ভোর হবার দু’ঘণ্টা আগে তাদের পাঠানো রেকী ফিরে আসে। আর বাবর যেমনটা আশা করেছিলো পরিস্থিতি ঠিক ততোটাই খারাপ। দূর্গের ফটক বন্ধ আর প্রচুর পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নদীর পাশের তৃণভূমিতে আগুন পোহাতে থাকা এক পশুপালক আর তার দু’ছেলেকে পেয়েছিল তার স্কাউটরা, বেচারা তাদের দেখে এতটাই ভড়তে গিয়েছিলো যে গড়গড় করে তারা যা জানতে চেয়েছিলো সব বলে দিয়েছে। যাযাবর গোষ্ঠীর অনেক নেতাই বাবরের সৎ-ভাইকে সমর্থন দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সমরকন্দের বাইরে কৃষকের স্ত্রীকে ধর্ষণ আর তার শস্য চুরির অপরাধে যে গোত্রপতির লোকদের সে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো তারা বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিয়েছে জানতে পেরে বাবর মোটেই অবাক হয় না। আর জাহাঙ্গীরের দাদাও তার সাথে রয়েছে। রোক্সানা আর তার ছেলেকে দূর্গে নিয়ে এসেছিলো যে আপাত নির্বিরোধী বুড়ো লোকটা বাবর তার কথা ভাবে। তাদের আশ্রয় দেয়াটাই তার ভুল হয়েছিলো। কিন্তু এছাড়া তার আর কিইবা করার ছিলো? জাহাঙ্গীর তার সৎ-ভাই। রক্ত রক্তই।
ইউসুফ, তার বাবার সময়ের সেই মোটাসোটা কোষাধক্ষ্য, সাথে বাবা কাশকা, শাহী বাজারসরকার, এবং তার খর্বকায় অস্থিরচিত্ত শাহী জ্যোতিষী বাকী বেগও তার সৎ-ভাইয়ের সাথে যোগ দিয়েছে শুনতে পেয়ে সে মোটেই অবাক হয় না- বাবর যদিও তাদের প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু তাদের বাধ্য করেছিলো লাভজনক শাহী পদ থেকে ইস্তফা দিতে।
বোন, আম্মিজান আর কথা তার মনে ভিড় করে। অগ্রগামী দল তাদের কোনো খবর জানতে পারেনি। নিজের অক্ষমতাকে সে অভিশাপ দেয়। সে নিজে আর সাথের দু’ডজন দেহরক্ষী আর কিইবা করতে পারে? তার মূল বাহিনী এসে পড়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতেই হবে।
সূর্য উঠতে বেশতর পাহাড়ের শীর্ষদেশে জমে থাকা বরফ স্ফটিকের মত চমকাতে থাকলে বাবর তার আলখাল্লা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ইশারায় সে একা থাকতে চায় বলে তারা যেখানে ছাউনি ফেলেছে সেই টিলা বেয়ে উঠতে শুরু করে। তার পায়ের নিচের শিশির সিক্ত পান্না সবুজ ঘাস বেশ পিচ্ছিল। বেশ তাজা আর মিষ্টি একটা গন্ধ। কিন্তু অচিরেই শীত নামবে আর এই ঢাল তখন জমে শক্ত আর সাদা হয়ে উঠবে। ভাবনাটা তাকে বিচলিত করে তোলে। শীতকালে সে কিভাবে অভিযান পরিচালনা করবে?
