বাবর মুখ তুলে তার নানীজানের দিকে তাকায়। “দেখে নিয়ে, আমি ঠিক তৈমূরের মতই বীর হবো। আমি শপথ করে বলছি…”
“কথাগুলো সত্যিই শুনতে ভাল লাগে।” এসান দৌলত মন্তব্য করেন। “চলো আমাদের অনেক কাজ এখনও বাকি আছে। একটা নতুন দিনের প্রভাত হচ্ছে।”
২.২ পরিনায়ক
০৮. পরিনায়ক
বাবরের মুনশীর আঁকা ফারগানার সীমারেখা চিহ্নিত পার্চমেন্টের ভাঁজ শীর্ণ শিবহুল ছোট ছোট হাতে সমান করতে করতে এসান দৌলতের দৃষ্টিতে সন্তুষ্টি ভাসে। কোনোমতে আঁকা মানচিত্রে, উত্তর-পূর্বের বরফাবৃত পর্বত থেকে প্রবাহিত হয়ে এর শীতল জল পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে এসে প্রশস্ত উপত্যকার উপর দিয়ে দুরন্ত মেয়ের উজ্জ্বলতায় এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া দেখাবার বদলে জাক্সারটাসকে পূর্ব-পশ্চিমে সোজাসুজি বহমান দেখানো হয়েছে। অবশ্য সেটার কোনো দরকারও নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিন্দুরে রঙের কালিতে চিহ্নিত শহর আর গ্রামের মন ভরিয়ে তোলা সংখ্যা যা এখন বাবরের নিয়ন্ত্রণাধীন।
দু’বছরের বন্দি জীবন কাটালেও ফারগানার অভিজাতদের রাজনৈতিক আনুগত্য, তাদের দুর্বলতা আর উচ্চাকাক্ষা সম্বন্ধে জ্ঞান তার বিন্দুমাত্র ফিকে হয়নি। রক্তের জটিল সম্পর্ক আর আনুগত্য সম্পর্কে যা কিছু জানবার সবই এসান দৌলতের নখদর্পণে। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা তিনি যেন মানুষের মনের ভিতরটা পড়তে পারেন। এক লহমায় তাদের দুর্বলতা, অহেতুক গর্ববোধ আর অহমিকা বুঝে নিয়ে কিভাবে সেটা নিজেদের সুবিধার্থে কাজে লাগানো যায়। তার নির্দেশনায়, বাবরের ভিতরে প্ররোচিত করার ক্ষমতা জন্ম নিচ্ছে, সেই সাথে নিপূণভাবে নিজ উদ্দেশ্যসিদ্ধির দক্ষতা, নিজের এই দক্ষতা সম্পর্কে বাবর এতদিন অজ্ঞ ছিলো ইতিমধ্যে কয়েকজন প্রভাবশালী গোত্রপতিকে নিজের পক্ষে আনতে সফল হয়েছে। অন্যেরা, ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আঁচ করতে পেরে নিজেরাই তার সাথে যোগ দিয়েছে। তাদের হিসাবে বাবর এখনই তাদের পুরস্কৃত করতে না পারলেও অচিরেই এমন সময় আসবে, যখন সে উদারভাবে তাদের আজকের বঞ্চনা ভরিয়ে দেবে।
নিজের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং তার সতত বিকাশমান সেনাবাহিনীর সহায়তায় বাবর ধীরে ধীরে পূর্বদিকে চাপ বৃদ্ধি করতে থাকে। গত ছয়মাসে তার সেনাবাহিনীর কাছে কারনন, কাস্সান আর সোখ দূর্গের পতন হয়েছে। শেষের দুটো আপসে আত্মসমর্পন করেছে এবং অবশেষে সে আকশিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলতে শুরু করেছে। জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনচ্যুত করাটা এখন কেবল সময়ের। ব্যাপার এবং সে নিশ্চিত শীঘ্রই আবার ফারগানার সুলতান হিসাবে সে পরিচিত হবে। কিন্তু শীতকালটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে