বাবর, দেয়াল দিয়ে ঘেরা সমাধিভবনের লম্বা, খিলানাকৃতি দ্বারের কাছে পৌঁছালে, লাফ দিয়ে ঘোড়া থেকে নামে। ব্যাখ্যার অতীত কোনো অজানা কারণে, সে কিছুক্ষণ একা থাকতে চায়। ওয়াজির খান আর তার রক্ষীদের অপেক্ষা করতে বলে, তারপরে সে ভিতরে প্রবেশ করে। সে একটা আঙ্গিনা অতিক্রম করে যেখানে উঁত গাছের ডালে অসংখ্য চড়ুই পাখি কিচিরমিচির করছে, প্রথা অনুযায়ী পায়ের কারুকাজ করা বুট জুতা খুলে সে ভেতরের সমাধিকক্ষে প্রবেশ করে।
ভেতরে বাইরের উজ্জ্বল আলোর বিপরীত অবস্থা বিরাজ করায় তার দেখতে কষ্ট হয় এবং চোখ পিটপিট করতে করতে সে একটা অষ্টাভূজাকৃতি কামরায় প্রবেশ করে। ধনুকাকৃতি খিলানের উপরের নকশা কাটা জাফরির ভিতর দিয়ে প্রবেশ করা আলোর ধারায় বিষণ্ণ বৈভব দেখে তার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে। মার্বেলের উপরে সবুজ অ্যালাব্যাস্টার বসান এবং মাথার উচ্চতায় অধিরোপিত সোনালী টালির দেয়ালে সে আনমনে আঙ্গুল বোলায়। তার উপরে, নীল আর সোনালী কাগজের বোর্ড দিয়ে দেয়ালে নানান নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং চারপাশে প্যানেলের ভিতরে অপরূপ সুন্দর লিপিকলায় পবিত্র কোরানের নানা আয়াত উত্তীর্ণ করা রয়েছে। সে গলা উঁচু করে গম্বুজের ছাদে অঙ্কিত সোনালী তারকারাজিকে তাদের নিজস্ব ভূবনে বাড়াবাড়ি রকমের বিন্যস্ত অবস্থায় দেখে।
গম্বুজের সরাসরি নিচে মার্বেলের সমতল পাটাতনে একটা শবাধার দেখা যায়। শবাধারটা প্রায় ছয় ফিট লম্বা এর উপরে সবুজ জেড পাথরের মেরাপ যা এতটাই সবুজ যে প্রায় কালো বলে মনে হয় তৈমূরের উপযুক্ত সমাধিসৌধ, কিন্তু বাবর এখনও জানে না, সে কোথায় শায়িত হবে। সমাধিকক্ষের একপাশে, খিলানাকতি একটা পথ ঢালু হয়ে নেমে নিচের ভূগর্ভস্থ কক্ষে চলে গেছে। কয়েক মুহূর্ত পরে, বাবর সেখানে প্রবেশ করে। করিডোরটা এতটাই সরু যে দু’পাশের দেয়ালে তার কাঁধ ঘষা খায় যখন সে ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে- খালি পা পাথরের মসৃণ মেঝেতে পিছলে যেতে চায়- একটা অনেক ছোট কক্ষে এসে সে উপস্থিত হয়। একটা ছোট মার্বেলের তিরস্করণী পর্দা দেয়ালের উঁচুতে স্থাপিত আর সেটাতে মৌচাকের মত জাফরি কাটা নকশা কক্ষটার একমাত্র আলোর উৎস, সেখান থেকে হাল্কা আলোর ধারা এসে অলংকৃত সাদা মার্বেলের শবাধারে পড়ছে, যেখানে তৈমূরের মৃতদেহ শায়িত রয়েছে।
চীনের উদ্দেশ্যে অভিযানে যাত্রা করার পরে যখন তৈমূর অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করলে, তার অনুচরেরা গৌরবের সাথে তাকে সমরকন্দে ফিরিয়ে এনে সমাধিস্থ করার পূর্বে গোলাপজল, কর্পূর আর মৃগনাভি দিয়ে তার মরদেহ সংরক্ষিত করে। আড়ম্বরপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও, বলা হয়ে থাকে মহান এই বীর কবরে প্রথমে শান্তি পাননি। রাতের পরে রাত তার শবাধার থেকে আক্রোশপূর্ণ চিৎকার ভেসে এসে সমরকন্দের লোকদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলত। মৃত