“আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় ছিলো প্রথম কয়েক মাস, যখন আমরা জানতাম না তোমার ভাগ্যে কি ঘটেছে। ফাতিমা- তুমি জান সে কেমন গপ্পোবাজ সে একবার একটা কথা শুনে আসে- একটা গুজব কিন্তু সেটাই আমাদের আতঙ্কিত করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিলো- যে তুমি ফারগানায় ফিরে আসার সময়ে পথে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছে। তার মায়ের কণ্ঠস্বর কেঁপে যায়। কিন্তু তারপরেই আমরা শুনতে পাই যে তুমি সুস্থ আছো, আর পাহাড়ে আত্মগোপন করে রয়েছে। আমরা জানতাম না কোনটা সত্যি। যতদিন না তামবাল ক্রুদ্ধ হয়ে আমাদের কাছে আসে…সে আমাদের বলে তুমি গ্রামের পর গ্রাম আক্রমণ করে, সবকিছু জ্বালিয়ে দিচ্ছ, তছনচ করে দিচ্ছ এবং নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছো, কাউকে রেয়াত না দিয়ে।”
“তামবাল যা বলেছে, সেটাই তাহলে সত্যি, তাই না বাবর? যে তুমি একজন সাধারণ দস্যু আর গরু-চোরে পরিণত হয়েছো?” এসান দৌলত প্রশ্রয়ের কণ্ঠে বলেন।
বাবর সম্মতি প্রকাশ করে মাথা নাড়ে এবং মুহূর্ত পরে নানীজানের দিকে তাকিয়ে সেঁতো হাসি হাসে। তার মা আর নানী তার সম্বন্ধে কি ভাববে সেটা নিয়ে সে প্রায়ই দুশ্চিন্তা করতো। তারা কি কখনও বুঝতে পারবে কেনো একজন শাহজাদা পাহাড়ী দুৰ্বত্তের জীবন গ্রহণ বাস্তবিক পক্ষে উপভোগ করতে পারে।”
“বাবর, আমাদের সেসব কথা বল।”
পশুর চর্বি দিয়ে তৈরি মোমবাতির দপদপ করতে থাকা শিখা নিভু নিভু হয়ে আসতে, বাবর তার সময় কিভাবে কেটেছে সেটা তাদের কাছে বর্ণনা করতে চেষ্টা করে। দুইশ কি তিনশ অভিযাত্রীর একটা বাহিনী নিয়ে, পাহাড়ের উপর থেকে ধেয়ে আসবার উত্তেজনাই আলাদা। রাতের বেলা তামবালের অনুগত বাহিনীর দূর্গ ঝটিকা আক্রমণের উল্লাস। আর তার পরে রাতের আঁধারে হারিয়ে যাবার, তার পর্যাণে বাধা শিকারের ছিন্নমস্তক থেকে টপটপ করে ঝরে পড়া রক্তের ধারার অনুপ্রেরণা। প্রাচীন মোঙ্গল প্রণালী অনুসরণে তার দলের এক লোক। ঘোড়ার দুধ গজিয়ে যে খভাস তৈরি করতো সেটা পান করার কারণে মাথা ঘুরতে থাকলে সারা রাত ধরে পানোন্মত্ত অবস্থায় ফুর্তি করা। চকরাখদের ছিন্নমস্তক দিয়ে উদ্দাম পোলো খেলার কথা সে কেবল এড়িয়ে যায়। যদিও খানজাদাকে হয়তো পরে সে সেটাও বলবে। তার কথা বলার সময়ে খানজাদার চোখ চকচক করতে থাকে। তার হাতের মুঠি খোলে আর বন্ধ হয়, যেনো সে নিজে সেখানে ছিলো। তার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। এসান দৌলতও মগ্ন হয়ে শোনেন। কিন্তু সে খেয়াল করে মৃত্যুর করাল থাবার হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাবার ঘটনাগুলো শোনার সময়ে তার মায়ের ভ্রু কুঁচকে উঠে।
“আমি কিন্তু কেবল যারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদেরই আক্রমণ করেছি। আর আমি কখনও তোমাদের কথা ভুলে যাইনি। তোমাদের স্বাধীনতা আমার মসনদের চেয়েও বেশি কাম্য ছিল আমার কাছে।” চারপাশে তাকিয়ে, বাবর দেখে গবাক্ষের সরু ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে, ধুসর আলোর একটা ধারা লুকিয়ে কখন যেন কামরায় প্রবেশ করেছে। প্রায় সকাল হয়ে এসেছে।
“তুমি এটা অর্জন করেছে। কিন্তু যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। এখন আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে।” এসান দৌলতের কণ্ঠে একটা সতেজতা ফুটে থাকে এবং তার দৃষ্টি বাবর নিজের উপরে অনুভব করলে সে অস্বস্তিবোধ করে, যেন কোনো বাচ্চা ছেলে এখনই তার ওস্তাদের কাছে ধমক খাবে। “বাবর, তুমি এই ক’দিনে কি শিখেছো?” নানীজান তার দিকে ঝুঁকে এসে তার কব্জি আঁকড়ে ধরে। “ তোমার কথা অনুযায়ী মসনদহীন দিনগুলো থেকে তুমি কি শিখেছো?”
