সড়কের দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনগণকে সতর্ক কিন্তু মোটেই বিরূপ মনে হয় না। প্রশস্ত রেজিস্তান চত্বরে, ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় প্রবেশের সময়ে বাবর তাদের কৌতূহল অনুভব করে, যেখানে ডোরাকাটা সবুজ রেশমের চাঁদোয়ার নিচে একটা মার্বেলের মঞ্চ রয়েছে। তার প্রয়াত চাচাজানের পারিষদবর্গ আর সমরকন্দের অভিজাত ব্যক্তিরা মঞ্চের সামনে বশংবদের ন্যায় নতমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বাবর ঘোড়া থেকে সরাসরি মঞ্চের উপরে নামে এবং এর কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে বাঘের পায়াযুক্ত সোনার গিল্টি করা সিংহাসন অপেক্ষা করছে। সে যেন সহসাই তাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকা দৃষ্টি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে। আর তার ঢাউস আলখাল্লা সামলে নিয়ে তার পক্ষে যতটা সম্ভব ভারিক্কী দেখিয়ে সে সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়। সে এখনও কিশোর বয়স পুরোপুরি চৌদ্দও হয়নি। জনগণ তাদের সামনে উপবিষ্ট একটা বালকের ভিতরে কি দেখতে চায়? কিন্তু সে নিজেকে প্রবোধ দেয়, সমরকন্দ তার উত্তরাধিকার সূত্রে এবং বিজয় গৌরবে। সে তার চিবুক উঁচু করে এবং গর্বিত ভঙ্গিতে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
জমকালো সিংহাসনে আড়ষ্ঠ ভঙ্গিতে উপবিষ্ট অবস্থায়, সে তার নতুন প্রজাদের আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে এবং বিনিময়ে তাদের খেলাত প্রদান করে আর গ্রান্ড উজিরের সঞ্চিত ধনসম্পদ বিলিয়ে দেয়। লোকজন সারিবদ্ধভাবে নিজেদের তার সামনে প্রণত করে কিন্তু সে খুব ভালভাবেই জানে যে এদের কেউই তার বিশ্বাসের যোগ্য নয়। চিন্তাটা মাথায় আসতেই সে সংযত হয় আর গ্রান্ড উজিরের ক্রুদ্ধ উক্তিগুলো আবার তার মনে পড়ে যায়: “তুমি কখনও সমরকন্দ দখলে রাখতে পারবে না।”
জনগণকে সে দেখিয়ে দেবে শাসক হবার যোগ্যতা তার আছে। সে কি ইতিমধ্যে যথেষ্ট করুণা আর উদারতা প্রদর্শন করেনি? যারা তার কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছে সে তাদের সবাইকে অকাতরে ক্ষমা করেছে। গ্রান্ড উজিরের হারেমের রমণীকুল, বিজয়ের প্রথম মুহূর্তে বলাৎকারের শিকার হবার বদলে, যথাযথ সময়ে, বাবরের গোত্রপতিদের কাছে ঠাই পাবে। আর উজিরকন্যা, সে ইতিমধ্যে তাকে কুন্দুজে তার চাচাতভাই শাহজাদা মাহমুদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। সে যাবার বিষয়ে কোনো ধরণের অনীহা প্রদর্শন করেনি। বস্তুতপক্ষে, মেয়েটার বরং খুশি হওয়া উচিত। সে যে কেবল তৈমূরের সাক্ষাৎ বংশধরের এক শাহজাদার স্ত্রী হবে তাই না, এই মাহমুদই তাকে মাত্র দু’বছর আগে দস্যুদের হাতে সম্ভ্রমহানির হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। সে তার প্রেমে এতটাই মজেছিল যে তাকে পাবার জন্য সমরকন্দ পর্যন্ত অবরোধ করেছিলো।
