নিজের বিশ্বস্ত সর্দারের কথা মনে পড়তে বাবরের ভাবনা বিষণ্ণ হয়ে উঠে। আজকাল তার প্রায়ই এমন হচ্ছে। সবুজাভ-নীল তোরণদ্বারে আলি মজিদ বেগের মৃতদেহ প্রদর্শিত হবার পরের দু’বছরে সে কি অর্জন করেছে? নিজের পরিবারকে মুক্ত করার ব্যাপারে বা ফারগানা পুনরায় অধিকার করার ব্যাপারে সে কতটা অগ্রসর হয়েছে, সমরকন্দের কথা না হয় সে বাদই দিল? আর কতদিন তাকে সালতানাৎবিহীন একজন সুলতান হিসাবে দিন কাটাতে হবে? আকশি আক্রমণ করে তার পরিবারকে মুক্ত করে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার মতো একটা সেনাবাহিনী গঠন করা একটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আর সমরকন্দ, সেখানে শাসক হিসাবে কাটানো কয়েকটা দিন এখন কেবল ধূসর স্মৃতি। মাঝে মাঝে তার বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয় যে এমন কিছু আসলেই ঘটেছিলো। গ্রান্ড উজিরের কথাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো।
ভাবনাটা বাবরকে ক্রুদ্ধ করে তোলে। সে তার পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা কর্তিত মস্তকে লাথি বসিয়ে দিলে সেটা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে। তার লোকদের যেমন, তারও বিনোদনের দরকার আছে। কয়েকটা ডাল কেটে পোলো খেলার লাঠি তৈরি করো।” সে চিৎকার করে বলে। “এইসব দুবৃত্তদের মাথা দিয়ে পোলো খেলা যাক। গোলপোস্ট হবে ঐ দূরের গাছগুলো।”
পুরো একটা ঘণ্টার জন্য, উদ্দাম খেলায় বাবর নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। চকরাখদের ক্ষিপ্রগামী টাটুঘোড়ার একটা নিয়ে সে একেবেঁকে দাবড়ে বেড়ায় এবং শাখাপ্রশাখা ছেটে ফেলা গাছের ডাল দিয়ে ছিন্ন মস্তকগুলোকে সজোরে আঘাত করে। যাতে ঘাসের উপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে সেগুলো গড়িয়ে যায়। শীঘ্রই সেগুলোকে আর কাটা মাথা বলে চেনার কোনো উপায় থাকে না- নাক, কান গুঁড়িয়ে যায়, অক্ষিকোটর থেকে অক্ষিগোলক বের হয়ে আসে এবং বাবর আর তার ঘর্মাক্ত সাথী খেলোয়াড়েরা আর সেই সাথে তাদের সবার ঘোড়া, রক্তের ফুটকিতে চিত্রিত হয়ে উঠে।
অবশেষে খেলাটার প্রতি তার বিরক্তি জন্মায় কিন্তু ভেতরের জমে ওঠা হতাশা আর ক্ষোভ নিঃসৃত হওয়ায়, বাবর ঘামে ভিজে ওঠা ঘোড়াটাকে অবশেষে রেহাই দেয়। চারপাশে তাকাতে সে দেখে ওয়াজির খান তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। এই প্রথম সে তার চোখে বিরক্তি দেখতে পায়। কিন্তু বাবর তাতে বিন্দুমাত্র লজ্জি বোধ করে না। জীবিত বা মৃত, সে তার শত্রুদের সাথে তাদের প্রাপ্য ব্যবহারই করেছে।
“চলো এবার যাওয়া যাক।” সে আদেশ দেয়। “গাভা এখনও অনেক দূরে, আর আমাদের গৃহকর্তাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখাটা ঠিক হবে না।” বাবর ঘোড়ার পাঁজরে এত জোরে খোঁচা দেয় যে সেটা ছুটতে শুরু করে। বাবর সরাইখানা থেকে সোজা নদীর অগভীর অংশের দিকে এগিয়ে যায়।একবারও পেছনে ফিরে তাকায় না। আঙ্গিনায় পড়ে থাকা রক্তাক্ত মাথাগুলোকে ইতিমধ্যে কাকের দল ঠোকরাতে শুরু করেছে এবং সরাইখান মেয়ে দুটো পা ঈষৎ ধনুকের মত ফাঁক করে এগিয়ে গিয়ে চকরাখদের লাশগুলো হাতিয়ে দেখে যে বাবরের লোকেরা ভুলে কিছু রেখে। গেছে নাকি, যা তাদের বেশ্যাবৃত্তির পাওনার উপরি বলে বিবেচিত হতে পারে।
