“বেশ, উজির দেখা যাচ্ছে আপনার মেয়ে আপনার দেহরক্ষীদের চেয়ে সাহসী আর অনেক বেশি বিশ্বস্ত। এমন সম্মান পাবার যোগ্য আপনি নন।” বাবর বুঝতে পারে সবার সামনে মেয়েটাকে তার বাবা এভাবে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে অপমান করায় সে নিজেই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে।
“সমরকন্দের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবার কোনো অধিকার তোমার নেই।” গ্রান্ড উজির নিজেকে টেনে তুলে বসার আসনে নিয়ে আসেন এবং বাবরের দিকে গুটিবসন্তে ক্ষতবিক্ষত, চওড়া-চোয়াল বিশিষ্ট মুখে অশুভ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তাকিয়ে থাকেন, আসন্ন মৃত্যুর সম্ভাবনা সম্পর্কে তাকে আপাতদৃষ্টিতে নিরুদ্বিগ্ন দেখায়। “আমার ধমনীতে তৈমূরের রক্ত বইছে, শেষ সুলতানের আমি ভাস্তে। আমার চেয়ে আর কার দাবি জোরাল?”
গ্রান্ড উজির তার রক্তজবার মত চোখ কুচকে তাকায়। “তুমি হয়ত ভাবছে সমরকন্দ দখল করেছে, কিন্তু জেনে রাখো তুমি কখনও এটা নিজের অধিকারে রাখতে পারবে না, সে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে। “পাহাড়ী জঞ্জাল, কথাটা চিন্তা করে দেখো। ফারগানায় নিজেদের নোংরা ভেড়ার পালের কাছে ফিরে যাও। সম্ভবত তাদের ভিতরেই তুমি নিজের যোগ্য স্ত্রী খুঁজে পাবে- আমি শুনেছি তোমরা বিশেষ কোন…”।
“অনেক হয়েছে!” বাবর কাঁপতে থাকে যা সে বুঝতে পারে বয়ঃসন্ধিক্ষণের উত্তেজনা, কিন্তু আশা করে তার লোকেরা যেন সেটাকে রাজকীয় ক্রোধ বলে মনে করে। “বাইসানগার,” সে নাটকীয় ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠে।
সেনা অধিপতি তার দিকে এগিয়ে আসে। “সুলতান?”
“অন্যায়ভাবে সিংহাসন অধিকার করা ছাড়াও শেষ সুলতানের শেষ আদেশ পালন করার জন্য এই লোকটা তোমার সাথে নির্মম জুলুম করেছে।” বাবর লক্ষ্য করে বাইসানগার তার ডান হাত যেখানে থাকবার কথা ছিল সেদিকে চকিতে তাকায়। “পরবর্তী জীবনের পাওনা বুঝে নেবার জন্য এই পাপীকে সেখানে পাঠাবার ভার তোমাকে দেয়া হল। নিচের প্রাঙ্গণে তার ভবলীলা সাঙ্গ করবে এবং তার কন্যার সাহসিকতার জন্য খেয়াল রাখবে পুরো ব্যাপারটা যেন দ্রুত নিষ্পন্ন হয়। তারপরে তার দেহটা সবুজাভ-নীল তোরণদ্বার থেকে শিকল দিয়ে ঝুলিয়ে দেবে, যেন লোকেরা দেখতে পায় যে লোকটার উচ্চাশা আর ধনলিপ্সা তাদের অভাব আর কষ্টে ফেলেছিল তাকে আমি কিভাবে সাজা দিয়েছি। তার দেহরক্ষীর দল যদি আমাকে তাদের সুলতান হিসাবে মেনে নিয়ে আনুগত্যের শপথ নেয় তবে তারা প্রাণে বেঁচে যাবে।”
বাইসানগারের লোকেরা উজিরকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে, সহসা ক্লান্তি এসে বাবরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এক মুহূর্তের জন্য সে চোখ বন্ধ করে এবং রেশমী কোমল গালিচাটা স্পর্শ করার জন্য ঝুঁকে যা আগামীকাল গুটিয়ে নিয়ে তার মায়ের কাছে উপহার হিসাবে পাঠাবার আদেশ দেবে বলে ঠিক করেছে। “সমরকন্দ,” সে নিজেকে ফিসফিস করে শোনায়। “এখন আমার।”
