“কিন্তু সে অবশ্যই আসবে।” চিন্তিত কণ্ঠে বাবর বলে। সাইবানি খান ইতিমধ্যে সমরকন্দের একজন সুলতানকে হত্যা করেছে: আরেকজনকে বিশেষ করে কিশোর আর সদ্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে এমন একজনকে হত্যা করতে তার ইতস্তত করার কোনো সঙ্গত কারণ নেই।
“হ্যাঁ, সুলতান, আমি জানি সেটা। আমরা সবাই জানি। কিন্তু বসন্তের আগে সে এখানে আসবে না। আমরা ততোদিনে তাকে আর তার বদমায়েশ শিষ্যগুলোকে একটা ভালো শিক্ষা দেবার জন্য প্রস্তুত থাকবো।” ওয়াজির খানের আত্মবিশ্বাস বাবরকে সামান্য হলেও স্বস্তি দেয়।
সহসা অনেকগুলোর কণ্ঠস্বর শুনে তারা সবাই চারপাশে তাকায়। উদ্যানের বিপরীত দিকে কমলা রঙের ম্যারিগোল্ড আর গোলাপী রঙের গোলাপের বাগিচার অপরপাশে, বাবর একজন প্রহরীর সাথে ঝুঁকেপড়া ক্ষুদে একটা অবয়বকে তাদের দিকে হেঁটে আসতে দেখে। লোকটার পরণে ভ্রমণের পোশাক এবং সে কাছে এসে রাস্তার ধূলো থেকে বাঁচবার জন্য মুখের চারপাশে জড়িয়ে রাখা বেগুনী রঙের গলবস্ত্র খুলতে বাবর তার দাদীজানের বয়োবৃদ্ধ খিদমতগার, ওয়ালিদ বাট্টের, বলিরেখায় পূর্ণ মুখমণ্ডল আর পাতলা হয়ে আসা সাদা চুল চিনতে পারে। তাকে দেখে বাবরের কেমন যেনো বিপর্যস্ত মনে হয়, আর সেটার কারণ ঘোড়ায় চড়ে দীর্ঘপত্র পরিক্রমা না- তার বয়সী লোকের জন্য অবশ্য সেটাই যথেষ্ট উপলক্ষ- বরং সে সাথে করে যে লেফাফা নিয়ে এসেছে সেটা।
এক মুহূর্তের জন্য, গ্রীষ্মকালের সন্ধ্যাবেলা সত্ত্বেও বাবর টের পায় একটা শিরশিরে অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এসান দৌলত কি তবে মৃত? দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে সে মঞ্চ থেকে নেমে বৃদ্ধ লোকটার কাঁধ জড়িয়ে ধরে। “খিদমতগার কি হয়েছে খুলে বলো? কি সংবাদ তুমি নিয়ে এসেছো?”
ওয়ালিদ বাট্ট ইতস্তত করে, যেনো বুঝতে পারে না কোথা থেকে শুরু করবে। বাবরের ইচ্ছা করে এক ধমকে তার ইতস্ততভাব ঘুচিয়ে দেয়। কিন্তু জন্মের পর থেকে দেখে আসা লোকটার প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধের কথা স্মরণ রেখে সে নিজের অসহিষ্ণুতা দমন করে।
“সুলতান, আপনার কাছে এভাবে হাজির হয়েছি বলে আমার অপরাধ মার্জনা করবেন কিন্তু আমাকে দ্রুত আসতে হয়েছে।” খিদমতগার আলখাল্লার ভিতর থেকে একটা চামড়ার থলে বের করে যা একটা ছোট দড়ির সাহায্যে তার গলা থেকে ঝুলছিল এবং সেটার ভেতর থেকে সে ফারগানার রাজকীয় সিলমোহর করা একটা চিঠি বের করে।
বাবর চিঠিটা নিয়ে দ্রুত সেটা খুলে পড়তে শুরু করে। হাতের লেখা দেখে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কিন্তু তার মানসিক প্রশান্তি অচিরেই বাষ্পীভূত হয়। এসান দৌলতের লেখা শব্দগুলো তার চোখের সামনে যেনো নাচতে শুরু করে। “তুমি যদি আমাদের বিপর্যয়ে সাড়া না দাও তবে আমরা নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি হবো।” পুরো চিঠিটা সে দ্রুত পড়া শেষ করে, কথা পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পেরে তার হতভম্বভাবটা আরো বেড়ে যায়।
“কি হয়েছে, সুলতান?” ওয়াজির খান জানতে চায়।
“আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। আমার জারজ সৎ-ভাই জাহাঙ্গীরকে ফারগানার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে- একটা বাচ্চা পুতুল যাকে নিয়ে খেলছে আমার রক্তসম্পর্কীয় ভাই তামবাল। উপজাতি গোত্রপতিদের বখশিশের লোভ দেখিয়ে সে দলে টেনেছে…নিজের সুবিধার্থে সে জাহাঙ্গীরকে ব্যবহার করছে…” বাবরের আঙ্গুলের ফাঁক গলে চিঠিটা মাটিতে পড়ে গেলে বাতাস সেটাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে গোলাপ ঝাড়ে আটকে দেয়। সে ভাবে আমার জন্মভূমির মসনদ আমি হারিয়েছি।
ওয়াজির খান চিঠিটা তুলে নিয়ে দ্রুত পড়তে থাকলে আরেকটা আরো ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা বাবরের মাথায় উঁকি দেয়। আবার সে ওয়ালিদ বাট্টের কাঁধ চেপে ধরে। এবার এতোটাই জোরে যে কবুতরের মতো পলকা বৃদ্ধ লোকটা ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠে। আমার মা, বোন আর নানীকে তুমি শেষবার কখন দেখেছো? তারা কোথায় আছে? তারা কি নিরাপদ আছে?”
ওয়ালিদ বাট্ট অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। “দূর্গে আপনার উজির কাশিম আর তাদের সবাইকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। আপনার নানীজান অনেক কষ্টে এই চিঠিটা আমাকে দিয়ে বলেছেন আপনার কাছে পৌঁছে দিতে। কিন্তু আমি বলতে পারবো না তারা জীবিত না মৃত। আমি জানি না। গত দু’সপ্তাহ আমার রাস্তাতেই কেটেছে।” তার কণ্ঠস্বর ভেঙে আসে।
সে সহসা টের পায় বুড়ো লোকটাকে ব্যাথা দিচ্ছে, বাবর তার মুঠো আলগা করে। “খিদমতগার, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নাও। তোমার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।” পেছন থেকে ওয়ালিদ বাট্টের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয় বাতাস একটু জোরে বইলে বেচারার ক্ষীণকায় দেহ বোধহয় উড়েই যাবে।
বাবর বিচলিত বোধ করে। তার প্রারম্ভিক অবিশ্বাসের জায়গায় জলোচ্ছাসের মত ক্রোধ এসে ভর করে। তামবালের এত বড় আস্পর্ধা তার সালতানাত দখল করে তারই পরিবারকে অন্তরীণ করেছে…? কিন্তু সে নিজের মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করে। সে এখন যে সিদ্ধান্ত নেবে তার উপরেই সবকিছু নির্ভর করছে। তার দিকে উদগ্রীব চোখে তাকিয়ে থাকা পারিষদবর্গের দিকে তাকিয়ে সে একটা গভীর শ্বাস নেয়।
“ওয়াজির খান, আমার দেহরক্ষী বাহিনীকে প্রস্তুত করেন। আমরা এই মুহূর্তেই ফারগানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো। বাইসানগার একটা বাহিনী প্রস্তুত করেন। আমার অধীনস্ত গোত্রপতি আর তাদের লোকদের ডেকে পাঠান- তামবাল আর তার অনুগত উপজাতীয় বাহিনীকে শায়েস্তা করতে হলে দু’হাজার লোকের বাহিনীই যথেষ্ট হবে। আমার ধারণা একবার আকশি পৌঁছালে ফারগানার বেশিরভাগ লোকই তাদের ন্যায়সঙ্গত সুলতানের পক্ষ সমর্থন করবে। যাই হোক, সাইবানি খান আসলে যাতে নিরাশ না হয়, সেজন্য এখানে যথেষ্ট সেনা মোতায়েন রাখেন এবং এক সপ্তাহের ভিতরে আমাদের অনুসরণ করবেন। আর হ্যাঁ, দুরমুজ আর অবরোধ যন্ত্র এবং নিক্ষেপক প্রস্তুত রাখবেন, যেনো আমি নির্দেশ পাঠালে সাথে সাথে পাঠাতে পারেন। আলি মজিদ বেগ আমার অনুপস্থিতিতে আপনি সমরকন্দের রাজপ্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্বপালন করবেন। ঠিকমতো পাহারা দেবেন আশা করি।”