যুক্তিসঙ্গত একটা প্রশ্ন। এই বিপজ্জনক, মরীয়া সময় তাকে কি শিক্ষা দিয়েছে? “বিশ্বস্ত বন্ধু আর মিত্রের গুরুত্ব,” সে অবশেষে কথা খুঁজে পেয়ে বলে, “এবং তাদের যোগ্যতা অনুসারে প্রতিদান দেয়া। এছাড়া পরিষ্কার উদ্দেশ্য, একাগ্রচিত্ত কৌশল আর সেটা অর্জনের পথে কোনো কিছুকে বাধা হিসাবে গণ্য না করার প্রয়োজনীয়তা।”
এসান দৌলত সন্তুষ্টির মাথা নাড়েন। “অবশ্যই। এবং এছাড়া আর কি?”
“আমি শিখেছি একজন সুলতানের পক্ষে সবসময়ে উদারতা দেখান সম্ভব না, শ্রদ্ধা অর্জনের জন্য তাকে কঠোর হতে হবে- কখনও নির্মম। অন্যথায় তাকে দুর্বল মনে হবে। নেতৃত্ব দেবার বদলে সবার ভালবাসার পাত্রে পরিণত হবার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। আর সেই সাথে মিষ্টিভাষী ষড়যন্ত্রকারীর ফাঁদে পা দিয়ে বসতে পারে। আমি শিখেছিঃ আনুগত্য অর্জন করতে হলে কেবল কৃতজ্ঞতা আর সম্ভ্রম উদ্রেক করলেই চলবে না। এর সাথে সামান্য ভয়েরও মিশেল থাকতে হবে। আমি প্রথমবার ফারগানার শাসক হবার পরে বাকী বেগ, বাবা কাশক, আর ইউসুফকে প্রাণদণ্ড দেয়া উচিত ছিলো। তার বদলে আমি কেবল তাদের শাহী দায়িত্বপালন থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলোম এবং জীবন ধারণের জন্য কোনো বাধা না দিয়ে বরং মনের ভিতরে তাদের তিক্ততা পোষণের সুযোগ দিয়েছি। এছাড়া, সমরকন্দ দখল করার পরে গ্রান্ড উজিরের কতিপয় সমর্থককেও কড়কে দেয়া উচিত ছিলো।
“তারচেয়েও বড় কথা, আমার নিয়তির প্রতি আমি আর কখনও অবহেলা প্রদর্শন করবো না। আমাদের সাথে আমার সাথে যা ঘটেছে তারপরেই কেবল আমি হাল্কা হাল্কা বুঝতে পারছি মানুষ তৈমূর লোক হিসাবে কেমন ছিলেন। মাঝে মাঝে তার নিজেকে কেমন একা মনে হয়েছে- নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে তাকে কেমন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। আর তাছাড়া, তাদের সব দায়দায়িত্ব পরে বহুবছর ধরে তাকে নিজের কাঁধে বহন করতে হয়েছিলো… আমি নেতৃত্ব দেবার মতো সাহসও অর্জন করেছি…ওয়াজির খানের মতো আমার যতো দক্ষ পারিষদ থাকুক আমার নিয়তি কেবল আমিই নির্ধারণ করতে পারি।
