তিন বয়স্ক লোক মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। বাবর তার অলংকার খুলতে খুলতে ঘুরে দাঁড়ায় এবং তার ঘোড়সওয়ারের পোশাক আর হাতিয়ার আনতে আদেশ দেয়।
***
ওয়াজির খানের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সে গ্রীষ্মের দাবদাহে এখনও তৃণহীন চারণভূমির উপর দিয়ে ঘোড়া হাকিয়ে যায়। বাবরের মনে নিদারুণ যন্ত্রণার ঝড় বয়ে চলে। নিজের পরিবারের জন্য অপরাধবোধ আর ভয় এবং যারা নয় বছরের এক বালকের সাহায্যে তাকে তার সালতানাত থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে বলে ভেবেছে তাদের জন্য তার ভেতরে ক্রোধের দাবাগ্নি ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে। গত কয়েক সপ্তাহ সে মূখের স্বর্গে বাস করেছে। স্বপ্নহতের মত সমরকন্দের চারপাশে বিচরণ করে বেড়িয়েছে, নিজের পরিবারকে কিভাবে এই রূপকথার শহর দেখাবে তার পরিকল্পনা করেছে।
ঔদ্ধত্যের সাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাই সে এড়িয়ে গেছে। ভেবেছে ফারগানায় সবাই তাকে বীরের চোখে দেখবে আর বিদ্রোহের কথা কল্পনাও করবে না। তামবাল আর তার সমর্থকেরা নেকড়ের মতো পশুপালকের পিঠ ঘুরিয়ে নেয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে। যাতে তারা নিশ্চিন্তে ভেড়ার পালের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। আর ব্যাটারা অবশ্যই ধূর্ত, নতুবা তার নানীজান, আম্মিজান অথবা কাশিম ঠিকই কিছু একটা গোলমালের আভাস আঁচ করে এবং বাবরকে আগেই সতর্ক করতো। তার পরিবারের মেয়েদের যদি কিছু হয়…রোক্সানা যদি ফারগানার নতুন সুলতানের মা হিসাবে তার প্রতিপক্ষ আর শত্রুদের বিনাশ করতে চায়… সে বিষয়টা নিয়ে আর চিন্তা করতে চায় না।
প্রতি রাতে ঘোড়ার পিঠে বহু ঘণ্টা কাটিয়ে তারা যখন ক্লান্ত হয়ে হয়ে অস্থায়ী ছাউনি ফেলে, তখনও বাবর দুচোখের পাতা এক করতে পারে না। পূর্বদিকে না এগিয়ে বৃথা বিশ্রামে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে বিষবৎ মনে হয় এবং তাকে বিশ্রাম নিতে অনুরোধ করায় সে খামোখাই ওয়াজির খানের উপরে ক্ষেপে উঠে। কিন্তু চতুর্থ রাত্রে ঘুমাবার কোনো প্রশ্নই উঠে না। মাটিতে পাতা বিছানায় পিঠ দেয়া মাত্র সে কাঁপতে থাকে এবং তার কপাল ঘামে ভিজে উঠে। সকাল নাগাদ তার দাঁতে দাঁত লেগে এমন ঠকঠক করতে থাকে যে, সে কোনো কথাই বলতে পারে না। সে যখন উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে তার পা দেহের ভার নিতে অস্বীকার করায় সে অসহায়ের মতো আবার মাটিতে শুয়ে পড়ে। ওয়াজির খান নিমেষে তার পাশে এসে উপস্থিত হয়, নাড়ী দেখে চোখের পাতা টেনে ধরে মণি দেখতে। “সুলতান আজ আপনি অশ্বারোহন করতে পারবেন না।”
এই প্রথম বাবর তর্ক করার মত শক্তি খুঁজে পায় না। সে টের পায় ওয়াজির খান তার দেহ ভারী উলের কম্বল দিয়ে মুড়ে দিচ্ছে। কিন্তু চোখ তুলে তার দিকে তাকাতে গেলে তার চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা দুলে উঠে এবং আঁধার হয়ে আসে। তারপরে পুরোটা অন্ধকারে ছেয়ে যায়।
***
জ্বরের উত্তাপে শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটের ফাঁকে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। বাবরের জিহ্বা তালুতে অর্ধেক আটকে ছিলো, এখন খুলে এসে আগ্রহের সাথে পানির স্পর্শ গ্রহণ করে। তার কোনো ধারণাই নেই সে কোথায় আছে। মূল্যবান আর্দ্রতা লাভ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অবশেষে কেঁপে উঠে তার চোখের পাতা খুলে যায়। ওয়াজির খানের চিরবিশ্বস্ত অবয়ব তার দিকে ঝুঁকে আছে। এক হাতে একটা লম্বা সুতির কাপড়ের টুকরো ধরে রয়েছে। তার অন্য হাতে একটা পানির বোতল। বাবরকে জ্ঞান ফিরে পেতে দেখে সেগুলো মাটিতে নামিয়ে রেখে সে হাঁটু মুড়ে বসে অপেক্ষা করে।
পিপাসায় বাবরের বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে রয়েছে। আরো পানি।” সে বলতে চেষ্টা করে, কিন্তু শুকনো ঠোঁটের ফাঁক গলে কেবল একটা কর্কশ আর্তনাদ বের হয়। ওয়াজির খান বুঝতে পারে। কাপড়ের টুকরোর একটা প্রান্ত সে বাবরের ঠোঁটের মাঝে স্থাপন করে এবং বাবরের অজান্তে গত এক ঘণ্টা ধরে সে যা করে আসছিলো সেটাই করতে থাকে: কাপড়টাতে পানির একটা ক্ষীণ ধারা ঢালতে থাকে, যাতে বাবরের মুখে কয়েক ফোঁটার বেশি পানি গড়িয়ে না পৌঁছে।
অনেকক্ষণ পরে, বাবর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পানি ছিটকে ফেলে এবং কোনোমতে উঠে বসে। ওয়াজির খান কাপড় আর পানির বোতলটা আবার একপাশে সরিয়ে রাখে এবং তার কপালে হাত রেখে উত্তাপ অনুভব করে। “সুলতান, আপনার জ্বর অবশেষে কমতে শুরু করেছে।”
চারপাশে তাকিয়ে বাবর দেখে তারা একটা ছোট গুহার ভেতরে রয়েছে, যার কেন্দ্রে আগুন জ্বলছে। তার মাথা আবার ঘুরতে শুরু করলে সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। “আমি কতদিন ধরে অসুস্থ?”
“সুলতান, চারদিন হয়ে গেছে। আজ পঞ্চমদিনের দুপুরবেলা।”
“কি হয়েছিলো? নিশ্চয়ই বিষের ক্রিয়া না…?”
ওয়াজির খান অসম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। “না। কেবল জ্বর- খুব সম্ভবত ভেড়ার আঁটুলির দংশন।”
বাবর প্রায় হেসে ফেলে- এই সময়ে ভেড়ার আঁটুলির দংশন!
“কে আছে, সুরুয়া নিয়ে এসো।” ওয়াজির খান তার এক লোককে উদ্দেশ্য করে বলে। যবের আটার তৈরি সুরুয়া ভর্তি পাত্রটা নিয়ে আসলে সে বাবরের পাশে হাঁটু ভেঙে বসে এক হাতে পাত্রটা তার মুখের কাছে তুলে ধরে। অন্য হাতে তার মাথাটা। ধরে। উষ্ণ তরলটার স্বাদ ভালই, কিন্তু সামান্য খাবার পরেই তার পাকস্থলী মোচড় দিয়ে উঠলে সে পাত্রটা একপাশে সরিয়ে দেয়।
