খানজাদা ইতিমধ্যে তাকে বহনকারী ঝুড়ি থেকে নিজেই ধড়ফড় করে নেমে এসেছে। এবং সে সোজা ভাইকে লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার পোষা বেজী যেটা সে বামহাতে ধরে রেখেছে, কুইকুই করে প্রতিবাদ জানায়। শেষবার বাবর তার বোনকে দেখেছিলো হাড্ডিসার একটা মেয়ে, যার মুখে কয়েকটা দাগ রয়েছে। খানজাদা এখন রীতিমত একজন মহিলাতে পরিণত হয়েছে, তার দেহে ভরা নদীর জোয়ার বইছে। মুখ আগের চেয়ে অনেক দাগহীন আর সুন্দর। কিন্তু ফিচেল হাসি আগের মতোই আছে দেখে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সে তাকে জড়িয়ে ধরে এবং তারপরে ছেড়ে দিয়ে এক পা পিছিয়ে আসে ভালো করে তাকে দেখবে বলে।
খানজাদাও কম যায় না সেও ভাইকে জরিপ করে। “তুমি লম্বা হয়েছে।” সে বলে, “আর তোমার কাঁধ আগের চেয়ে চওড়া হয়েছে। কিন্তু একি চেহারা হয়েছে। তোমার থুতনিতে ছাগলের মত দাড়ি আর চুলের অবস্থা যাচ্ছেতাই- তোমার চুল দেখছি আমার মত লম্বা! আর নখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না- কালো হয়ে আছে।”
বাবর পেছন থেকে, খানজাদার নাক কোঁচকানো বিশেষণগুলোর সমর্থনে এসান দৌলতকে জিহ্বা আর টাকরার সাহায্যে একটা শব্দ করতে শোনে এবং সে হেসে ফেলে। অবশেষে তার প্রিয়জনেরা তার কাছে এসেছে এবং সবকিছু যেমনটা থাকার কথা তেমনই রয়েছে। তাদের সাথে সে পরে কথা বলবে এবং শুনবে বিগত দিনগুলো তাদের কেমন কেটেছে। কিন্তু এখনকার মতো এই যথেষ্ট।
তারা দূর্গের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। অবশেষে মুক্তি লাভ করা ফারগানার শাহী রমণীদের অভ্যর্থনা জানাতে তূর্যনিনাদ আর রণভেরী গমগম আওয়াজে বেজে উঠে- অন্তত এখনকার জন্য হলেও তারা নিরাপদ।
দূর্গের উপরের তলায় প্রস্তুত রাখা জেনানামহলে মেয়েদের পৌঁছে দিয়ে, বাবর তার বঁধুনিকে ডেকে পাঠায়। তার পরিকল্পিত ভোজসভার সব আয়োজন কি অবস্থায় আছে তা জানতে। এখানের ভোজসভা সমরকন্দের মতো জাঁকজমকপূর্ণ হবে না। যেভাবে সে তাদের অভ্যর্থনা জানাতে চেয়েছিলো। অবশ্য, তাহলেও বিশটা ভেড়া জবাই করা হয়েছে আর আঙ্গিনায় সেগুলোকে আগুনে ঝলসানো হচ্ছে। মুরগীর পালক ছাড়িয়ে, আখরোট আর খুবানির সাথে মাখন দিয়ে সিদ্ধ করা হচ্ছে। আস্ত আপেল ঘন সোনালী বর্ণের মধু আর লাল রসে ভরা ডালিমের দানার সাথে কাঠবাদাম আর পেস্তার মিশ্রণে চিকচিক করছে। তাদের কোনো এক অভিযানে তার লোকদের লুট করা রূপালি বর্ণের কাঠবাদামের স্তূপের দিকে সে বিশেষ সন্তুষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। এসান দৌলত অন্য যে কোনো মিষ্টির চেয়ে এগুলো বেশি পছন্দ করেন।
