যাত্রা শুরু করার পরে ষষ্ঠ দিন দুপুরে, ষাঁড়ের গাড়ির পাশে প্রশান্ত মনে বাবর যখন ঘোড়ার পিঠে উপবিষ্ট হয়ে এগিয়ে চলেছে এবং যে সময়ে তারা একটা পাহাড়ের ঢালের পাদদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দূরে দিগন্তের নিচে কালো-আলখাল্লা পরিহিত একদল ঘোড়সওয়ারের একটা সারি দেখা যায়। ওয়াজির খান সাথে সাথে চামড়ার দাস্তানাযুক্ত হাত উঁচু করে থামবার সংকেত দেয়।
“ওয়াজির খান, কি মনে হয় আপনার? ওরা কারা? মালিক ঘোড়সওয়ার?” বাবর চোখ কুঁচকে তাকিয়ে জানতে চায়। কিন্তু বৈশিষ্ট্যসূচক কিছু- কোনো নিশান, বা কোনো পতাকা- তার চোখে কিছুই আটকায় না। ঘোড়সওয়ারের দলটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে কেবল তাকিয়ে থাকে।
“সুলতান, তারাই সম্ভবত। আমরা নিশ্চয়ই তাদের সীমান্তের কাছে পৌঁছে গেছি। কিন্তু আমাদের অগ্রবর্তী রক্ষীবাহিনী এসে কিছু না জানানো পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।”
“ঠিক আছে। তারপরেও, নিশ্চিত হতে আরও গুপ্তদূতের দল পাঠাও আর একটা রক্ষণাত্মক বিন্যাসে কাফেলাকে বিন্যস্ত কর।”
ওয়াজির খানের বাছাই করা বারোজন যোদ্ধার একটা দলকে কোমরে তরবারি ঝুলিয়ে, পর্যাণে রণকুঠার এমনভাবে রাখা যেনো হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় এবং এতোক্ষণ পিঠে বাঁধা বৃত্তাকার ঢাল বাম হাতে চামড়ার ফালি দিয়ে দৃঢ়ভাবে আটকে নিয়ে, বাবর দ্রুতবেগে শিবির ত্যাগ করতে দেখে। দলের শেষ দু’জন যোদ্ধা বর্শা বহন করছে। সবকিছুর জন্যই প্রস্তুত থাকা ভালো। কি হচ্ছে সেটা নিয়ে মেয়েরা হয়তো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে বুঝতে পেরে, বাবর ঘোড়া নিয়ে দুলকিচালে ষাঁড়ের গাড়ির কাছে এগিয়ে যায় এবং ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝুঁকে পড়ে চামড়ার পর্দার ভেতরে মাথা প্রবেশ করায়। “সামনে সম্ভবত ইবরাহিম সারুর অশ্বারোহীরা রয়েছে কিন্তু তাদের পরিচয় সম্পর্কে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে। আমরা আমাদের গুপ্তদূতদের ফিরে আসবার জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু সেই অবসরে আমরা নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছি।” তার আম্মিজান আর খানজাদা ঘুমে চুল ঢুল করলেও, এসান দৌলতের উজ্জ্বল চোখজোড়া সতর্ক, সে মাথা নাড়ে। “ঠিক আছে। কোনো সুযোগ দেবার প্রয়োজন নেই।”
কয়েক মিনিট পরে, ওয়াজির খান তার তীরন্দাজদের আশেপাশের গাছপালা আর পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকতে আদেশ দেয়। ষাড়ের গাড়ির চারপাশে মালবাহী গাড়িগুলোকে বৃত্তাকারে বিন্যস্ত করে অবশিষ্ট সৈন্যদের দিয়ে একটা রক্ষণাত্মক ব্যুহ রচনা করে। কিন্তু সব আয়োজন শেষে অপেক্ষার পালা যেনো আর শেষ হতে চায় না। বাবর কান খাড়া করে রাখে। বাতাসে ভেসে আসা কোনো অবাঞ্ছিত শব্দ শুনতে চেষ্টা করে। কোথাও কিছু নড়াচড়া শব্দ শোনা যায় না। তারপরে তাদের মাথার উপরে পাহাড়ের ধারে ছাগলের একটা পালের গলায় বাঁধা ঘণ্টার বেসুরো সুর শোনা যায়। পালটা খেদিয়ে আনা রাখাল ছেলেটা নিচের দৃশ্যপটের দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে দেখে এবং হাতের লাঠিটা পাগলের মতো আন্দোলিত করে ছাগলের পালকে পুনরায় চোখের আড়ালে নিয়ে যায়।
