মাটিতে গুঁড়ি দিয়ে সে পুনরায় ওয়াজির খান যেখানে আছে সেখানে ফিরে আসে। “মদ্যপ আহাম্মকগুলো আমাদের হাতে মারা যাবার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। ব্যাটারা তাদের তরবারি আর ঢাল পর্যন্ত দরজার কাছে স্তূপ করে রেখেছে।”
ওয়াজির খানের একটা ক্ৰ উপরে উঠে যায়। “সুলতান, এখনই?”
“হ্যা!”
বাবর আর ওয়াজির খান উঠে দাঁড়িয়ে তাদের লোকদেরকেও উঠে দাঁড়াবার ইশারা করে। তারা এই কাজটা আগে এতোবার করেছে যে, মৌখিক আদেশের আর কোনো প্রয়োজন হয় না। ঠোঁটের উপরে আঙ্গুল চেপে, ওয়াজির খান ইশারায় ঘুরে কয়েকজনকে সরাইখানার পেছনে যেতে বলে। যদি সেখান দিয়ে পালাবার কোনো পথ থেকে থাকে। তারপরেই কেবল বাবর তার প্রিয় রণহুঙ্কারে চারপাশ প্রকম্পিত করে: “ফারগানা!”
বাবর একেবারে সামনে থেকে তার লোকদের নেতৃত্ব দেয়। মদের নেশায় মাতাল আর বিস্ময়ে আড়ষ্ঠ চকরাখরা সামান্যই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। বাবর আর তার লোকেরা নির্মমভাবে প্রতিপক্ষের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লে বোঁচা-নাকের সেই মেয়েটার কাছ থেকেই কেবল বলার মতো প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। মেয়েটা তার কাচুলির ভিতর থেকে একটা খঞ্জর বের করে এবং বাবরের বাহুতে সেটা মরিয়া ভঙ্গিতে গেথে দিতে চাইলে, বাবর অনায়াসে তার ঘুঙুর পরা হাতের কব্জি ধরে এবং তাকে ঘুরিয়ে দিয়ে তার নধর নিতম্বে বুট দিয়ে একটা সপাট লাথি বসিয়ে দিতে বেচারী ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে।
কয়েক মিনিটের ভিতরে সবকিছু শেষ হয় এবং বাবরের লোকদের হাঁপিয়ে ওঠার আগেই নিজেদের তরবারির ফলা পরিষ্কার করে কোষবদ্ধ করতে দেখা যায়। তার লোকদের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগেনি। অবশ্য তার লোকদের সবাই পোড়খাওয়া যোদ্ধা, এসব মদ্যপ মাতালদের চেয়ে অনেক দক্ষ লোকদের সাথে তারা আগে লড়াই করেছে। “লাশগুলো বাইরে নিয়ে যাও দেখা যাক আমরা কাদের হত্যা করেছি,” বাবর আদেশটা দিয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে দ্রুত পূতিগন্ধময়, ধোঁয়াটে ঘরটা থেকে বাইরের খোলা বাতাসে বের হয়ে আসে।
তার লোকেরা চকরাখদের লাশগুলি তাদের বুট-পরা পা ধরে হেঁচড়ে বাইরে এনে সারিবদ্ধভাবে সাজালে, বাবর লাশগুলো শুনে দেখে। মোট পনেরটা লাশ। কারো গলা দুভাগ হয়ে আছে, কোনোটা আবার কবন্ধ। তার লোকেরা অবশ্য কাটাপড়া মাথাগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। কোনোটার মাথায় তখনও ভেড়ার চামড়ার টুপি রয়েছে। কাটা মুণ্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে যখন বাবর একটা বিশেষ মুখ চিনতে পারে, তখন তার মুখ থেকে সন্তুষ্টিসূচক একটা শব্দ ধ্বনিত হয়। তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এমন সব চকরাখকে সে হত্যা করবে বলে মনস্থ করেছে। এবং প্রতিটা হত্যাযজ্ঞ যা তাকে তার লক্ষ্যের নিকটবর্তী করছে প্রচণ্ড তৃপ্তিদায়ক।
