সামনে রাজদণ্ড-বহনকারী আর পেছনে লম্বা চারজন দেহরক্ষী নিয়ে বাবর মার্বেল মোড়া পথের উপর দিয়ে হেঁটে বাগানের দিকে আসে, যেখানে ফুল লতা পাতা শোভিত চাদোয়ার নিচে বিছান গালিচায় তার পারিষদবর্গ আসনপিড়ি হয়ে বসে তার অপেক্ষা করছে। এইসব দীর্ঘ বৈঠক বাবরের বিরক্ত লাগে কিন্তু এখনও অনেক কাজ বাকী রয়েছে। তার চাচাজানের মৃত্যুর পরে উদ্ভূত অনিশ্চয়তা আর দ্বন্দ্ব এবং তারপরে তার অবরোধে অনেক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সমরকন্দের চারপাশের ক্ষেত আর তৃণভূমি যথেষ্ট উর্বর, কিন্তু কৃষকরা ভয়ে চাষই করেনি এবং এ বছরের ফসলের অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। ফারগানা থেকে নিজেদের রসদের জন্য আনা শস্যবীজ আগামী বসন্তে চাষীরা যাতে চাষের কাজে ব্যবহার করতে পারে সেজন্য তাদের মাঝে বন্টনের আদেশ দিয়েছে বাবর। আর এছাড়া পশুপালকদের অনেকেই যুদ্ধের হাঙ্গামা থেকে দূরে পশ্চিমের নিজেদের গৃহপালিত পশুর পাল নিয়ে পালিয়ে গেছে। তাদেরও অভয় দিয়ে ফিরিয়ে আনার বন্দোবস্ত করতে হবে।
বাবর ভাবে, তাকে সাহায্য করার জন্য যোগ্য লোক অন্তত তার পাশে আছে। ওয়াজির খান, তার ইচকিসের, পারিষদবর্গের ভিতরে অন্যতম। এছাড়াও বাইসানগার আছে, সমরকন্দের সৈন্যরা তাকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করে। শহরের পতনের পরেই কেবল বাবর বুঝতে পেরেছে বাইসানগারের স্তোকবাক্য, নাশকতামূলক তৎপরতা, আর ঘুষের কারণে তাকে এত দুর্বল প্রতিপক্ষ মোকাবেলা করতে হয়েছে। তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত, সমরকন্দের পুরো নিরাপত্তার দায়িত্ব বাবর বাইসানগারের উপরে অর্পণ করেছে।
আলি মজিদ বেগের পোড় খাওয়া মুখের উপরে তার দৃষ্টি আপতিত হয়। তাকে পারিষদবর্গের অন্তর্ভূক্ত করে সে বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। অনেকটা অতীত আনুগত্যের কারণে পুরষ্কার যে কয়েকজন গোত্রপতি শুরু থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে শুরু থেকে বাবরকে সমর্থন জানিয়ে এসেছে, সে তাদের অন্যতম। কিন্তু এর ভেতরেও বিচক্ষণতার মারপ্যাঁচ রয়েছে। আলি মজিদ বেগ ফারগানার অন্যতম প্রভাবশালী গোত্রপতি। সমরকন্দে সে যে বাবরের সাথে অবস্থান করছে এটা অনেককেই প্রভাবিত করেছে- বাবরের ধারণা যাদের ভিতরে অনেকেই এই মুহূর্তেই ফারগানায় ফিরে যেতে চায়- থাকতে।
