বাবর সহসা নিজেকে নিয়ে লজ্জিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে খানজাদা আনন্দ করার অবকাশ পায়নি বললেই চলে। তার জন্য বোনের এতো আনন্দ- এবং এতোটা উদার আর ভোলা-মনের পরিচয় দেয়াতে তার খুশিই হওয়া উচিত। আয়েশার চেয়ে সে অবশ্য বয়সে বড়ই হবে। তাদের এবার উচিত হবে বোনের জন্য উপযুক্ত স্বামী খোঁজা। সে আবার যখন ফারগানার সুলতান হবে, তখন সে বোনের জন্য ভালো একটা ছেলে খুঁজে বের করবে বলে নিজের কাছে নিজে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। এবং নিজের বিয়ের সময়ে যেমন তার সাথে আলোচনা করা হয়েছে এর চেয়ে বেশিই সে বোনের সাথে বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করবে।
দু’সপ্তাহ পরের ঘটনা। বাবর দাঁড়িয়ে থেকে খুতলাঘ নিগার, এসান দৌলত আর খানজাদাকে শীতের কামড় বসানো বাতাসের হাত থেকে বাঁচতে ভারী উলের পরত দেয়া আলখাল্লায় আবৃত অবস্থায় বড় চাকাঅলা, ছই দেয়া গরুর গাড়িতে উঠতে দেখে। পুরো গাড়িটা ভেড়ার চামড়ার মোটা পরত দিয়ে মোড়া আর ভেতরে পুরু গালিচা পাতা রয়েছে, আর লোকের দৃষ্টি থেকে আরোহীদের আড়াল করতে লাল রঙের পর্দার ঝালর ঝুলছে গাড়িটায়। গাড়িটার সাথে যে সাদা রঙের চারটা ষাড় জোতা হয়েছে বিয়ের উপলক্ষ্যের তাদের সবগুলোর শিং সোনালী রঙ করা হয়েছে আর তাদের চওড়া, পেষল কাঁধের উপরের জোয়ালগুলো নীল আর সোনালী রঙের। বাবর তার প্রিয় কালো কেশরযুক্ত বাদামী রঙের ঘোড়ার পিঠে উঠে বসতে, ঘোড়াটাও উত্তেজনা আঁচ করতে পেরে প্রাণোচ্ছল, বল্পিত ভঙ্গিতে দু’পা শূন্যে তুলে লাফালাফি আরম্ভ করে। আবার জিনে উপবিষ্ট হতে পেরে সে বর্তে যায় এবং ঘোড়াটার মালিশ করা চকচকে ঘাড়ে পরম মমতায় একটা চাপড় বসিয়ে দেয়। সে একটা শক্তিশালী রক্ষীবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে বাইসানগারকে শাহরুখিয়ায় রেখে ওয়াজির খান আর পাঁচশ সুসজ্জিত যোদ্ধার একটা বাহিনী নিজের সাথে রাখে। বিয়ের খবর ছড়িয়ে গেছে এবং অনেকেই- যাদের মধ্যে কিছু বিরূপভাবাপন্ন জামমীনের উদ্দেশ্যে তাদের দক্ষিণমুখী যাত্রা আগ্রহের সাথে পর্যবেক্ষণ করবে। কিন্তু এমন একটা সুসজ্জিত বাহিনী সাথে গুপ্তদূত আর অশ্বারোহী প্রহরী দল থাকায় বাবর এবার গুপ্তহামলার কোনো আশঙ্কা করে না।
দূর্গের তোরণদ্বারের কাছে রক্ষীদের জন্য নির্মিত ভবনের কাছে দাঁড়িয়ে ওয়াজির খান শেষবারের মতো বাইসানগারের সাথে শেষ মুহূর্তের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেরে নেয়। কথা শেষ করে সে অসমান খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নিচের আঙ্গিনার উদ্দেশ্যে নামতে শুরু করে। সেখানে এক সহিস তার ঘোড়া অবদমিত শক্তির কারণে দাপাদাপি আর নাক ঝাড়তে শুরু করতে তাকে সামলে রাখতে হিমসিম খেয়ে যায়। বাবর ভাবে, বছরখানেক আগের তুলনায় এখন ওয়াজির খানের হাঁটতে কতো কষ্ট হচ্ছে। খুঁড়িয়ে হাঁটার এই উপসর্গটা তার সাথে কবর অব্দি যাবে।
