তার লোকদের চুপ করে থাকার ইঙ্গিত দিয়ে, বাবর দরজার ফোকরের দিকে এগিয়ে যায়, সে আবার পণ করেছে প্রথমে সেই ভিতরে প্রবেশ করবে। “না। সুলতান।” নিষেধাজ্ঞা জ্ঞাপন করা ওয়াজির খানের হাত তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। “প্রথমে আমাকে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দেন।”
বাবর ভাবে, আমি তার কাছে ঋণী। হতাশা লুকিয়ে রেখে সে ওয়াজির খান আর তার দু’জন যোদ্ধাকে অস্ত্র হাতে সতর্কতার সাথে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে। কিছুক্ষণ পরেই সে শুনতে পায় ওয়াজির খান বলছে, “সুলতান, আপনি এবার ভিতরে আসতে পারেন।”
বাবর দরজার ফোকড় গলে ভেতরে প্রবেশ করে নরম রেশমের গালিচায় পা রাখে। এমন কোমলতা সে জীবনেও অনুভব করেনি। তাদের ফারগানা গালিচাগুলোকে এর তুলনায় জীর্ণ কম্বল মনে হয়।
ওয়াজির খান ইশারায় তাকে সতর্ক থাকতে বলে। তার বাকি লোকেরা পেছন থেকে চাপ প্রয়োগ করতে, বাবর সামনে এগিয়ে যায়, বিশাল কক্ষের প্রতিটা আনাচে কানাচে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়, যেকোন আক্রমণ প্রতিহত করতে প্রস্তুত। কাঁচ লাগান কুলুঙ্গিতে প্রজ্জ্বলিত শত শত মোমবাতির আলোতে কক্ষটা আলোকিত। স্বচ্ছ হলুদাভ আলো দেয়ালে ঝোলান হাতে বোনা পর্দায় ফুটিয়ে তোলা টিউলিপ, সোলোমী আর সমরকন্দের অন্যান্য ফুল, এবং চকচকে স্যাটিন বা মখমলের পুরু তাকিয়ার উপরে খেলা করছে। অপেক্ষাকৃত ছোট ছয়টা রূপার দরজা একেকপাশে। তিনটা করে, বাবর অনুমান করে সেগুলোর পেছনে মেয়েদের ব্যক্তিগত কামরা রয়েছে। ঠিক নাক বরাবর সামনে আরেকটা দরজা, এটা সোনার পাত দিয়ে মোড়ান। আর তার উপরে সমরকন্দের বাঘের প্রতিরূপ খোদাই করা রয়েছে।
তার লোকেরা আবারও তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে টের পেয়ে, বাবর কেশে উঠে গলা পরিষ্কার করে। “উজির!” সোনায় মোড়ান দরজার দিকে লক্ষ্য করে সে বলে, তার কণ্ঠস্বর হতে পারে এখনও পুরুষালী হয়নি কিন্তু পরিষ্কার এবং দৃঢ়। “আপনি নিজেকে বাঁচাতে পারবেন না, কিন্তু নিজের মৃত্যু দ্রুত আর সম্মানজনক করতে পারেন।” দরজার পেছনে একটা মৃদু নড়াচড়ার শব্দ মনে হয় সে শুনতে পায় কিন্তু তারপরেই আবার সব আগের মত নিরব হয়ে যায়। “উজির, আপনার কি লজ্জা বা সম্মানবোধ বলে কিছু নেই?” বাবর অনড় ভঙ্গিতে বলে।
এইবার নিশ্চিতভাবেই একটা ধ্বস্তাধ্বস্তির আওয়াজ আর ক্রুদ্ধ কণ্ঠের চিৎকার শোনা যায়। সহসা সোনালী দরজাটা খুলে যেতে সেখানে গ্রান্ড উজিরের দু’জন দেহরক্ষীকে দেখা যায়, একজনের গালে আড়াআড়ি একটা তরবারির আঘাতের চিহ্ন। তাদের প্রতিবাদ করতে থাকা প্রভুর হাত ধরে টেনে আনছে, তার উজ্জ্বল সবুজ রঙের জরির কাজ করা আলখাল্লা পেছনে ঢেউয়ের মত দুলছে। কোনো রকমের ভণিতা না করে তারা গ্রান্ড উজিরকে বাবরের পায়ের কাছে ছুঁড়ে দেয়, তারপরে নিজেরা তার সামনে বশ্যতা স্বীকারের ভঙ্গিতে নতজানু হয়। অন্য দেহরক্ষীরা, অনিশ্চিত ভঙ্গিতে নিজেদের প্রণত করে। ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে বাবর পুরো নাটকটা দেখে। “বাইসানগার সবাইকে নিরস্ত্র কর।”