১.৬ একশ দিবসের রাজত্বকাল
০৬. একশ দিবসের রাজত্বকাল
নীল, সবুজ আর সোনালী টালির উজ্জ্বলতায় সূর্যের আলো ঠিকরে যেতে সবুজাভ নীল তোরণদ্বার ঝিকমিক করতে থাকে। সমরকন্দে আনুষ্ঠানিক প্রবেশের উদ্দেশ্যে তোরণদ্বারের দিকে এগিয়ে যাবার সময়ে বাবরের মনে হয় সে বুঝি সূর্যের কেন্দ্রে ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে চলেছে। মৃদু বাতাসে তার পরণের রেশমের সবুজ আলখাল্লা চারপাশে আন্দোলিত হতে থাকে। ক্রুদ্ধ গর্জনরত বাঘের প্রতিকৃতি খচিত তৈমূরের সোনার আংটি তার আঙ্গুলে জ্বলজ্বল করছে, এবং আকাটা পান্নার তৈরি গলার হার তার নিঃশ্বাসের সাথে বুকের উপরে উঠছে আর নামছে। সহস্র চোখ তাকে খুটিয়ে দেখছে, সে বিষয়ে সচেতন। বাবর জোর করে চোখেমুখে একটা কঠোর অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলে, যদিও তার ইচ্ছে করে মাথাটা পেছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে বুকের সবটুকু বাতাস বের করে দিয়ে চিৎকার করে উঠে।
অধীনস্ত গোত্রপতি আর সেনাপতিরা তার ঠিক পেছনেই ঘোড়ার চড়ে তাকে অনুসরণ করছে। ফারগানা থেকে তাদের সাথে আগত উপজাতি চাষাভূষোদের দিয়ে গত দুদিনে ওয়াজির খান একটা চলনসই সেনাবাহিনী দাঁড় করিয়েছেন যারা। শহরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে সবাই ঈর্ষান্বিত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। কোক-সরাইয়ের বন্ধ প্রকোষ্ঠগুলোতে যথেষ্ট পোশাক পরিচ্ছদ তারা খুঁজে পেয়েছিল যা দিয়ে তার শিরস্ত্রাণ আর কেবল বর্ম পরিহিত রুক্ষ, যাযাবর যোদ্ধার দলকে, নিজের লোকদের কষ্টে রেখে গ্রান্ড উজিরের জমিয়ে রাখা উজ্জ্বল রেশমের পোশাকে সজ্জিত করা হয়েছে।
বাবর মনে মনে শপথ নেয়, এই মহান শহরের সমৃদ্ধি সে আবার ফিরিয়ে আনবে, তূর্যধ্বনি আর টানটান চামড়া দিয়ে বাঁধান রণদামামার গুরুগম্ভীর প্রতিধ্বনির মাঝে, সে যে তোরণদ্বার দিয়ে শহরে প্রবেশ করে তার চূড়ো থেকে উজিরের কবন্ধ দেহ। লোহার খাঁচায় ঝুলছে। সূর্যের তাপে যা ইতিমধ্যেই কালো হতে শুরু করেছে। সে সামনের দিকে এগিয়ে গেলে শহরের নীল গম্বুজ আর মিনার দেখতে পায়। শীঘ্রই সে একটা বিশাল বাজারের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যায়, যার দুপাশে ভ্রাম্যমাণ বণিকদের আশ্রয় দেয়ার জন্য নির্মিত হয়েছে সারি সারি সরাইখানা। তার মরহুম আব্বাজান প্রায়ই তৈমূরের সময়ের প্রাচুর্যময় কাফেলার কথা বলতেন- হেলেদুলে নাক ঝাড়তে ঝাড়তে এগিয়ে যাওয়া উটের সারিবদ্ধ দল আর ক্ষিপ্রগামী খচ্চরের বহর যারা পশ্চিম থেকে পশম, চামড়া আর মসৃণ কাপড়, পূর্ব থেকে নিয়ে আসত চিনামাটির বাসনকোসন, সোনা রূপার কারুকাজ করা রেশমী বস্ত্র আর তীব্র গন্ধযুক্ত কস্তুরি, এবং সিন্ধু নদী অতিক্রম করে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে সুগন্ধি জায়ফল, লবঙ্গ, দারুচিনি আর উজ্জ্বল রত্নপাথর নিয়ে আসত।
