উলুঘ বেগের নির্মিত মাদ্রাসা বাবর পরিদর্শন করেছে। রেজিস্তান প্রাঙ্গনের একপাশে সেটা অবস্থিত এবং আকাশী আর সবুজাভ-নীল টালিতে শোভিত, এর নকশা এতটাই জটিল যে লোকেরা একে হাজারবাফ “সহস্র-স্রোত” বলে থাকে। শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিবি খানম মসজিদ তাকে পুরোপুরি অভিভূত করে। মসজিদটা তার ফারগানার দূর্গের আড়ম্বরহীন, সাদামাটা মসজিদের থেকে একেবারেই আলাদা, যেখানে পূর্ণিমার আলোয় গোত্রপতিরা তার প্রতি অনুগত থাকবার শপথ নিয়েছিল, আজ ঘটনাটাকে মনে হয় যেন বহুযুগ আগের কোনো কথা।
এক মোল্লা বাবরকে বলেছে, কিভাবে তৈমূরের প্রিয় স্ত্রী, বিবি খানম, গজদন্তের মত দেহের তৃক বিশিষ্ট চীনা রাজকুমারী যার দীপ্ত সৌন্দর্য অবলোকন করে তৈমূরের চোখে জল চলে আসত, কোনো একটা অভিযান থেকে ফিরে আসবার পরে তৈমূরকে একটা চমক দেবার জন্য মসজিদটা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু পারস্য থেকে মসজিদটা নির্মাণের জন্য রাণীর ডেকে আনা স্থপতি, মুহূর্তের স্বেচ্ছাচারী আবেগেতাড়িত হয়ে, তাকে আলিঙ্গন করে গলায় একটা কামড়ের দাগ বসিয়ে দেয়। এই ঘটনার মাত্র কয়েকদিন পরেই তৈমূর তার অভিযান থেকে ফিরে এসে তার স্ত্রীর আপাত খুঁতহীন ত্বকে দাগটা লক্ষ্য করে এবং খালুমের কাছে পুরো ঘটনাটা শুনে সেই বেয়াদপ স্থপতিকে ধরে আনবার জন্য লোক পাঠালে, সে ভয়তরাসে তার সদ্য তৈরি করা আকাশ-স্পর্শী মিনারের একটার উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে। কাহিনীটার সারবত্ত্বা যাই হোক, লম্বা অভিজাত প্রবেশ পথের দু’পাশে দেড়শ ফুটের বেশি উঁচু মিনার আর তার চেয়েও উঁচুতে অবস্থিত মসজিদটার গম্বুজ- মোজাইকের দ্বারা অলংকৃত- দেখে বাবরের ভিতরে একটা ভয় জাগান সমবোধ জেগে উঠে।
বাবর হাই তুলে এবং আড়মোড়া ভাঙে। তার আম্মিজান যখন সমরকন্দে পৌঁছাবে তিনি আনন্দিত আর পুলকিত হবেন এবং খানজাদা কৌতূহল আর উত্তেজনায় কেমন একটা ঘোরের ভেতরে থাকবে। কিন্তু এসান দৌলতের ব্যাপারটা সে ঠিক অনুধাবন করতে পারে না। তার খুশি করাটা খুব কঠিন একটা কাজ। সে কল্পনার চোখে দেখতে পায়, বলিরেখায় জর্জরিত মুখের সঙ্কটা মোকাবেলায় প্রস্তুত কালো কালো খুদে দুই চোখে তাকিয়ে তিনি মাথা নাড়ছেন এবং সাফল্যের কারণে বেশি উৎফুল্ল না হয়ে তাকে ভাবতে বলছেন এরপরে কি অপেক্ষা করছে।
বাবর ভাবে, সে যাই হোক তারপরেও সে তার অধিকার আদায় করে নিয়েছে। নিয়তির বাড়িয়ে দেয়া সুযোগ সে অকুণ্ঠ চিত্তে গ্রহণ করেছে। সে হাততালি দিতে একজন পরিচারক সাথে সাথে একটা বিশাল রূপার পাত্র যা এক জগ গোলাপজল মেশান উষ্ণ পানি দিয়ে পূর্ণ নিয়ে হাজির হয়। পাত্রটা সাবধানে নিয়ে সে বাবরের দিকে এগিয়ে আসে, হাতে ধরা একটা কাপড় দিয়ে তাকে পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সে হাত নেড়ে তাকে বিদায় করে। তার সব কাজ অন্য কেউ করে দেবে এখনও সে পুরো এই ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি এবং পরিচারককে সে তার বিছানার পাশে রাখা ছোট টেবিলে কাপড় আর পানির পাত্রটা রেখে যেতে বলে। পানির সমতল পৃষ্ঠে ভেসে উঠা নিজের অবয়বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফারগানার কোনো একটা পাহাড়ী ঝর্ণার শীতল পানিতে মাথা ডোবানোর একটা অপ্রত্যাশিত ইচ্ছা তাকে পেয়ে বসে।