বাইসানগারের লোকেরা দ্রুত আদেশ পালন শুরু করতে, মলিন নীল রঙের রেশমের পোশাক পরিহিত এক কিশোরী সোনালী দরজা দিয়ে ছুটে বের হয়ে এসে, বাইসানগারের লোকদের নাগাল এড়িয়ে সোজা গ্রান্ড উজিরের দিকে ছুটে যায়। তার পাশে হাঁটু ভেঙে বসে বেচারী তাকে জড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করে কিন্তু একটা প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সে তার তন্বী দেহটা এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দেয়। মেয়েটা সুস্থির হয়ে সরাসরি বাবরের চোখের দিকে তাকায়। সে দেখে একটা ডিম্বাকৃতি মুখ এবং চোখ যা কান্নায় ভরাক্রান্ত হলেও সুন্দর। “আমার বাবাকে ছেড়ে দাও। তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষ।” ভয়হীন কণ্ঠে মেয়েটা কথাগুলো বলে, যদিও রণ ক্লান্ত একদল যোদ্ধার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যাদের কাছ থেকে সে নিশ্চয়ই জানে যে সে সামান্যই সহানুভূতি বা করুণা প্রত্যাশা করতে পারে।
“তার বাঁচার কোনো অধিকার নেই। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার যোগ্যতার সীমা ছাড়িয়েছে।” বাবর কাঠখোট্টাভাবে উত্তর দেয়। “অন্য মেয়েরা কোথায়?”
মেয়েটা প্রথমে ইতস্তত করে তারপরে বলে, “সবাই নিজ নিজ কামরায় রয়েছে।” সে ছয়টা ছোট দরজা ইশারায় দেখায়। বাবর ওয়াজির খানের উদ্দেশ্যে মাথা নাড়ে। “সবগুলো তল্লাশি করেন। কোনো সৈন্য যেন সেখানে লুকিয়ে না থাকতে পারে। তারপরে মেয়েদের সেখানেই আটকে রাখেন আমরা যতক্ষণ তাদের দিকে মনোযোগ দেবার সময় না পাই।” ওয়াজির খান দ্রুত তার লোকদের দরজা ভাঙার নির্দেশ দেয়। প্রায় সাথে সাথে বাবর হারেমের ভেতর থেকে প্রতিবাদ আর বিলাপের সুর ভেসে আসতে শুনে। কিন্তু সে জানে তার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে। মেয়েদের ভয় পাওয়া থেকে সে তাদের বিরত রাখতে পারবে না, কিন্তু তাদের কেউ অপমানও করবে না।
উজিরের কন্যা এখন তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে রয়েছে, তার বাদামী চোখে গর্বিত অভিব্যক্তি। সে তার অভিযুক্ত চাহনী থেকে ঘুরে দাঁড়ায়। “তাকে ব্যক্তিগত কামরায় নিয়ে যাও এবং তালাবন্ধ করে রাখো।” উজিরকে ছেড়ে দেবার কোনো অভিপ্রায় তার নেই। কিন্তু বুঝতে মেয়েটাকে তার বাবার মৃত্যুদণ্ড দেখা থেকে সে বিরত রাখতে চাইতে। মেয়েটাকে কেউ ধরার আগেই, সে নিজে থেকেই উঠে দাঁড়ায় এবং পেলব গলার উপরে গর্বিত মাথা উঁচু করে রেখে একটা দরজা দিয়ে ঢুকে ভেতরে হারিয়ে যায়, যাবার সময়ে কোনো অনুরোধ বা ঘাড় ঘুরিয়ে একবারও ফিরে তাকায় না। বাবর পেছন থেকে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, কল্পনা করে এমন সম্মান প্রদর্শন করতে তাকে কি মূল্য দিতে হয়েছে।
