“সুলতান, দারুণ সুখবর আছে! সত্যিই চমকে দেবার মত সুখবর!”
“কি হয়েছে?”
“এক সপ্তাহ আগে আকশি থেকে এক বার্তাবাহক এসেছে। আপনার সৎ-ভাই জাহাঙ্গীরের পক্ষে তামবালের বাণী নিয়ে সে এসেছে। অন্তত বার্তাবাহকের তাই ভাষ্য এবং সে বলেছে তারা আপনার আম্মিজান, নানীজান আর আপনার বোনকে আপনার কাছে পাঠাতে সম্মত আছেন।”
“সে কি এর বিনিময়ে কিছু দাবি করেছে?”
“সুলতান, প্রকাশ্যে তারা কিছু দাবি করেনি। আপনাকে সে কতোটা শ্রদ্ধা করে কেবল সে সম্পর্কে কিছু মধুর বাক্য ছাড়া।”
বাবরের হৃৎপিণ্ড আনন্দে নেচে উঠে। তার পরিবার শীঘ্রই তার সাথে মিলিত হবে। এই খবরটা আবার তাকে আবেগতাড়িত করে তোলে।
“তারা এখানে কবে নাগাদ পৌঁছাবে?”
“সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল সূর্যাস্ত নাগাদ তাদের এখানে পৌঁছাবার কথা।”
পরের দিন সন্ধ্যাবেলা, গোধূলির অস্তমিত আলোয় বাবরকে দূর্গের প্রকারবেষ্টিত সমতল ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আজকের দিনের অধিকাংশ সময় সে এখানেই কাটিয়েছে। অস্থিরচিত্তে রাস্তাটা যেখানে একটা গিরিখাদের দিকে বাঁক নিয়েছে, সেদিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে। ঘনায়মান আধো-অন্ধকারের ভিতর থেকে সে পিঠের দুপাশে ঝুড়ি ঝুলছে উটের এমন একটা তরঙ্গায়িত সারিকে বাঁক ঘুরে এগিয়ে আসতে দেখে। তাদের ঠিক পেছনেই রয়েছে যাত্রার শেষ পর্যায়ে মেয়েদের অভ্যর্থনা জানাতে। আর তাদের নিরাপদে দূর্গে নিয়ে আসবার জন্য, ওয়াজির খানের পরামর্শে, বাইসানগারের অধীনে পাঠানো সৈন্যবাহিনীর একটা চৌকষ দল।
বাবর এতদূর থেকে ঝুড়িতে ভ্রমণকারীদের চেহারা দেখতে পায় না। নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে, এবং দেহরক্ষীদের কাউকে ডাকবার বা ঘোড়ার পিঠে জিন চাপাবার মতো ধৈর্যের মারাত্মক অভাব দেখা দেয়ায়, সে লাফিয়ে একটা খালি ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে এবং সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত তৃণভূমির উপর দিয়ে ছোট কাফেলাটার দিকে ছুটে যায়।
তার রোদে পোড়া গাল বেয়ে দরদর করে কান্না ঝরতে থাকে। কিন্তু সেসব সে মোটেই পরোয়া করে না। আশেপাশে কেউ নেই তার কান্না দেখবার মতো এবং তার চেয়েও বড় কথা, দেখলে দেখুক সে থোড়াই পরোয়া করে। দুর্বলতার না, আজ এটা আনন্দের অশ্রু। এক হাতে ঘোড়ার কেশর আঁকড়ে ধরে সে অন্য হাতে গাল থেকে কান্না মুছে। বাবর ঘোড়াটার কানে কানে তাকে এমন গতিতে ছুটতে বলে, যাতে মনে হয় হঠাৎ তার পাখা গজিয়েছে।
কাফেলাটাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আনা সৈন্যদের থেকে চারজন সহসা আলাদা হয়ে বর্শা নিচু করে তার দিকে এগিয়ে আসে। যদিও বাইসানগার সম্ভবত ধারণা করতে পেরেছিলো খালি ঘোড়ার পিঠে এমন উদ্দাম ভঙ্গিতে কে তাদের দিকে ছুটে আসছে। কিন্তু তার মত অভিজ্ঞ পোড়খাওয়া যোদ্ধা তার কাছে এটাই প্রত্যাশিত যে সে নিজের লোকদের আদেশ দিয়েছে তার পরিচয় নিশ্চিত করতে। অশ্বারোহী দল নিকটবর্তী হতে, বাবর জোর করে নিজের ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তাকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে। ঘামে জবজব করতে থাকা দেহে নাক ঝেড়ে নিজের বিরক্তি প্রকাশ করে ঘোড়াটা।
বাবর মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দিয়ে তার পূর্বপুরুষের রণহুঙ্কার কণ্ঠে তুলে নেয়। “ফারগানা!”
