে একজন সুলতান, বীর আর যোদ্ধা এবং এখন সে প্রাপ্তবয়স্ক একজন পুরুষ। পাহাড়ে কাটানো সেইসব নিঃসঙ্গ সময়ে সে কত রাত শক্ত মাটির উপরে শুয়ে মাথার উপরের শীতল রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কোমল, উষ্ণ নারীদেহের কথা কল্পনা করেছে?
সে কেন তাকে সঙ্গ দিতে কাউকে ডেকে পাঠায়নি? তার অবশ্য নির্দিষ্ট কোনো পছন্দ ছিলো না। সম্ভবত সেটা ছিলো পিতৃহীন একমাত্র ছেলের বিনয়াভিমান। এমনও হতে পারে সেই পরিস্থিতিতে কোনো সন্তানের জনক হবার ব্যাপারে সে। অনিচ্ছুক ছিল? সম্ভবত নিজের মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে অতিরিক্ত সচেতন সে চায়নি বারবণিতাদের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে বা সেরকম মেয়ে তার কাছে আসুক সে ব্যাপারেও তার আপত্তি ছিলো। তার আগে অনেক শাহজাদাই তাদের সাথে মানানসই না এমন নারীর কল্যাণে সালতানাৎ হারিয়েছে। কিন্তু আজ রাতে একজন নারীকে আলিঙ্গন করতে তার মালিক হিসাবে নিজেকে কল্পনা করার অনুভূতি কেমন সে অনুভব করবে। তার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
তার শ্বশুরের সৌজন্যতাবশত জোর করে পাঠানো চারজন পরিচারককে সে হাততালি দিয়ে ডাকে। আজ তার বিয়ে এবং তার অবশ্যই উচিত নীতিনিয়মের শুদ্ধতা উদযাপন করা। তাঁবুর বাইরে থেকে তাদের ভেসে আসা আলাপচারিতার আওয়াজ সে শুনতে পায় এবং তার ইশারা শুনে তারা ভিতরে প্রবেশ করে তাঁবুর পর্দা উঠিয়ে দিলে সূর্যের আলোয় ভেতরটা আলোকিত হয়ে উঠে।
বাবরের বিয়ের পোশাক- হরিণের নরম চামড়ার তৈরি শালোয়ার, হলুদ রেশমের তৈরি খাটো আস্তিনযুক্ত আজানুলম্বিত আঁটসাট বহির্বাস, সাথে তার মরহুম আব্বাজান নিজের বিয়েতে যে সোনার ভারী কোমরবন্ধনী ব্যবহার করেছিলেন সেটা এবং উপরে পরার জন্য তামার কারুকার্যখচিত আলখাল্লা- আগের রাতে সবই গাঁটরি খুলে বের করে গম্বুজাকৃতি একটা সিন্দুকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। একটা উঁচু নীল মখমলের টুপি, খানজাদা যেটাতে ছোট ছোট মুক্তা যত্ন নিয়ে বসিয়েছে এবং সাথে ঈগলের পালকের তৈরি শিরস্ত্রাণ কাছেই একটা টুলের উপরে রাখা।
দু’ঘণ্টা পরে হাম্মামখানার তাঁবুতে গরম পাথরের উপরে ফোঁটানো পানিতে গোসল করার পরে তার পরিচারকের দল টাটকা তাজা ঔষধি লতাগুল্ম দিয়ে তার দেহ ভালো করে রগড়ে মুছে দেয়। তার লম্বা চুল সুগন্ধি তেল দিয়ে আচড়িয়ে দেয় এবং তাকে তার নির্বাচিত পোশাকে সজ্জিত করলে, বাবর পুরো দিনের মতো প্রস্তুত হয়। সূর্যের আলোয় পা রাখতে তার উষ্ণীষের ঈগলের পালকের লম্বা ছায়া প্রতি পদক্ষেপের সাথে সাথে মাটির অনেক দূর পর্যন্ত নাচতে নাচতে এগিয়ে যায়।