পূর্ব থেকে বয়ে আসা বাতাসে শীতের কাঁপন স্পষ্ট। একটা পাথরের আড়ালে বসে বাবর তীক্ষ্ণ চোখে সামনের ভূখণ্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে, যার প্রতিটা ঢাল সে এতো ভালো করে চেনে যে সেগুলোকে তার নিজের দেহের একেকটা অংশ বলে মনে হয় সবুজ তৃণভূমির প্রতিটা বিস্তার, প্রতিটা খাড়া ঢাল বিশিষ্ট উপত্যকার ধূসর পাথরের বিন্যাস, পর্বতের আঁকাবাঁকা চূড়া আর জাক্সারটাসের বাঁক। সর্বস্ব হারাবার বেদনা তাকে উদ্বেল করে তুললে সে মাথা নিচু করে বসে থাকে।
নির্মেঘ, উজ্জ্বল আকাশের অনেক উঁচুতে সূর্য উঠে আসবার পরে বাবর পশ্চিম থেকে ঘোড়ার অস্পষ্ট পায়ের শব্দ ভেসে আসতে শুনে। দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে সে ঘুরে পেছনে তাকায় এবং অশ্বারোহী বাহিনীর একটা লম্বা সারিকে দূর থেকে উপত্যকার ভিতর দিয়ে এগিয়ে আসতে দেখে। চোখ কুঁচকে তাকিয়ে, সে গুনতে চেষ্টা করে সম্ভবত দুইশো হয়তো আরো বেশি এবং সবুজ নিশানের একটা ঝলক সে দেখতে পায়। নিঃসন্দেহে এটা বাইসানগারের পাঠান অগ্রগামী দল।
নিজের ভেতরে নতুন শক্তির একটা স্ফুরণ অনুভব করে। হতাশা ঝেড়ে ফেলে সে ঘুরে দাঁড়ায় এবং পাহাড়ের পাদদেশে স্থাপিত অস্থায়ী ছাউনির দিকে হোঁচট খেতে খেতে নেমে আসে। “ওয়াজির খান, আমাদের বাহিনী এসে পৌঁছেছে।” ছাউনিতে দৌড়ে প্রবেশের ফাঁকে সে চিৎকার করে ঘোষণা করে।
“আপনি নিশ্চিত তারা আমাদেরই লোক?”
“আমি নিশ্চিত। সমরকন্দের সবুজ নিশান তারা বহন করছে।”
“সুলতান, আমি পথ দেখিয়ে তাদের এখানে নিয়ে আসবার জন্য একটা অভ্যর্থনা বাহিনী পাঠাচ্ছি।”
কম্পিত হৃদয়ে বাবর তার লোকদের একটা অংশকে এগিয়ে যেতে দেখে। এবার দূর্গ থেকে অপদার্থ নচ্ছাড়গুলোকে তাড়িয়ে দেবো। তামবাল তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্য পস্তাবে এবং তার সাথে বাকি সবাই… বাবর পর্যাণ থেকে তার আব্বাজানের তরবারিটা বের করে আনে। খাপ থেকে সেটা বের করতে বটের চুনি সূর্যের আলোতে ঝলসে উঠে। হাতে নিয়ে তরবারিটার ওজন পরখ করতে তার ভালোই লাগে এবং মানসপটে সে তামবালের ভোলা ঘাড়ে সেটা সে এককোপে নামিয়ে আনতে দেখে, ফারগানা শাসনের প্রথম দিনে সে কামবার আলির ঘাড়ে যেভাবে এটা নামিয়ে এনেছিলো।
অচিরেই বাইসানগারকে সামনে নিয়ে অভ্যর্থনাকারী বাহিনী ফিরে আসে।
বাবর সামনে এগিয়ে যায়। শিরোস্ত্রাণের নিচে বাইসানগারকে বিধ্বস্ত দেখায়। “মূল বাহিনী কখন এসে পৌঁছাবে? তারা কি অনেক দূরে রয়েছে?”
উত্তর দেবার আগে বাইসানগার এক মুহূর্ত ইতস্তত করে। “সুলতান, মূল বাহিনী। বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই।”
বাবরের চোখের আশার আলো যেন দপ করে নিভে যায়। “কি বলতে চাইছো?”
“আপনার চাচাতো ভাই, কুন্দুজের মাহমুদ, সমরকন্দ অবরোধ করেছিলো। তামবালের সাথে সে নিশ্চয়ই আগেই পরিকল্পনা করেছিলো এবং নিজের বাহিনীকে সেভাবে প্রস্তুত রেখেছিলো। অগ্রগামী বাহিনীকে সাথে নিয়ে আমি শহর ত্যাগ করা পর্যন্ত সে অপেক্ষা করেছে। তারপরেই আক্রমণ শানিয়েছে। গ্রান্ড উজিরের কয়েকজন প্রাক্তন পারিষদ যাদের উজিরের কন্যা, মাহমুদের স্ত্রী, বার্তাবাহকদের মাধ্যমে প্রচুর বখশিশের লোভ দেখিয়ে দলে টেনেছিল, তারা তাকে ভেতর থেকে সাহায্য করেছে। আমরা পাঁচদিন পথ চলার পরেই কেবল বার্তাবাহক সমরকন্দ পতনের সংবাদ নিয়ে আমার কাছে পৌঁছে। আমি দুঃখিত সুলতান। আমি আমার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি।”