অশ্বারোহী দল এখন আরো কাছে চলে আসায় তারা তাকে চিনতে পেরে অভিবাদন জানায়। বাবর কোনোমতে তাদের অভিবাদনের জবাব দিয়ে উটের কাফেলা যেখানে যাত্রা বিরতি করেছে সেদিকে ঘোড়া ছোটায়। তার হৃদয় যদি আবেগে ভারাক্রান্ত না থাকত অন্যসময় হলে তাহলে সে হয়তো বাজারে নিয়ে যাওয়া মুরগীর মতো ভীরু ভঙ্গিতে বেতের ঝুড়ির ভিতর থেকে এসান দৌলতের উঁকি দেবার হাস্যকর ভঙ্গি দেখে হয়তো হেসেই ফেলতো। তার ওজন এতোটাই হাল্কা যে অন্যপাশের ঝুড়িতে ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাঁধাকপির চেয়ে ভারী কিছু রাখতে হয়নি। আর তার বীণা ঝুড়ির বাইরে চামড়ার ফালি দিয়ে আটকানো রয়েছে। একটা বিশাল পুরু লোমের দুধসাদা রঙের উট যা বাবরকে এগোতে দেখে পচাৎ করে থুতু ফেলে সেটার দু’পাশে দুটো ঝুড়িতে খুতলাঘ নিগার আর খানজাদা আরোহন করেছেন। উটের পেছনে বাবর তার আম্মিজানের পরিচারিকা দলের কয়েকজন পরিচিত সদস্য, যাদের ভিতরে ফাতিমাও রয়েছে আর তার উজির কাশিমকে দেখতে পায়।
উটের চালকরা লাফিয়ে নেমে, উটের গ্রন্থিযুক্ত হাঁটুতে তাদের হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করে উটগুলোকে বাধ্য করে মাটিতে বসতে। বয়োবৃদ্ধ হবার কারণে, বাবর দৌড়ে প্রথমে এসান দৌলতের কাছে যায় এবং হাঁটু মুড়ে বসে তাকে আলতো করে ঝুড়ি থেকে তুলে আনে। বাবর কোনো কথা খুঁজে পায় না, আর এই প্রথমবারেরমতো মুখরা এসান দৌলতও বাক্যহারা হয়ে পড়েন। সে টের পায় নানীজান তার মাথা আলতো স্পর্শ করেন। সে উঠে দাঁড়িয়ে তার ছোট ছোট উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকালে সেখানে তার পুরানো সত্ত্বার ঝলক দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। নানীজানকে এখন তিনি বরাবর যার জন্য গর্ব করেন,সেই খামের- চেঙ্গিস খানের রক্তের উত্তরসুরী এক নারীর মতোই দেখাচ্ছে।
সে এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে তার আম্মিজানকে ঝুড়ি থেকে তুলে মাটিতে নামিয়ে দেয় এবং তাকে জড়িয়ে ধরে তার আশৈশব পরিচিত চন্দনকাঠের উষ্ণ সুগন্ধে বুক ভরে শ্বাস নেয়। সে তার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকিয়ে দেখে আম্মিজানের চোখে অশ্রু টলটল করছে। “বাছা তোমাকে আবার দেখতে পেয়ে খুশি হলাম,” কোনো রকমের আবেগ না দেখিয়ে তিনি বলেন, এবং তার মুখে একটা হাসির আভাস ফুটে উঠে যা বাবরের যেমনটা মনে আছে তার চেয়েও ম্লান এবং বলিরেখায় আকীর্ণ।
