“সমরকন্দ থেকে কোনো সংবাদ এসেছে? বাইসানগারের সেনাবাহিনী নিয়ে এতদিনে পৌঁছে যাবার কথা।”
“না, সুলতান। কোনো সংবাদ আসেনি।”
“আর ফারগানার কি খবর?” এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য বাবর নিরবে ভাগ্যকে অভিশাপ দেয়। কপাল ভালো হলে এতদিনে ফারগানা তাদের দৃষ্টিসীমায় পৌঁছে যাওয়া উচিত ছিলো।
ওয়াজির খান আবার মাথা নাড়ে। “আমি কোনো সংবাদের প্রত্যাশা করিনি। আমি আমার কোনো লোককে রেকী করতেও পাঠাইনি। আমার একমাত্র অভিপ্রায় ছিলো সুস্থ হয়ে উঠা পর্যন্ত আপনাকে লুকিয়ে রাখা। ফারগানা আর এখানে অনেক গুপ্তচর রয়েছে। আপনার অসুস্থতার সংবাদ ফারগানায় পৌঁছালে-…”
সে বাক্যটা শেষ না করলেও বাবর ঠিকই বুঝতে পারে। বালক সুলতানের পেছনের কুশীলবরা যদি একবার ভেবে নেয় যে সে মারা গেছে তবে তার পরিবারের জেনানারা পরের দিনের সূর্যোদয় দেখার জন্য বেঁচে থাকবে না।
“ধন্যবাদ, ওয়াজির খান। আরো একবার আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে, এমন সব কিছুর প্রতি আপনি লক্ষ্য রেখেছেন।” ওয়াজির খানের কথা শুনে নিজের দুর্দশার কথা তার আবার মনে পড়ে যায়। বাবর আধশোয়া হয়, আশা করে তার দেহে আবার শক্তি ফিরে আসবে। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের দুর্বলতার ব্যাপারে সে পুরোপুরি সচেতন। আজ বাকি দিনটা আমি বিশ্রাম নেবো, কিন্তু কাল থেকে আমরা আবার যাত্রা শুরু করছি।”
“হ্যাঁ, সুলতান আপনার স্বাস্থ্য যদি আমাদের সে অনুমতি দেয়।”
“আমি ঠিকই পিরবো।” বাবর পুনরায় চোখ বন্ধ করে মনে মনে দোয়া করে তার কথাই যেনো ঠিক হয়।
পুরো দিনটা আর রাতের বাকি সময়টা সে ঘুমিয়ে কাটায়। কিন্তু পরের দিন সকালের আলো গুটিগুটি পায়ে গুহার ভিতরে প্রবেশ করতেই তার ঘুম ভেঙে যায়। সতর্কতার সাথে উঠে বসে সে দেখে, মাথা আগের চেয়ে পরিষ্কার লাগছে এবং দুর্বল বোধ করলেও কারো সাহায্য ছাড়াই সে উঠে দাঁড়াতে পারে। গুহার শৈবালের প্রলেপযুক্ত দেয়ালের গায়ে হাত রেখে সে আড়ষ্ঠ ভঙ্গিতে হেঁটে এর মুখের দিকে এগিয়ে আসে এবং মাথা নিচু করে বাইরে বের হয়। ভেড়ার চর্বি দিয়ে জ্বালানো উজ্জ্বল আলোর চারপাশে ওয়াজির খান আর তার কয়েকজন দেহরক্ষী আসনপিড়ি হয়ে বসে রয়েছে। একটা অস্থায়ী কাঠামো থেকে আগুনের উপরে একটা পেতলের কেতলি ঝুলছে।
ওয়াজির খান মাটির কাপে ধোঁয়ার গন্ধযুক্ত একটা উষ্ণ পানীয় আর একটুকরো শুকনো রুটি তার হাতে ধরিয়ে দিলে সে চিবোতে শুরু করে। সে চারপাশে তাকিয়ে লক্ষ্য করে ঘোড়ার পাল দড়ি দিয়ে লতা ঝোঁপের সাথে বেঁধে রাখা হলেও ইতিমধ্যে তাদের পিঠে মালপত্র আর পর্যাণ চাপান শেষ। বরাবরের মতোই ওয়াজির খান সবকিছু ঠিকমতো গুছিয়ে রেখেছে। আধঘণ্টার ভেতরেই তারা নিভুনিভু আগুনের উপরে মাটি চাপা দিয়ে কাছের ঝর্ণা থেকে চামড়ার পানির বোতলগুলো ভরে নিয়ে ঘোড়ায় চেপে বসে।
