“অধিকার করেছিলাম বটে, কিন্তু দখলে রাখতে পারিনি।” বাবর তার মাথা নিচু করে। এমন কিছু কথা আছে যা তাকে বলতেই হবে। “নানীজান, আমি আপনাকে হতাশ করেছি। আপনি আমার সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং আমি সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমার আসতে বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল আর লোকজন ছিল অনেক অল্প।”
“আমাদের তুমি মোটেই হতাশ করনি। আর জেনে রেখো, আমাদের কারণেই তুমি সমরকন্দ হারিয়েছে। আমাদের সাহায্য করার জন্য তুমি সাথে সাথে যাত্রা করেছিলে। তুমি এরচেয়ে বেশি আর কিইবা করতে পারতে?”
বাবর আক্ষেপের সাথে মাথা নাড়ে। “ফারগানা আর আপনারা ছিলেন আমার প্রধান দায়িত্ব। সমরকন্দে আমি নতুন কোনো খেলনা হাতে পাওয়া শিশুর মতো আচরণ করেছিলাম। আমার তখন অন্য কিছু সম্বন্ধে ভাববার সামান্যই অবকাশ ছিলো। আপনাদের আর ফারগানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমার উচিত ছিলো ওয়াজির খানকে পাঠিয়ে দেয়া।” সে তার মায়ের গায়ে হেলান দেয় এবং বরাবরের মতোই মায়ের আঙ্গুল তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে টের পায়। এতে সে কিছুটা শান্ত হয়।
“কিছু কিছু বিষয় তামবাল আমাদের কাছে কখনও গোপন করেনি।” খুতলাঘ নিগার বলেন। “আমার মনে হয় এতে সে আনন্দই পেতো। আমরা, তোমার চাচাতো ভাই মাহমুদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা অবশ্যই জানি- আমরা জানি সেই সমরকন্দ তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। বাছা, সে আর তামবাল মিলে তোমার জন্য একটা ফাঁদ পেতেছিলো। তারা দু’জনে মিলে ঠিক করেছিলো, ফারগানায় সে তোমাকে মসনদ থেকে সরিয়ে দিয়ে জাহাঙ্গীরকে তোমার স্থলাভিষিক্ত করবে। তারা জানতো এর ফলে তুমি বাধ্য হবে- তোমার বেশিরভাগ সৈন্য নিয়ে ফারগানায় ফিরে আসতে। আর মাহমুদ এর ফলে তার কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পায়। তুমি তখন সদ্য সমরকন্দের সুলতান হয়েছে। তারা বলেছে যে সেখানকার অভিজাত ব্যক্তিরা তোমার প্রতি তেমন একটা আনুগত্য বোধ না করায়, মাহমুদ আর তার কলহপ্রিয় স্ত্রী, গ্রান্ড উজিরের কন্যা সহজেই ঘুষ দিয়ে তাদের কিনতে পেরেছে।”
নিজের সবচেয়ে জঘন্য সন্দেহটা প্রমাণিত হতে বাবর চোখ বন্ধ করে ফেলে। কি আহাম্মকই না সে ছিলো।
“তোমার এটাও জেনে রাখা উচিত, মাহমুদের স্ত্রীর কারণে সে গো ধরায় আলি মজিদ বেগকে হত্যা করা হয়েছিলো।” এসান দৌলতের কণ্ঠস্বর তিক্ত শোনায়। নিহত গোত্রপতির মা ছিলো তার বান্ধবী আর তিনি নিজেও তাকে পছন্দই করতেন। “সে নাকি বলেছে তোমার শিরোচ্ছেদ করতে না পারায়, তাকে শিরোচ্ছেদ করলেই আপাতত চলবে- তার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসাবে। মাহমুদ তার কথা ফেলতে পারেনি। সবাই বলে সেই আসলে সমরকন্দের নতুন শাসক। নিজের বাবার চেয়েও সে বেশি লোভী আর প্রতিহিংসাপরায়ণ।”
বাবর বিস্ময়ে চোখ পিটপিট করে। সে ভাবতেও পারেনি সেই সুঠামদেহী তরুণী, যে এমন সাহসিকতার সাথে গ্রান্ড উজিরের প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলো কিভাবে এতো অনুভূতিহীন নিষ্ঠুর আর নির্মম হতে পারে। একদিন তাকে অবশ্যই তার এই স্পর্ধার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু সেটা পরেও হতে পারে। তার আগে তাকে অন্য অনেক বিষয় জানতে হবে এবং সেগুলো মেনে নিতে হবে।
সে আলতো করে দু’হাতের মাঝে মায়ের হাত জড়িয়ে ধরে। “আমাকে তোমাদের কথা বলল। তোমরা বন্দি থাকা অবস্থায় কেমন আচরণ করছে তারা তোমাদের সাথে?”