সম্রাট আপাত দৃষ্টিতে অন্তিম শয়ানে শায়িত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। এই ক্রোধান্বিত যন্ত্রণাদগ্ধ চিৎকার এক বছর স্থায়ী হলে শহরের লোকেরা মরীয়া হয়ে তৈমূরের ছেলের কাছে ধর্ণা দেয়। তার সামনে হাঁটু ভেঙে বসে তারা, তৈমূর তার যুদ্ধযাত্রার সময়ে যেসব বন্দিদের বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পে দক্ষ কারিগরদের সমরকন্দে নিয়ে এসেছিলেন এর সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে তাদের মুক্তি দিতে অনুরোধ করে। যাতে লোকগুলো তাদের নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারে। তৈমূরও তাহলে অবশেষে তার মহাপ্রয়ানের পথে রওয়ানা হতে পারবেন। প্রজাদের ভীতসন্ত্রস্ত আর বিহ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে তৈমূরের ছেলে তাদের কথা শোনেন। বন্দিদের মুক্তি দিয়ে দেশে ফিরে যাবার ব্যবস্থা করা হয় আর এরপরে তৈমূরের আর্তনাদ আর শোনা যায়নি।
নানী- দাদীর গল্প, বাবর মনে মনে ভাবে। কিন্তু আরেকটা কাহিনী আছে যা সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে বলা হয়ে থাকে তৈমূরের শবাধারের মেরাপের নিচে একটা সমাধিলিপি খোদাই করা রয়েছে: “আমি যদি আমার সমাধি থেকে উঠে আসি তাহলে পৃথিবী প্রকম্পিত হবে।”
বাবর বিনম্রচিত্তে শবাধারের দিকে এগিয়ে যায়। প্রায় ভীতচকিত ভঙ্গিতে, সে হাত বাড়ায় মেরাপটা স্পর্শ করতে যার উপরিভাগে তৈমূরের বংশ পরিচয় বয়ান করা রয়েছে। বাবর ভাবে, আমারও বংশ পরিচয়। আমার রক্ত। সে মাথা নিচু করে শীতল পাথরের গায়ে চুমু খায়। “আমি তোমার যোগ্য উত্তরসূরী হব,” সে ফিসফিস করে বলে। মহান তৈমূর আর আব্বাজানের কাছে এটা তার প্রতিশ্রুতি। তারচেয়েও বড় কথা এটা তার নিজের কাছে নিজের প্রতিশ্রুতি।
***
তৈমূরের হৃদয় প্রশান্ত করা উদ্যান, বাগ-ই-দিলকুশার কামরার মুক্তার মিহি জালের তৈরি কারুকাজ করা পর্দা ভোরের বাতাসে আলোড়িত হয় যেখানে সমরকন্দে বিজয়ীর বেশে প্রবেশের দুমাস পরে- বাবর ঘুমিয়ে রয়েছে। সমরকন্দের চারপাশের এলাকা আর তৃণভূমিতে তৈমূর যতগুলো উদ্যান নির্মাণ করেছিলেন, এটা বাবরের সবচেয়ে প্রিয়। আগের দিন সন্ধ্যাবেলা, সূর্য যখন অস্ত যেতে বসেছে, হঠাৎ খেয়ালের বশে সে ওয়াজির খান আর তার দেহরক্ষীদের তলব করে। সবুজাভ-নীল তোরণদ্বার দিয়ে তারা বের হয়ে এসে দু’মাইল লম্বা বাতাসে আন্দোলিত রাজকীয়, মার্জিত পপলার গাছে শোভিত রাজপথ ধরে এগিয়ে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। ঘোড়া ছুটিয়ে তারা যখন সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ততক্ষণে রাত নেমে এসেছে। বাবর তার ভেতরেই তৈমূরের গম্বুজযুক্ত, সমব্যবধানে স্থাপিত স্তম্ভযুক্ত গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ আর তার চারপাশের খোলামেলা ভবনের আবছা অবয়ব অন্ধকার গাছের মাঝে মুক্তার মত চমকাতে দেখে।