বাবরের লোকেরা অবশেষে দুলকিচালে ফিরে আসে। তাদের পেছন পেছন কালো আলখাল্লা পরিহিত ঘোড়সওয়ারের দল হাজির হয়। বাতাসের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাদের মুখে পটি বাধা। সব কিছুই নিশ্চয়ই ঠিক আছে। ঘোড়সওয়ারের দল কাছে আসতে, বাবর তাদের একজনের বহন করা নিশানে লাল বাজপাখি দেখতে পায় যেটা মোঙ্গলিঘ গোত্রের প্রতীক। সে নিজের ঘোড়া কয়েক কদম সামনে নিয়ে যায়। তারপরে বাদামী দানবটার লাগাম টেনে ধরে আগন্তুকদের পৌঁছাবার জন্য অপেক্ষা করে।
“ফারগানার বাবর মির্জাকে স্বাগত জানাই।” দলটার নেতৃত্ব দেয়া অশ্বারোহী জিনে বসে থাকা অবস্থায় ঝুঁকে পড়ে তাকে অভিবাদন জানায়। শক্তিশালী দর্শন লোকটা মুখের কালো পটি খুলতে, বাবর তার কালো দাড়ি, চোয়ালের চওড়া হাড় এবং তার উপরে বিশাল কালো অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন একজোড়া চোখ, অদ্ভুতভাবে তার মণিতে হলুদের ছোপ রয়েছে। লোকটার বয়স আনুমানিক চল্লিশ বছর। “আমি ইবরাহিম সারু, মোঙ্গলিঘদের সর্দার। আমি আপনাকে আর আপনার পরিবারকে স্বাগত জানাই। আজ আপনারা আমার অতিথি আর আগামীকাল বাবর আপনি আমার পুত্রে পরিণত হবেন।” ইবরাহিম সারু যদিও বাবরের মাতৃভাষা তূর্কীতে কথা বলছে, কিন্তু তার বাচনভঙ্গির কারণে শব্দগুলোকে কেমন অপরিচিত মনে হয়। মোঙ্গলিঘদের আদিবাসস্থান ছিলো পারস্যে- ফার্সী আজও সম্ভবত তাদের মাতৃভাষা।
বাবর এবার ঝুঁকে ফিরতি অভিবাদন জানায়। “আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি আমাদের সম্মানিত করেছেন।”
“আমাদের অস্থায়ী ছাউনি এখান থেকে দু’ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। আমরা আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম আর পাহারা দিচ্ছিলাম। আমি নিজে এসেছি কারণ, আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে প্রথমে স্বাগত জানাতে চেয়েছি।”
বাবর আবার ঝুঁকে অভিবাদন জানায় এবং পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে ইবরাহিম সারুকে অনুসরণ করতে তার ঘোড়ার পেটে খোঁচা দেয়।
***
বৃত্তাকার যে তাঁবুটা বাবরকে রাত কাটাবার জন্য দেয়া হয়, সে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খুঁটিয়ে দেখে স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে যথেষ্ট সুন্দরভাবেই তাঁবুটা সাজানো হয়েছে। শুকনো চামড়া দিয়ে সেলাই করা দশ ফুট উঁচু দেয়ালের পুরোটা লাল আর নীল বুননের পর্দা দিয়ে ঢাকা। কুণ্ডলীকৃত সাপের মতো দেখতে পিতলের মোমদানিতে মোমবাতি জ্বলছে। মোমদানিগুলো আবার স্বর্ণালী আভাযুক্ত আস্ত নীলকান্তমণির ভিত্তির উপরে স্থাপিত। গাঢ় নীল রঙের যে তাকিয়ায় সে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে সেটার উপরে সোনার জরির পুরু কারুকার্য তার ঘাড়ের পেছনে সুড়সুড়ি দেয় এবং গদিটাকে মনে হয় মোটা কাপড়ের একটা ঢাউস ব্যাগ যার উপরে পুরু পিচ্ছিল কিংখাব দেয়া। তাঁবু ভেতরের পুরো মেঝে চামড়ার পুরু আস্তরণ দিয়ে ঢাকা।