অবশেষে, হেলেদুলে এগিয়ে চলা ষাড়ের গাড়ির সামনে থেকে বাবর আর ওয়াজির খান ধীরে ধীরে দূর্গের ঢালু পথ বেয়ে বের হয়ে এসে এবং তৃণভূমির মাঝ দিয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকে যেখানে অস্থায়ী শিবির স্থাপনের জন্য খচ্চরে টানা গাড়িতে প্রয়োজনীয় তাঁবু, রসদ আর অন্যান্য সরঞ্জামাদি নিয়ে অগ্রবর্তী দল ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে। আর অবশ্যই এসব সামগ্রীর সাথে আরো আছে বিয়েতে পরিহিত পোশাক-পরিচ্ছদ, তার হবু স্ত্রীর পরিবারের লোকদের জন্য আরও উপহার উপঢৌকন, যার ভিতরে রয়েছে তার শ্বশুরের জন্য একটা হলুদ চোখের বাজপাখি।
পুরো বহরটা ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। কিছুক্ষণ আগে শাহরুখিয়ার দূর্গের প্রাকারবিশিষ্ট ছাদ থেকে বিদায় জানিয়ে বাজানো ড্রামের আওয়াজের বদলে এবার দখল করে বনের মর্মর ধ্বনি, চাকার ক্যাচকোচ, জোয়ালের সাথে বাঁধা ঘণ্টা ধ্বনি, মালবাহী খচ্চরের ঘোতঘোত শব্দ এবং নরম মাটির উপর দিয়ে দুলকিচালে ছুটে চলা অশ্বারোহী বাহিনীর খুরের বোল।
প্রতিদিন ওয়াজির খানের নিয়োজিত রক্ষীবাহিনী কাফেলার চারপাশে সর্তক পাহারায় থাকে। কিন্তু শান্ত উপত্যকা আর তৃণভূমিতে আসন্ন প্রসবিনী গর্ভবতী ভেড়ী আর তার পাল ছাড়া কোনো নড়াচড়াই চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে ধীর গতির কারণে আর ভবিষ্যতের গর্ভে কি অপেক্ষা করছে সে জন্য অস্থির হয়ে বাবর দেহরক্ষীর একটা ছোট দল নিয়ে ঘোড়া ছোটায়।
মুখে এসে ধাক্কা দেয়া বাতাস সে দারুণ উপভোগ করে। তার বাবার ইন্তেকালের পরে সে এমন স্বাধীনতা উপভোগ করেনি। এই মুহূর্তে, সমরকন্দ হাতছাড়া হওয়া বা ফারগানার বিশ্বাসঘাতকতা কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তার কাঁধে চেপে বসা দায়িত্বের বোঝা- অন্যদের প্রতি তার নৈতিক কর্তব্য, অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব আর লক্ষ্য অর্জনের চাপ- যা তাকে প্রায়শই নির্মমভাবে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে মনে হয় যেনো গড়িয়ে নেমে যায়। অনেকটা বসন্তের আগমনের মতো একটা অনুভূতি, যখন তীব্র শীতের কারণে মাসের পর মাস ভেড়ার কয়েক স্তর পুরু চামড়ার নিচে কাটাবার পরে সে অবশেষে সবকিছু ঝেড়ে ফেলে পিঠের উপরে সূর্যের উষ্ণতা অনুভব করতে পারে। তাকে বহন করা ঘোড়ার গলার কাছে ঝুঁকে এসে বাবর তার মন থেকে সব ভাবনা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সে যা নিয়ে এই মুহূর্তে চিন্তা করতে চায় না সেসব কিছুর উপরে বিস্মৃতির চাদর বিছিয়ে দেয়।
