বস্তুত পক্ষে, অসহিষ্ণুতা ছাপিয়ে অন্য কিছু একটা তাকে আপুত করে ফেলেছে। সে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছে। শাহী পরিবারের সদস্যদের বিয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের চেয়ে রাজনৈতিক কারণ আর আনুগত্যের বন্ধনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছেলেবেলা থেকেই সে এই কথাটা শুনে বড় হয়েছে। সে যখন নিতান্তই শিশু, তখনই তার জন্য সম্ভাব্য বিবাহাৰ্থ বাগদানের কথা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কথা আলোচিত হয়েছিলো। কিন্তু তার আব্বাজানের আকস্মিক মৃত্যু এবং তার ভাগ্যের উত্থান পতনের কারণে তারা সবাই পিছিয়ে গিয়েছে। তখন থেকে, সে মনে মনে ভেবে রেখেছিলো উপযুক্ত সময় আসলে বিয়ের ব্যাপারে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে। দেখা যাচ্ছে তার আম্মিজান আর নানীজান একজন সুলতানের চেয়ে তার সাথে অর্বাচীন কিশোরের মতো ব্যবহার করছে। নিজেদের ভিতরে সবকিছু আগে ঠিক করে নিয়ে একেবারে শেষ মুহূর্তে পুরো বিষয়টা অনিবার্য হিসাবে তার সামনে হাজির করেছে। যদিও এসান দৌলতের ধারণা এই কাজের জন্য তার অভিনন্দন প্রাপ্য এবং সে তাকে শ্রদ্ধা আর পছন্দ করলেও এই মুহূর্তে নানীজানের গলাটা মুচড়ে দিতে পারলে সে শান্তি পেত।
কিন্তু অন্যদিকে আম্মিজানের চোখের নিরব আনন্দ, তিনি যা কিছু সহ্য করেছেন এবং তার মরহুম আব্বাজানের সাথে আম্মিজানের বিয়ে কেবল রাজনৈতিক কারণে আয়োজন করা হলেও পরবর্তীতে তা একটা সফল বিয়েতে পরিণত হওয়া সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা শোনার পরে, বাবর প্রতিবাদ করার মতো কোনো যুক্তি খুঁজে পায় না। আর নিজের মনে সে জানে সেটা উচিতও হবে না। এই দুই মহিলার কথাই ঠিক: বিয়ের বন্ধনের মাধ্যমে সৃষ্ট শক্তিশালী মৈত্রীর অতিরিক্ত সমর্থন তার প্রয়োজন। এই জুড়ির ব্যাপারে তার সব অমাত্যই বলেছে এর চেয়ে ভালো পছন্দ আর সমঝোতা হতে পারে না, যদিও সেটা বলার সময়ে তারা বৃথাই তার নাম নিয়েছে। বাবর ওয়াজির খানকে যখন বলেছে যে কি পরিকল্পনা করে হচ্ছে। তখন তার মুখের হাসি। আর বিস্ময়ের অভাব দেখে সে ঠিকই বুঝতে পারে যে পুরো ব্যাপারটা দানা বাঁধবার আগে তার সাথে ঠিকই অন্তত আলোচনা করা হয়েছে।
আর মাত্র কয়েকদিন পরেই, সে জামমীন প্রদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। ফারগানার দক্ষিণ-পশ্চিমে দক্ষিণ সীমান্তের কাছে সাত দিনের দূরত্বে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। সবাই তার জন্য যাকে বধূ হিসাবে নির্বাচিত করেছে তার নাম আয়েশা। জামমিনের শাসক আর মাঙ্গলিঘ গোত্রের সর্দার, ইবরাহিম সারুর বড় মেয়ে। আয়েশা বয়সে তার চেয়ে দুই বছরের বড়। সে দেখতে কেমন হবে? সে কি গ্রান্ড উজিরের মেয়ের মতো চমৎকার দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারী, নাকি শত্রুরা তার জন্য মুখে গন্ধওয়ালা কোনো উটনী খুঁজে বের