কিন্তু, অনেকেই অবশ্য ফিরে গিয়েছে। তারা এই অভিযানে এসেছিলো লুট করতে আর একবার সেটা পাবার পরে বাড়ি ফিরে যাবার জন্য তারা অধীর হয়ে উঠেছে। বুনো আর উচ্ছঙ্খল চকরাস, নিষ্ঠুরতা আর বিশ্বাসঘাতকতা যেখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার সেখানেও তারা তাদের সতত পরিবর্তনশীল মনোভাব আর নির্মমতার জন্য বিখ্যাত। তাদের দুর্গম পাহাড়ী আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে সটকে পড়তে শুরু করেছে এবং শরৎ কাল এসে পড়ার কারণে প্রতিদিনই আরও বেশি সংখ্যক লোক চলে যাচ্ছে। বাবরের পারিষদগণ সে এগিয়ে আসতে নতজানু হয়। কিন্তু সে হাতের ইশারায় তাদের উঠে দাঁড়াবার ইঙ্গিত দেয়। দিনের কাজ শুরু করার জন্য সে উদগ্রীব হয়ে আছে। সে ইতিমধ্যে একটা কথা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছে যে, একজন সুলতানকে বড় বড় ব্যাপারেই মাথা ঘামালে কেবল চলবে না। মাত্র গতকালের ঘটনা, শকুনের মত দেখতে দুই গালিচা ব্যবসায়ীর ভিতরে উদ্ভূত ঝগড়ার মধ্যস্থতা তাকে করতে হয়েছে। সুদূর পারস্যের তিবরিজ থেকে আনা লাল, গোলাপী আর নীলরঙের গালিচার মূল্য নিয়ে দুজনেই বালখিল্যসুলভ বিবাদে লিপ্ত হয়েছিলো। সেই জানে। কিভাবে সে হাসি চেপে রেখেছিলো।
“সুলতান, এগুলো আজকের দিনের আর্জি।” তার পরিচারক হাতের রূপার ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে। সেখানে একতাড়া কাগজ। বাতাসে যাতে উড়ে না যায় সেজন্য একটা পিতলের ওজন দিয়ে চেপে রাখা আছে।
উপরের আর্জিতে লেখা বিবরণীর দিকে তাকিয়ে বাবরের মন হতাশায় ভরে ওঠে। সম্ভবত কারো ছাগল বা ভেড়া হারিয়ে গেছে বা পাহাড়ের বিরান জমিতে পশুচারণের অধিকার চেয়ে কোনো আর্জি। “আমি ওগুলো পরে দেখবো।” এসবের চেয়ে শিকারে যাবার জন্য তার ভেতরটা ছটফট করে। সে হাতের ইশারায় তার পারিষদবর্গকে বসতে বলে এবং কাঠের নিচু মঞ্চের উপরে তার জন্য নির্দিষ্ট গজদন্তের কারুকাজ করা টুলে উপবেশন করে। তাদের মতো নিচে আসনপিড়ি হয়ে বসা অনেক বেশি কষ্টকর।
“শহরের নিরাপত্তার পর্যালোচনা কবে নাগাদ শেষ হবে?” সে বাইসানগারকে জিজ্ঞেস করে।
“সুলতান, প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। অস্ত্রাগারে অস্ত্রের মজুদের চুড়ান্ত হিসাব সম্পন্ন হয়েছে। তবে রাজমিস্ত্রীরা এখনও শহর রক্ষাকারী দেয়াল আর র্যামপার্টের অবস্থা খুঁটিয়ে দেখছে। তারা বলেছে দু’বছর আগের ভূমিকম্পে দেয়ালের কয়েক জায়গার ভিতে ক্ষতি হয়েছে যা মেরামত করতে হবে।”
বাবর মাথা নেড়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। “মেরামত যা কিছু করার, সব দ্রুত শেষ করতে হবে। এতো সহজে সমরকন্দের পতন হয়েছে যে ব্যাপারটা আরো অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করবে। ওয়াজির খান, সাইবানি খান আর তার হায়েনাদের কি খবর?”
“তাদের ফিরে আসবার জন্য আমরা সর্বদা সতর্ক রয়েছি। কিন্তু আমাদের সীমান্তে টহল দেয়া সৈন্যরা এখনও উজবেক আক্রমণকারীদের কোনো আনাগোনা লক্ষ্য করেনি। সাইবানি খান জানে শীতকালের আগে আক্রমণ করার জন্য তার হাতে অল্প সময় আছে।”
