বাবর মুখ তুলে তার নানীজানের দিকে তাকায়। “দেখে নিয়ে, আমি ঠিক তৈমূরের মতই বীর হবো। আমি শপথ করে বলছি…”
“কথাগুলো সত্যিই শুনতে ভাল লাগে।” এসান দৌলত মন্তব্য করেন। “চলো আমাদের অনেক কাজ এখনও বাকি আছে। একটা নতুন দিনের প্রভাত হচ্ছে।”
দ্বিতীয় খণ্ড – সালতানাৎবিহীন এক সুলতান
০৭. আয়োধন আর অন্তর্ধান
বৃষ্টি আর তুষারপাতের মিশ্রণের প্রকোপ বাবরের ভেড়ার চামড়ার প্রলেপ দেয়া ভারী জ্যাকেটের আবরণও আটকাতে ব্যর্থ হয়। ফারগানার উত্তরে উঁচু পর্বতমালার অভ্যন্তরে এক প্রত্যন্ত উপত্যকার ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনীর তীরের প্রায় কাদা হয়ে থাকা বরফের ভিতর দিয়ে তার অবশিষ্ট লোকদের সামনে থেকে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে চলেছে, বৃষ্টি আর তুষারপাতের হাত থেকে বাঁচতে মাথা নিচু করে রাখা।
নিজের দুটো সালতানাই হারিয়েছে এটা অনুধাবন করার পরের প্রথম দিকের মুশকিল দিনগুলোতে, বাবর আকশি দূর্গের আশেপাশেই থাকবে বলে ভেবেছিলো আশা করেছিলো সব কিছু বাজি রেখে হলেও সে তার পরিবারকে মুক্ত করতে পারবে। ওয়াজির খান অনেক কষ্টে তাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তার শত্রুরাও এমনই একটা মরীয়া প্রচেষ্টা আশা করছে আর তারা সেজন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। ওয়াজির খান, তার চিরাচরিত পিতৃসুলভ ভঙ্গিতে তাকে আশ্বস্ত করে পরামর্শ দিয়েছে, “আপনি যদি আপনার আম্মিজান, নানীজান আর বোনকে বাঁচাতে চান তাহলে নিজেকে বিপদের মুখে না ফেলে বরং শত্রুদের তটস্থ করে তুলেন, যাতে তারা আপনার নাম শুনলেই ভয় পায়। আর সেটা করতে হলে তাদের চাপের ভিতরে রাখেন। এখানে সেখানে তাদের আক্রমণ করে, আপনার বিরুদ্ধে সৈন্য সমাবেশ করবার আগেই সেখান থেকে সরে আসেন। ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে সবসময়ে একটা ভীতির সঞ্চার করতে থাকেন। আপনার শত্রুরা যাতে শান্তিতে ঘুমাতে না পারে। আর এটা করতে পারলেই সুলতান, তারা আপনার পরিবারের ক্ষতি করার কথা চিন্তাও করতে পারবে না।”
বাবর ওয়াজির খানের বক্তব্য মোটের উপরে বুঝতে পারে। সাবধানে বিবেচনা করে, সে একটা পরিকল্পনার কথা বলে। আমাদের একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল চাই। যেখানে আমরা শীতকালটা কাটাতে পারবো এবং প্রথম হামলার ছক কষতে পারবো। আমার মনে আছে যে প্রতিবার গ্রীষ্মের সময়ে সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসাবে আপনি একবার আমাকে উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে একটা অভিযানে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং উপত্যকার কেন্দ্রস্থলে একটা মাটির দূর্গে আমরা অবস্থান করেছিলাম। তামবালের অনুগত এক জায়গীরদার সেই নগণ্য সেনাছাউনির প্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো। সেই দূর্গটা আমাদের জন্য চমৎকার আশ্রয়স্থল হিসাবে প্রতিপন্ন হতে পারে। কারো মাথাতেই বিষয়টা আসবে না। আপনি কি বলেন?”