কিন্তু তার এই ভাবনার রেশ সদ্য তৈরি করা রুটি আর পরিজের মন মাতান গন্ধে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। বেহেশতে বাস করার সময়ে সে যদি বাড়ির কথা ভেবে বা অন্য কারণে মন খারাপ করে তাহলে তাকে আহাম্মক বলতে হবে। তার লোকদেরও আপাতভাবে সন্তুষ্ট মনে হয়- যা একটা বিরল ব্যাপার, গলা আর কাঁধ ডলে পরিষ্কার করতে করতে সে ভাবে। অবশ্য, সে তাদের তার প্রতিশ্রুতিমত বা তার চেয়েও বেশি পুরস্কৃত করেছে। সমরকন্দের মোহরে ঠাসা সিন্দুক তাকে উদার হতে এক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়তা করেছে। সে তার সব গোত্রপতিকে একশটা করে সোনার আশরফি আর তাদের অধিনস্ত লোকদের আশাতীত রকমের রৌপ্যমুদ্রা দিয়েছে। বাবর অবশ্য প্রাপ্ত ধনসম্পদের একটা ভাল অংশ ফারগানায় তার প্রতিনিধি কাশিম আর তার অনুসারীদের পুরস্কৃত করতে আর আশেপাশের ঝামেলাবাজ গোত্রগুলোর আনুগত্য যাতে সে বজায় রাখতে পারে সেজন্য পাঠাতে ভুল করেনি। বাবরের অনেক লোকই নতুন দ্বার পরিগ্রহ করেছে। সে যেমনটা আশা করেছিলো, গ্রান্ড উজিরের হারেমের তরুণীর দল অনেকটা আগ্রহের সাথেই তার লোকদের সাথে গিয়েছে। টাকার থলে ভর্তি বিজয়ী যোদ্ধার আবেদন ছোট করে দেখার উপায় নেই।
তার এখন পোশাক পরার সময় হয়েছে। নিজের অসহিষ্ণুতা চেপে রেখে সে তার অনুচরদের মোসাহেবের ভঙ্গিতে তাকে ঘিরে ধরে, নরম হরিণের চামড়া দিয়ে তৈরি পাজামা আর সাদা রেশমের কাফতানে তাকে সুসজ্জিত করে তোলার অনুমতি দেয়, তারপরে তাদের বাড়িয়ে রাখা রেশমের একাধিক কারুকাজ করা টিউনিক থেকে একটা- তার নতুন প্রজাদের মন রক্ষার্থে উজ্জ্বল সবুজ রঙের যাতে তার ফারগানার হলুদ ডোরাকাটা রয়েছে সাথে ইস্পাতের বকলেস- সে পছন্দ করে। ফারগানার রুক্ষ কাপড় আর যেনতেন প্রকারে হরিণের চামড়া থেকে তৈরি পোশাকের চেয়ে সমরকন্দের দর্জির নিখুঁত সেলাই করা পোশাক একদম আলাদা মনে হয়। এক পরিচারক তার কোমরে একটা সঞ্জাবযুক্ত পরিকর গাণিতিক নিপূণতায় পরিয়ে দেয়। আরেকজন পায়ের কাছে বসে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা সোনার সুতা দিয়ে কারুকাজ করা বুট পরতে সাহায্য করে। তারপরে চন্দনকাঠের একটা বাক্স থেকে বাবর কিছু অলঙ্কার পছন্দ করে। গয়নার প্রতি তার কোনো বিশেষ আগ্রহ নেই কিন্তু আজ বিবি খানম মসজিদে তাকে লোকজনের সাথে নামাজ পড়তে হবে আর উৎসুক জনতার চোখে তাকে যেন পুরোদস্তুর একজন সুলতানের মত দেখায়, যার প্রাচুর্য– আর একই সাথে তার উদারতা- সতত পরিবর্তনশীল মৈত্রী আর আনুগত্যের দুনিয়ায় যেন অফুরন্ত।