হ্যাঁ, বাবর ভেবে দেখে, সে ভালমতই উতরে গেছে। জনগণের তাকে ভয় পাবার কোনো কারণই নেই বরং তাদের তাকে শ্রদ্ধা করা উচিত। তারপরেও, গ্রান্ড উজিরের কথা তাকে ঘুণপোকার মত কুরে কুরে খেতে থাকে…
সহসা বাবর ওয়াজির খানকে ঘোষণা করতে শোনে, “সমরকন্দের সুলতান, মির্জা বাবর, জিন্দাবাদ!” ঘোষণাটা নিমেষে সহস্র কণ্ঠে ধ্বনিত হলে পুরো প্রাঙ্গন গমগম করে আর বাবরের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়। একজন মৃত মানুষ যার কবন্ধ লাশ এখন খাঁচায় ঝুলছে তার কথার কারণে নিজেকে কষ্ট দেয়াটা বোকামী। এই অনুষ্ঠানের যখন আয়োজন করা হয় তখন ওয়াজির খানের সাথে তার যে কথা হয়েছিলো, সেই অনুসারে বাবর এই জয়ধ্বনির খেই ধরে। সে উঠে দাঁড়ায় এবং ধীরে ধীরে মঞ্চের চারপাশে সমবেত হওয়া জনগণের দিকে তাকায়, তাদের নতুন সুলতানকে এক নজর ভাল করে দেখার সুযোগ দেয়। তারপরে সে জনতার উদ্দেশ্যে বলে, “সমরকন্দের প্রতিটা মানুষ আমার শাসনকালে শান্তি আর সমৃদ্ধি লাভ করবে। আমার সদিচ্ছার স্মারক হিসাবে, শহরের বাজার থেকে এক মাস কোনো ধরণের কর আদায় করা হবে না।”
উপস্থিত জনগণ উৎফুল্ল কণ্ঠে তাদের সম্মতি জানায়। তার নিজের অভিব্যক্তি যদিও নির্বিকার থাকে, তার ভেতরটা আবারও বিজয়ানন্দে মেতে উঠে। তৈমূর যখন সমরকন্দ দখল করেন তখন তার বয়স ছিল একত্রিশ বছর, তার এখনকার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। এটাই ছিল তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিজয়, যা পরবর্তীতে একটা বিশাল সাম্রাজ্যের ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে। বাবরের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটবে।
আজ রাতে তার উদারতার আরেকটা নমুনা হিসাবে অবরোধকালীন দুর্ভোগ প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে সে সারা শহরে খাবার বিতরণ করবে। তার আর তার লোকদের জন্য ভোজের আয়োজন করা হবে, এবং এই একটা ক্ষেত্রে সে ইতিমধ্যে তৈমূরকে ম্লান করে দিয়েছে, যার পছন্দ ছিল একেবারেই অনাড়ম্বর নিরাভরণ: ঝলসানো ঘোড়ার মাংস, সিদ্ধ ভেড়া আর ফুটানো চাল। বাইরের তৃণভূমি থেকে নিরন্ন শহরে নধর ভেড়ার পাল ধরে আনা হয়েছে যা তাদের রসনা নিবৃত্ত করবে এবং ইতিমধ্যে বেচারীদের শিকে গাথা অবস্থায় আগুনে ঝলসানোও শুরু হয়ে গেছে। তিতির আর বনমোরগ, তেঁতুল আর ডালিমের রসে ডুবিয়ে ফোঁটান হচ্ছে। মধুর মত মিষ্টি রসে টইটুম্বুর করতে থাকা তরমুজ আর বেগুনী আঙ্গুরের সতেজ থোকা কারুকার্যখচিত ধাতুর ট্রেতে স্তূপাকারে রাখা। বাবরের খিদে পেয়ে যায়।
আনুষ্ঠানিকতা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে কিন্তু বিজয় উদযাপন শুরু হবার আগে। বাবরকে আরেকটা কাজ করতে হবে। সে ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে নেমে আসে এবং ঘোড়ায় উপবিষ্ট হয়। ওয়াজির খান আর তার রক্ষীদের অনুসরণের ইঙ্গিত দিয়ে, সে প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে গুর এমিরের দিকে রওয়ানা হয়। নীল টালিতে আবৃত খাঁজকাটা, ডিম্বাকৃতি গম্বুজ আর দুটো সুঠাম মিনার যেখানে তৈমূরকে চিরশয্যায় শায়িত করা হয়েছে।