তারস্বরের চিৎকার শুনে বাবর ঘুরে তাকায়। তার দু’জন যোদ্ধা বাইজি মেয়েদের ধরে তাদের টেনে সরাইখানার বাইরে বের করে আনে। “তাদের উপরে বল প্রয়োগ করবে না। আমার আদেশ তোমরা জানেনা। অর্থের বিনিময়ে যদি তারা স্বেচ্ছায় তোমাদের সঙ্গ দিতে রাজি হয় তবে সেটা আলাদা কথা।” কথাটা বলে বাবর আবার ঘুরে দাঁড়ায়।
দেখা যায় মেয়েগুলো আদতেই ব্যবসায়ী এবং কয়েক মুহূর্তের দ্রুত আলোচনার পরে, সরাইখানার পেছনের এক আপেল বাগিচায় তারা তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। বাবর ধারণা করে বাইজি দু’জন সরাইখানার শকুনের মতো দেখতে মালিকের মেয়ে হবে। যে ঝামেলার গন্ধ পাওয়া মাত্র সেই যে টেবিলের তলায় গিয়ে ঢুকেছে তারপরে আর বের হবার কথা চিন্তাও করেনি। আপেল বাগিচায় শীঘ্রই বাবরের লোকদের দল বেঁধে আসা যাওয়া করতে দেখা যায়। বাগান থেকে হাসিমুখে তাদের বের হয়ে আসা দেখে বোঝা যায় মেয়ে দু’জন তাদের বাবার সরাইখানায় আসা। অতিথিদের খেদমত করতে ভালোই অভ্যস্ত।
ওয়াজির খান ইতিমধ্যে চকরাখদের পালিয়ে যাওয়া ঘোড়াগুলো ধরে আনবার বন্দোবস্ত করেছেন এবং বণিকদের কাছ থেকে লুট করা মালপত্রগুলো পর্যবেক্ষণ। করছেন। “সুলতান, দেখেন,” দুটো উজ্জ্বল বর্ণের গালিচা বের করে সে বাবরের। দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করে। গালিচা দুটোর জেল্লা দেখে বোঝা যায় তন্তুবায়ের দল। সেটা বুননের সময়ে রেশমের সাথে উলের মিশ্রণ ঘটিয়েছে আর গালিচাগুলোর নকশাও অপরিচিত- বণিকের দলটা সম্ভবত পূর্বের, কাশগর থেকে এসেছিল। যেখানের তাঁতিরা এ ধরণের গালিচা তৈরিতে দক্ষ। উল আর চামড়া বেচে ভালো অর্থই পাওয়া যাবে, বাবর ভাবে, যা দিয়ে তার লোকদের সে বকেয়া বেতন দিতে পারবে।
তার যোদ্ধাদের জন্য একটা ভোজসভার আয়োজন করলে মন্দ হয় না। তারা ভালো। কাজ দেখিয়েছে এবং তারও উচিত এর মূল্যায়ন করা। পশ্চিমে, শাহরুখিয়ায় ফিরে যাওয়া মাত্রই সে এই ভোজসভার ঘোষণা দেবে। সেখানে, ছয়মাস আগে। তামবালের কাছ থেকে সে দূৰ্গটা ছিনিয়ে নিয়েছে এবং নিজের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। সমরকন্দে খুন হবার আগে শাহরুখিয়ার সর্দার আলি মজিদ বেগের পূণ্য স্মৃতির প্রতি তারা তাদের শ্রদ্ধা জানাবে। তারা তার উপযুক্ত সন্তানের আত্মার মাগফেরাত কামনা করবে। যে তামবালের চকরাখ যোদ্ধাদের হাত থেকে দূর্গটা রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে। আলি মজিদ বেগের নিহত হবার সংবাদ ফারগানায় পৌঁছানো মাত্র তামবাল দূর্গটা দখল করতে তাদের পাঠিয়েছিলো।
