বাবর ঠিক করে সে, ছিপছিপে গাঢ় সবুজ বর্ণের সাইপ্রেস, চিনার আর দেবদারু ঘেরা এবং মার্বেলের স্তম্ভের উপরে চীনা পোর্সেলিনের কারুকাজ করা প্রশস্ত ভবনের একটায় রাত কাটাবে। সে জানে, তৈমূরও বাগানে রাত কাটাতে পছন্দ করতো। সে দুটো নহরের সঙ্গমস্থলের উপরে স্থাপিত একটা মঞ্চে নিজের সিংহাসন স্থাপনের মত নির্দেশও দিয়েছিলো। বহমান চারটা ধারা জীবনের চারটে নদীর স্মারক আর ভূগোলকের চারপ্রান্তে তার আধিপত্যের উপস্থাপক।
বাবর তৈমূরের কথা যতই ভাবছে ততই শ্বাসরুদ্ধকর বলে প্রতিয়মান হয় তার দৃষ্টিভঙ্গি আর আকাঙ্ক্ষা। নিজেকে তৈমূরের উত্তরাধিকারী বলাটা সহজ, কিন্তু যখন সে এর দ্যোতনার কথা বিবেচনা করে, সে একাধারে উল্লসিত আর অকিঞ্চিৎকর বোধ করে।
কিছু একটা সম্ভবত তিতিরের ডাক- তাকে স্বপ্ন থেকে জাগিয়ে তোলে। সে চমকে উঠে বসে এবং চারপাশে তাকায়। এই বিলাসিতা- মেঝেতে ধূসর গজদন্ত আর কালো আবলুস কাঠের কারুকাজ, মার্বেলের ভাস্কর্য, সোনার পানপাত্রে পান্না, ফিরোজা আর চুনির কারুকাজ- এসব অবাস্তব বলে মনে হয়। সোনার সুতার কাজ করা গোলাপী রঙের যে রেশমের চাদরে সে শুয়ে আছে সেটায় হাত বুলিয়ে দেখে। গোলাপী পাথরের কারুকাজ সংবলিত রূপা আর সোনার জলে সূক্ষ গিল্টি করা অন্তঃপট তার আর পরিচারকদের দৃষ্টির মাঝে একটা আড়ালের জন্ম দিয়েছে।
গ্রান্ড উজির যত অপরাধই করে থাকুক, সে অন্তত তৈমূরের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদের ভালই যত্ন নিয়েছিলেন। গোলমালের প্রাথমিক আভাস পাবার সাথে সাথেই তিনি সব মূল্যবান গালিচা, ঝালর আর ফুলদানী এবং পাত্রসমূহ সমরকন্দে নিয়ে যাবার আদেশ দিয়েছিলেন, যা তিনি সেখানের দূর্গপ্রাসাদের ভূগর্ভস্থ কোষাগারে গোপনে সংরক্ষণ করেছিলেন। উজিরের পারিষদবর্গ নতুন শাসকের কাছে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের অভিপ্রায়ে দ্রুত এসব কিছুর অবস্থান বাবরের লোকদের কাছে প্রকাশ করেছে। যদিও প্রাসাদের অনেক মূল্যবান অলংকরণ কুপিয়ে তুলে ফেলা হয়েছে আর অবরোধেরকালে কাঠের তৈরি কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ভবন জ্বালানী কাঠের জন্য ভেঙে ফেলা হয়েছে, বাবর ভেবে দেখে প্রাসাদের আসল সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে খুব একটা বেশি খাটাখাটনির প্রয়োজন হবে না।
শহরটা নিরাপদ হলে সে যখন তার আম্মাজান, আর বোনকে এখানে ডেকে আনবে, তখন তারা কি বলবে সেটা ভেবে বাবর নিজের মনেই হেসে উঠে। সমরকন্দের প্রসিদ্ধ পুরু কাগজে লেখা তার চিঠিগুলোতে শহরের ইতিহাস, মহিমা কিংবা বিশালতার প্রতি সে মোটেই সুবিচার করতে পারেনি। এই শহরটা আর যাই হোক আঠারশ বছর আগে সোনালী চুলের, নীল চোখের দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার কর্তৃক স্থাপিত। যিনি