***
তিন সপ্তাহ পরে। উঁচু পাহাড়ী এলাকার তৃণভূমির উজ্জ্বল সবুজ ঘাসের মাঝে মাঝে ফুটে থাকা হলুদ গোলাপী আর সাদা ফুলের মাঝ দিয়ে বাবর আর তার লোকেরা দুলকি চালে ঘোড়া দাবড়ে শাহরুখিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। গাভার অভিযানে ক্ষয়ক্ষতি হলেও তারাই জয়ী হয়েছে। তিনশ গজ দূরে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা অবস্থায় বাবর নিজে তীর ছুঁড়ে দূর্গের সেনাপতিকে হত্যা করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার নিজের ব্যবহৃত ছোট নিখুঁতভাবে বাঁকানো ধনুক দিয়ে তীর ছোঁড়ার অভ্যাসে কাজ হয়েছে। ত্রিশটা শর ভর্তি তূণীর সে এক মিনিটের ভিতরে খালি করে ফেলতে পারে।
সেনাপতি মারা যাবার পরে, প্রতিরোধকারীদের মনোবল ভেঙে যায়। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেনানিবাসের সৈন্যরা কেবল আত্মসমর্পনই করেনি, নিজেদের লুটের মাল পুরো তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। যা বাবর আর তার লোকদের ঘোড়ার পিঠে ঝোলানো চামড়ার থলির উপচে পড়া আকৃতি সাক্ষ্য দিচ্ছে।
ওয়াজির খান খুব খুশি হবে। এবারের অভিযান বাবরকে তার বুড়ো বন্ধুটির সহায়তা ছাড়াই পরিচালনা করতে হয়েছে। সরাইখানা আক্রমণ করার পরের দিন ওয়াজির খানের ঘোড়া সাপের ভয়ে বেমাক্কা লাফিয়ে উঠতে সে পড়ে গিয়ে উরুতে ব্যথা পেয়েছিলো। বাবরের সনির্বন্ধ অনুরোধে তিনি শাহরুখিয়ায় ফিরে যেতে রাজি হন বাইসানগারের সাথে যোগ দিতে, যাকে তারা সেখানের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে এসেছে।
আজ রাতে তারা বিজয় উদযাপন করবে। সে তার লোকদের সম্মান জানাতে তাদের মাঝে উলুশ বিতরণ করবে। যোদ্ধাদের ভিতরে যারা সবচেয়ে সাহসিকতা আর বীরত্ব প্রদর্শন করেছে প্রথা অনুযায়ী আজ সে ভোজসভার শেষে তাদের মাঝে লুটের মালের সিংহভাগ বিলিয়ে দেবে এবং বাইসানগার আর ওয়াজির খানকে গাভা আক্রমণের কাহিনী শোনাবে। তার গল্প শুনে ওয়াজির খান সম্ভবত হেসে অস্থির হবেন এবং সদা গম্ভীর বাইসানগারের মুখেও সে আজ হয়তো হাসির আভাস দেখতে পাবে।
পাথরের তৈরি দূর্গের অভ্যন্তরস্থ প্রাঙ্গনে প্রবেশের সাথে সাথে, বাবর তার ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে তাদের খোঁজে আশেপাশে তাকায়। বাইসানগারকে সে কোথাও খুঁজে পায় না। কিন্তু ওয়াজির খানকে আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার খুরের উপরের আর পেছনের অংশের কেশগুচ্ছ পর্যবেক্ষণ করতে দেখে। তার বুড়ো বান্ধবকে সামান্য খোঁড়াতে খোঁড়াতে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলে: বাবর ভ্রূ কোঁচকায়। তারপরে সে তাকিয়ে দেখে ওয়াজির খানের মুখ আনন্দে আলোকিত হয়ে রয়েছে।