ধৈর্য ধারণ করতেই হবে। মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে সে ভাবে। বরফাবৃত প্রেক্ষাপটের বুকে জীবন্ত কিছুই দেখা যায় না- কদাচিৎ খাবারের সন্ধানে দু’একটা হরিণ বা শিয়ালকে এদিক ওদিক দৌড়ে যেতে দেখা যায়। আর শীতল আকাশের বুকে চিলের আঁক অসতর্ক হঁদুরের খোঁজে ডানা ভাসিয়ে উড়ে বেড়ায়। দূর্গ প্রাকারে জমে থাকা সূচাগ্র তুষারিকা বলে দেয়, অভিযানের সময় এটা না। আর বাতাস এতো শীতল সে শ্বাস নিলে যে কোনো মানুষের বুক ব্যাথা করবে।
“বাবর মনোযোগ দিয়ে শোন। তোমার সাথে আমার কিছু জরুরি আলাপ আছে। তোমার আম্মিজান আর আমি ঠিক করেছি এবার তোমার বিয়ের বয়স হয়েছে। তোমার এখন সতের বছর বয়স। কিন্তু তার চেয়েও যেটা গুরুত্বপূর্ণ হলো উপযুক্ত সম্বন্ধ তোমার অবস্থানকেই শক্তিশালী করবে।”
এসান দৌলত বিজয়দৃপ্ত ভঙ্গিতে তার দিকে তাকায়। “সব বন্দোবস্ত সম্পন্ন হয়েছে অন্তত নৈতিকভাবে বলা চলে। আমি আর তোমার আম্মিজান যখন বন্দি ছিলাম, তখনই আমরা পরিকল্পনা করতে শুরু করি। বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করার সাথে সাথে আমরা সম্ভাব্য সম্বন্ধের কথা প্রচার করতে থাকি এবং দুদিন আগে বার্তাবাহক আমার কাছে সুসংবাদ নিয়ে এসেছে। আমি যে পরিবারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের কথা মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম তারা তাদের সম্মতি জানিয়েছে। যদি তুমি সম্মতি দাও এবং আমি তোমার অখুশি হবার কোনো কারণ অবশ্য দেখতে পাচ্ছি না- বরফ গলতে শুরু করা মাত্র তুমি তোমার নবপরিণীতা স্ত্রীকে গ্রহণ করার জন্য রওয়ানা দেবে।”
বাবর হতবাক হয়ে নানীজানের দিকে তাকিয়ে থাকে, চোয়াল ঝুলে পড়ে এবং বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় না। এমনকি তার বিচক্ষণ নানীজান এতো চিন্তা ভাবনা করে কাকে তার স্ত্রী হিসাবে মনোনীত করেছে সেটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করার কথা তার মনে থাকে না।
***
বাতাসে এখনও শীতলতা বিরাজ করছে, কিন্তু শীতের প্রকোপ কমার সাথে সাথে শাহরুখিয়ার দেয়ালের উপরে উজ্জ্বল সবুজ ছোপের আকৃতি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেনানামহলে অচিন্তনীয় উত্তেজনা বিরাজ করছে- খানজাদা আসন্ন বিয়ে ছাড়া অন্য কোনো বিষয়েই কথা বলতে পারছে না। আস্তাবল থেকে ঘোড়া দেখে আঙ্গিনার উপর দিয়ে হেঁটে আসবার পথে বাবর আমুদে ভঙ্গিতে ভাবে। শীতকালের জন্য জমানো খাবার খেয়ে ঘোড়াগুলো শীর্ণ আর খিটমিটে মেজাজের হয়ে পড়েছে। আস্তাবলের দেয়ালের গায়ে তাদের পায়ের খুরের দাগে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে পাহাড়ের বুক চিরে আবার ছোটার জন্য তাদের অসহিষ্ণু আকাক্ষা। ঘোড়াগুলোর জন্য বাবরের মন সহানুভূতিতে ভরে উঠে। তার নিজেরও একই অবস্থা।