নির্মেঘ, তারা-শোভিত আকাশে চাঁদ উঠলে, এবং কোনো আকষ্মিক হামলা থেকে আগেই সাবধান করতে দূর্গপ্রাকারে সৈন্য মোতায়েন করে ভোজসভা শুরু হয়। বাবর আর তার লোকেরা নিচুলার একটা নিচু, লম্বা কামরায় আহার সারে। যখন উপরে নিজেদের কামরায় মেয়েদের তাদের পছন্দের অংশ পরিবেশন করা হয়। মোমবাতির কাঁপা আলোতে বাবরের লোকেরা উদাত্ত কণ্ঠে গান শুরু করে। বাকীরা যে নিচু কাঠের টেবিলের চারপাশে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে আছে তাতে চাকুর বাট দিয়ে আঘাত করে তাল দেয়। বাবর ভাবে, তার লোকেরা খুশি হয়েছে। মেয়েদের মুক্তিতে তারাও প্রীত হয়েছে। তার সাথে সাথে তার লোকদেরও এটা সম্মানহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো- যেনো মেয়েদের মুক্ত করার সামর্থ্য তাদের নেই।
বাবর খেতে চেষ্টা করে কিন্তু কিছুই খেতে পারে না। তার ইচ্ছা করে এখান থেকে উঠে যায় এবং তার আম্মিজান, খানজাদা আর এসান দৌলতের সাথে নিভৃতে সময় কাটায়। কিন্তু তার অনুসারীদের প্রতি সৌজন্যতাবশত তাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। গানের মাত্রা ধীরে ধীরে চড়তে শুরু করে এবং ক্রমশ কর্কশ হয়ে উঠে। যোদ্ধার দল উচ্চকণ্ঠে নিজেদের পূর্বপুরুষের বীরত্বের কথা বয়ান করতে থাকে এবং বাবরও এবার তাদের সাথে কণ্ঠ মেলায়। কিন্তু অবশেষে, কেউ কেউ টেবিলের উপরে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ে। আর অন্যেরা ঝাপসা চোখে টলোমলো পায়ে কামরা থেকে বের হয়ে বাইরের আঙ্গিনায় নিজেদের হাল্কা করতে শুরু করলে, বাবর তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাথরের বাঁকানো সিঁড়ি বেয়ে জেনানামহলের দিকে রওয়ানা দেয়।
খুতলাঘ নিগার দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাকে স্বাগত জানায় এবং সে ভিতরে প্রবেশ করে গালিচা পাতা মেঝেতে তার পাশে এসে বসে। তাদের সামনের পিতলের থালায় পড়ে থাকা খাবারের অবশিষ্টাংশ দেখে সে বুঝতে পারে মেয়েরা ভালমতোই খেয়েছে। কিন্তু তারপরেও সে এখন যখন তাদের মুখের দিকে তাকায় সেখানে সে একটা টানটান অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে। তাদের তিনজনকেই ফ্যাকাশে আর বিবর্ণ দেখায়। যেনো বহুকাল সূর্যের আলোর উষ্ণতা অনুভব করেনি বা তাজা বাতাসে তারা শ্বাস নেয়নি। কাউকে না কাউকে অবশ্যই এর মূল্য দিতে হবে- রক্ত দিয়ে। কিন্তু মেয়েদের খাতিরে আপাতত সে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে না। তারা যাই বলুক তাকে, সে অবশ্যই সব কিছু শান্ত ভঙ্গিতে শুনবে।
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ বসে থাকে। প্রাথমিক উত্তেজনা প্রশমিত হতে, কেউই বুঝতে পারে না কোথা থেকে শুরু করা উচিত।
অবশেষে এসান দৌলত শুরু করেন: “বাবর তুমি তাহলে সরমকল দখল করেছিলে।” তার বিচক্ষণ মুখে বিরল একটা হাসির আভাস ফুটে উঠে।