করেছে? বাবর কাঁধ ঝাঁকায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইবরাহিম সারু একজন ক্ষমতাবান সর্দার আর এখন পর্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে তিনি কোনো পক্ষ অবলম্বন করেননি। এখন থেকে তার অধীনস্ত সেনাবাহিনী। বিশেষ করে তার দুর্ধর্ষ তীরন্দাজ বাহিনী- বাবরের নেতৃত্বে তার ন্যায়সঙ্গত অধিকার পুনরুদ্ধারের অভিযানে অংশ নেবে। এই বিষয়টার দিকে লক্ষ্য রেখে, এসান দৌলত তাকে বারবার একটা কথাই পাখিপড়ার মত করে পড়িয়েছে মেয়ে দেখতে কেমন সেটা কোনো ব্যাপারই না। রাতের দায়িত্ব যথাযথের চেয়েও ভালভাবে সম্পূর্ণ করতে তার কিশোর রক্তের কোনো অসুবিধাই হবে না। আর তাছাড়া সে অবশ্যই পরে আরো দার পরিগ্রহ করতে বা উপপত্নী রাখতে পারবে। বাবর তার আম্মিজানের মহলে প্রবেশ করলে সেখানে খুতলাঘ নিগার বা এসান দৌলত কাউকেই দেখতে পায় না। কিন্তু খানজাদাকে একটা কাঠের ছোট বাক্স থেকে কিছু ক্ষুদ্র অলঙ্কার মেঝেতে ঢেলে আনমনে বাছতে দেখে। “আমি কি এগুলো আয়শাকে দিতে পারি? তার কি এসব পছন্দ হবে?” সে ছোট ছোট রুবি বসানো সোনার সুক্ষ তারের একটা ঝালরের মতো কানের দুল এবং দুলের নিচে মুক্তার একটা তিরতির করে কাঁপছে, দেখিয়ে জানতে চায়।
“তোমার ইচ্ছা হলে দিও।” বাবর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে। তার নবপরিণীতা বধূকে তার দেয়া উপহার সামগ্রী- ফুলের নকশা করা রেশমের গাইট, মশলার বস্তা, সোনার তৈরি ভারী কণ্ঠহার আর বাজুবন্ধ যা বহু শতাব্দি ধরে ফারগানার শাহী পরিবারের স্মারক হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে- সবই তার আম্মিজান আর নানীজানের পছন্দ করা এবং তিন সপ্তাহ আগে ভারী প্রহরায় জামমীন পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সে তার সম্ভাব্য হবু শ্বশুরের জন্য সোনার মোহর, নিখুঁত শৃঙ্গযুক্ত পাঠা, খুরের পেছনের আর সামনের অংশে সাদা কেশগুচ্ছ রয়েছে এমন কালো স্ট্যালিয়নের একটা নিখুঁত জোড়া পাঠিয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই এই একটা উপহার পাঠাতে তার খুব কষ্ট হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সে তার সাধ্য অনুযায়ী বরপণ দিয়েছে। সেটা অবশ্য ইবরাহিম সারুর মতো সর্দারের মর্যাদা অনুরূপ হয়নি। বাবর আবার চিন্তা করে সর্দার এই বিয়েতে কেনো মতো দিলো? তিনি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেন যে বাবরের সালতানাত্তীন অবস্থা বেশি দিন বজায় থাকবে না। নিঃসন্দেহে তিনি তার মেয়েকে সুলতানা হিসাবে দেখলে এবং বাবরের উত্তরাধিকারীর নানা হতে পারলে খুশিই হবেন। আর সেজন্য কে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করবে? উচ্চাকাঙ্ক্ষা বড় সুন্দর। “বা আমি এটাও দিতে পারি?” নিজের অলঙ্কারের দঙ্গলে ভাইয়ের হবু বউয়ের জন্য পছন্দসই উপহার খুঁজতে ব্যস্ত খানজাদার কালো চুল সুযোগ পেয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