“জায়গার কথা আমার মনে আছে। বাস্তবিকই প্রত্যন্ত অঞ্চলে দূর্গটা অবস্থিত, আর আমাদের উদ্দেশও হাসিল হবে।”
আর সে জন্যই সে ওয়াজির খানকে নিয়ে পাহাড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলো। তাদের সাথে কেবল দুশো লোক ছিলো। ওয়াজির খানের সাহায্যে বাবর অনেক যত্ন নিয়ে তাদের বাছাই করেছে, সে কেবল তাদেরই বাছাই করেছে যাদের বয়স অল্প আর কোনো পারিবারিক পিছুটান নেই বা বাইসানগারের মতো যারা তার বিশ্বস্ত অন্তরঙ্গ। বাকি সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে, তার ডাকের অপেক্ষা করতে বলেছে, যা তারা নিশ্চিতভাবেই পাবে। তাদের যাত্রার দ্বিতীয় সপ্তাহে তুষারপাত শুরু হয় এবং উচ্চতা বাড়বার সাথে সাথে তুষারের স্তর বৃদ্ধি পেয়ে তাদের যাত্রাকে শ্লথ করে তুলেছে।
“ওয়াজির খান, আপনার কি মনে হয় আমরা দূর্গ থেকে কতোটা দূরে অবস্থান করছি?”
“সুলতান, আবহাওয়া যদি এতোটা বিরূপ না হতো, আমরা তাহলে দূর্গটা এতক্ষণে দেখতে পেতাম। অবশ্য সুবিধাও হয়েছে, দূর্গের নিরাপত্তা রক্ষীরা আমাদের আগে থেকে দেখতে পাবে না। দূরের ঐ গাছগুলোর আড়ালে আমরা অবস্থান নেবো আর সামনেটা রেকী করার জন্য গুপ্তদূত পাঠিয়ে আমরা পর্যাণে যেটুকু শুকনো মাংস রয়েছে সেটা দিয়ে আহার সেরে নেবো।”
তাদের পাঠানো গুপ্তদূতেরা রেকী করে ফিরতে যে নব্বই মিনিট সময় লাগে তার পুরোটা সময়ই অবিশ্রান্তভাবে তুষারপাত হয়। কখনও ভারী বা কখনও হাল্কাভাবে। তার লোকেরা ফিরে আসতে দেখা যায়, ঘোড়া আর তার আরোহী তুষারে পুরো ঢেকে গেছে এবং গুপ্তদূতদের দলনেতা ঠাণ্ডায় নীল হয়ে আসা ঠোঁটে কোনোমতে কথা বলে। “এখান দু’মাইল দূরে একটা বাকের পরেই দূর্গটা অবস্থিত। দূর্গের বাইরে আমরা কোনো ঘোড়ার বা পায়ের ছাপ দেখতে পাইনি যাতে বোঝা যায়, আজ ভেতর থেকে কেউ টহল দিতে বা পর্যবেক্ষণ-ফাঁড়িতে যায়নি। আমরা যখন ঘোড়া থেকে নেমে দূর্গের কাছে এগিয়ে যাই, দূর্গের এক অংশ থেকে আমরা ধোয়া উঠতে দেখেছি- সম্ভবত রসুইখানা- কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দূর্গের মূল ফটক তখন ভোলা ছিলো। স্পষ্টতই এই আবহাওয়ায় কেউ আক্রমণ করতে পারে সেই ব্যাপারটা তাদের মাথাতেও নেই।”
“চমৎকার, শীঘ্রই তাদের এই নিশ্চয়তা নরকে পরিণত হতে চলেছে। ওয়াজির খান, এটা ইতস্তত করার সময় না, সবাইকে এই মুহূর্তে প্রস্তুত হতে বলুন এবং তুষারপাতের মাঝে আমরা আত্মগোপন করে গুপ্তদূতদের সহায়তায় দূর্গে পৌঁছাবার পথের শেষ বাঁকে দ্রুত আর নিরবে গিয়ে হাজির হবো। সেখান থেকে মূল ফটকের উদ্দেশ্যে ঘোড়া দাবড়ে যাবো।”