সুদূর পশ্চিম থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে তৈমূরের মতই সব প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে এসেছিলেন। চওড়া র্যামপার্টযুক্ত সমরকন্দের বাইরের দেয়াল বাবর মেপে দেখতে বললে দেখা যায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের পুরো চারপাশটা ঘুরে আসতে এগার হাজার পা হাঁটতে হয়। তৈমূর তার শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি আসলেই লক্ষ্য রেখেছিলেন- অবশ্য বাবরের প্রথম রাজকীয় আদেশ ছিল যে সুড়ঙ্গ পথে সে ভেতরে প্রবেশ করেছিলো সেটার মুখ পাথর দিয়ে বন্ধ করে দেয়া। সে চায় না অন্যরা- এবং যাদের সংখ্যা অনেক যারা সমরকন্দের দিকে শকুনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে- আক্ষরিক অর্থে তার পদচিহ্ন অনুসরণ করুক। সে আরও কোনো সুড়ঙ্গ আছে কি না সেটা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবারও আদেশ দেয়।
বাবর আবার তার মাথার চাপে দেবে বসে থাকা বালিশে শুয়ে পড়ে। গত কয়েক সপ্তাহের দৃশ্যপট আর অভিজ্ঞতা এতটাই সমৃদ্ধ যে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এত অল্প সময় অতিবাহিত হয়েছে। কাছে লেখা তার চিঠিগুলো, যিনি এসব বিষয়ে দারুণ আগ্রহী, সে শহরের বাইরে কোহাক টিলায় অবস্থিত তিনতলা বিশিষ্ট বৃত্তাকার মানমন্দির প্রথমবারের মত দেখে তার বিস্ময়ের কথা চিঠিতে ফুটিয়ে তুলতে চায়, যেখানে তৈমূরের নাতি উলুঘ বেগ সৌর আর চন্দ্র বর্ষপঞ্জি নিয়ে গবেষণা করতেন। বাবর হতবাক হয়ে, উলুঘ বেগের সেক্সট্যান্টের ইটের তৈরি মার্বেলের আস্তরণ দেয়া নিখুঁত বৃত্তচাপটা দেখে, প্রায় দুইশ ফিট লম্বা এবং একশ ত্রিশ ফিট তার ব্যাসার্ধ আর রাশিচক্রের বিভিন্ন চিহ্ন দ্বারা অলংকৃত। সেক্সট্যান্টের উভয় পার্শ্বে ধাতব রেলের উপরে স্থাপিত এ্যাস্ট্রোলোব ব্যবহার করে উলুঘ বেগ তার পর্যবেক্ষণ করতেন।
সবুজ মাঠের উপর দিয়ে পঙ্গপালের মত একটা ধ্বংসের মেঘের ন্যায় বিচরণ করে তৈমূরের যোদ্ধারা যদি পৃথিবী জয় করে থাকে, তবে তার উত্তরসুরী উলুঘ বেগ স্বর্গ দখল করেছেন। সমরকন্দের জ্যোতিষবিদরা এখনও তার তৈরি করা রাজকীয় জ্যোতিষবিদ্যার চার্ট ব্যবহার করে। বাবর তার পর্যবেক্ষণ আরও বেশি করে পাঠ করতে চায় কিন্তু তারপরেও মানমন্দিরের পরিশীলিত সূক্ষ মাত্রা তার ভিতরে নিজের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে এক ধরণের গর্বের জন্ম দেয়। উলুঘ বেগের নিজের ছেলে, বাবার জ্ঞান আর বীক্ষার প্রতি এই সাধনায় অস্বস্তিবোধ নিজের করে এবং ধর্মান্ধ মৌলবাদী মোল্লাদের প্ররোচণায়, যারা ভয় পেয়েছিল হয়ত এর ফলে তাদের রহস্যের মূল উন্মোচিত হয়ে পড়বে আর তাদের ধর্মমত প্রশ্নের সম্মুখীন হবে, নিজের পিতাকে খুন করে।