“কয়েকজন মাত্র পরিচারকসহ আমাদের একটা ছোট জায়গায় আটকে রাখা হয়েছিলো কিন্তু আমাদের বংশ গৌরব আর মর্যাদার কারণে তারা বাধ্য হয়েছিলো আমাদের যথাযথ সম্মান দেখাতে। তামবাল আমাদের অপমান বা হুমকি দেয়নি।” তার মা বলে, “আর সম্প্রতি- সম্ভবত তোমার সাফল্যের কথা যখন সে জানতে পারে- আমাদের বড় একটা মহলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।”
“আর সে রোক্সানাকে আমাদের গহনা কেড়ে নিতে দেয়নি। অবশ্য অন্যদের মুখে শুনেছি সে ক্রুদ্ধ হয়ে চেঁচামেচি করেছে, যদিও সে তামবালের অঙ্কশায়িনী ছিলো।” এসান দৌলত কুপিত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন।
“আর আমার সৎ-ভাই জাহাঙ্গীর? এসবে তার ভূমিকা কতটুকু?” বাবর প্রায়ই তার স্থান দখল করে নেয়া বালকটার কথা ভাবে যাকে সে কখনও দেখেনি। শেষবার আকশি থেকে আসবার সময়ে, সমরকন্দ অবরোধের প্রস্তুতি নেবার সময়ে, ছোঁড়া অসুস্থ ছিলো।
“বেচারা পরিস্থিতির শিকার, আর প্রায়ই অসুস্থ থাকে। তামবালের পুরো শরীরে কয়েক চামচ পরিমাণ রাজরক্ত থাকায় সে কখনও নিজে সিংহাসন দাবি করতে পারবে না। অন্য গোত্রপতিরা সেটা তাকে করতেও দেবে না। কিন্তু জাহাঙ্গীরের রাজপ্রতিভূ হিসাবে যে ক্ষমতার জন্য সে লালায়িত সেটা অর্জন করতে পারবে।” এসান দৌলত ভাবাবেগশূন্য কণ্ঠে কথাগুলো বলেন। “সে এখন তোমাকে ভয় পায়। সে যদি তোমাকে খুশি করতে না চাইতো, তাহলে আমাদের এতো সহজে মুক্তি দিতো না?”
সুলতান হিসাবে বাবর নিজের প্রথম দিনগুলোর কথা ভাবে, তার মনে পড়ে তামবাল তখন কিভাবে অন্য নেতাদের মনে সন্দেহের বীজ বপনের চেষ্টা করেছে। সব সময়ে সে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিবৃত্ত করার চেষ্টারত ছিলো। কী সাংঘাতিক সুবিধাবাদি এক লোক- কামবার আলীর ষড়যন্ত্রে যোগ দেবার ব্যাপারে ভীষণ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে সঠিক সময়ের জন্য ধৈর্যসহকারে অপেক্ষা করেছে। এজন্যই কি সমরকন্দ দুবার অবরোধ করতে সে তাকে প্ররোচিত করেছিলো? বাইসানগার যখন তৈমূরের অঙ্গুরীয় নিয়ে এসেছিল তখন আগ্রহে চকচক করতে থাকা তামবালের চেহারা তার এখনও মনে আছে। তার আরো মনে আছে, সমরকন্দ অধিকার করার পরে কি রকম তাড়াহুড়ো করে সে ফারগানা ফিরে এসেছিলো।