বাবর তার চিরাচরিত ক্ষিপ্রতা ছাড়াই ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলে টের পায় কেবল ওয়াজির খান না, তার দলের বাকি সবাই তাকিয়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করে সে সূর্যোদয় আর ফারগানার উদ্দেশ্যে ঘোড়া হাঁকায়।
***
জাক্সারটাস নদী আর তার বাড়ি দূর থেকে চোখে পড়তে বাবরের হৃৎপিণ্ডের গতি দ্রুত হয়ে উঠে। নদীর উপরের চূড়োর অর্ধেকটা নিয়ে নির্মিত দুর্ভেদ্য আকশি দূর্গে তার বাল্যকালের সবচেয়ে মধুর সময় কেটেছে। এই মুহূর্তে সমরকন্দ বিজয়ের গৌরবও তুচ্ছ মনে হয় এবং সে টের পায় তার চোখে অশ্রু জমে উঠছে।
“সুলতান, আজ রাতে আর এগোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।” ওয়াজির খানের। চোখেও অশ্রু টলমল করে। “তারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমাদের অগ্রগামী বাহিনী পাঠানো পর্যন্ত আমরা আত্মগোপন করে থাকবো।”
ঘোড়া হাঁকিয়ে দূর্গের ফটকে গিয়ে বাবরের ইচ্ছা করে ভেতরে প্রবেশ করতে। কিন্তু ওয়াজির খানের কথাই ঠিক। টলোমলো ভঙ্গিতে সে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামে এবং হাতেপায়ে জ্বরের পরের ব্যাথা অনুভব করে, এবং শুনতে পায় ওয়াজির খান নিজের দুইজন শ্রেষ্ঠ আর দ্রুতগামী ঘোড়সওয়াড়কে সামনে গিয়ে রেকী করে আসবার জন্য আদেশ দিচ্ছে।
দূর্গ এখান থেকে কমপক্ষে একঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। ক্রমশ ঘনিয়ে আসা। অন্ধকারে আর অগ্রগামী দলটাকে সতর্ক থাকতে হবে সম্ভবত আরও বেশি যেনো কেউ তাদের দেখতে না পায়। তাদের ফিরে আসতে বেশ সময় লাগবে। পাহাড়ের শীর্ষভাগে বাবর আর তার লোকেরা যেভাবে অবস্থান করছে আর ঢালে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক সেখানে নিজেদের উষ্ণ রাখতে বা খাবার রান্না করার জন্য আগুন জ্বালানোটা বোকামীর নামান্তর হবে। অবশ্য এমন না যে, তাদের সাথে পর্যাপ্ত রসদ রয়েছে। বাবর আরোগ্য লাভ করার পরের ছয় দিন তারা শিকারের অন্বেষণে এতটুকুও সময় নষ্ট করেনি বরং সমরকন্দ থেকে নিয়ে আসা শুকনো ফল, আপেল, পনির আর প্রায় গুড়ো হয়ে আসা রুটির উপরে নির্ভর করে কাটিয়েছে। বাবর একটা কম্বলে নিজেকে ভালমতো জড়িয়ে নিয়ে একটা শুকনো তরমুজের ফালি চিবুতে থাকে। ফালিটার মিষ্টত্ব তাকে রীতিমত বিরক্ত করে এবং সে সেটা মুখ থেকে ফেলে পানির বোতলে বড় একটা চুমুক দিয়ে মিষ্টির কারণে সৃষ্ট মুখের অরুচি দূর করতে চেষ্টা করে।
