গ্রান্ড উজিরের লোকেরা সিঁড়ির নিচে থেকে উঠে আসা আক্রমণের চাপ সামলাতে না। পেরে পিছু হটতে শুরু করে। শীঘ্রই তাদের আরও পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়। সহসা তাদের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং হেরে যাওয়া যুদ্ধে প্রাণ না দেয়া আর পালাবার প্রবণতা জোরালো হতে তারা সিঁড়ি ভেঙে পালাতে আরম্ভ করে। বাবরের লোকেরা এবার দো-তলার সিঁড়ি বেয়ে পলায়মান অবয়বগুলোকে কোপাতে কোপাতে এগিয়ে। যায় এবং তৃতীয় তলার কিছুটা পর্যন্ত দাবড়ে দেয়।
তাড়াহুড়োয়, বাবর একটা অসমান ধাপে পিছলে যায় এবং কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ে। তার আগুয়ান লোকদের একজন ঠিক পিছনেই ছিল, যে নিজেকে সামলাতে না পেরে বাবরের গায়ে হোঁচট খায় এবং তার পেলব পিঠের উপর পা দিয়ে মাড়িয়ে গেলে আরও একবার বাবরের বুক থেকে সব বাতাস বের হয়ে যায়। লড়াই তৃতীয় তলায় স্থানান্তরিত হতে বাবর চোখমুখ কুঁচকে কোনো মতে উঠে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণের জন্য তার বমি বমি পায় এবং চোখে ঝাপসা দেখে। দেয়ালে হাত দিয়ে সে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে এবং জোরে শ্বাস নিতে গেলে কালশিটে পরা পাঁজর আর পেটের টান খাওয়া মাংসপেশী ব্যাথায় প্রতিবাদ জানায়।
“সুলতান।” ওয়াজির খান সিঁড়ি ভেঙে তার দিকে ছুটে আসে। “আপনি কি জখম হয়েছেন?”
বাবর মাথা নাড়ে। “না, আমি ঠিক আছি।”
“গ্রান্ড উজিরের অবশিষ্ট সৈন্যরা যারা আমাদের হাত থেকে পালিয়ে বেঁচেছে- এই ভবনের ছাদে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা প্রায় জয় লাভ করেছি।” ওয়াজির খানের মুখে দুর্লভ একটা হাসি ফুটে উঠে এবং সে বাবরের কাঁধ স্পর্শ করে। “আসুন।”
ঠিক সেই মুহূর্তে নিচে থেকে একটা গোলমালের শব্দ ভেসে আসে এবং পাথরের সিঁড়িতে দুদ্দাড় শব্দে অনেকগুলো পা তাদের দিকে ছুটে আসে। বাবর ঝটিতে ঘুরে দাঁড়ায় নতুন দুর্দৈব মোকাবেলা করতে। সিঁড়ির অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসা ছায়াগুলোকে সে চিনতে পারে, তারই লোক, একেবারে সামনে রয়েছে আলি মজিদ বেগ ফারগানার পশ্চিম থেকে আগত পেশল দেহের গোত্রপতি, যাকে সে আর ওয়াজির খান সুড়ঙ্গ পথে আগত লোকদের নেতা হিসাবে মনোনীত করেছে।
“সুলতান, দূর্গ আর নগর প্রাসাদ আমাদের দখলে- সেই সাথে পুরো শহর।” আলি মজিদ বেগকে বিধ্বস্ত দেখায়, কিন্তু ঘাম আর রক্তের নিচে তার পটল-চেরা চোখে বিজয়োল্লাস চিকচিক করে।
“তোমরা দারুণ যুদ্ধ করেছে।”
“সুলতান।” আলি মজিদ বেগ যদিও এখনও হাঁপাচ্ছে, নিজের আর অধীনস্থ লোকদের সাফল্যে তার কণ্ঠে গর্ব উথলে উঠে।
“তোমরা কি গ্রান্ড উজিরকে কোথাও দেখেছো?”
আক্ষেপের সাথে আলি মজিদ বেগ মাথা নাড়ে।
“তাহলে বাইসানগার যা ভেবেছে সেটাই ঠিক। এখানেই কোক সরাইয়ে রক্ষিতাদের আঁচলের তলায় গিয়ে ব্যাটা লুকিয়েছে, যদি না কোনক্রমে শহর ছেড়ে পালিয়ে না যায়।”
“সুলতান, সে পালিয়ে যাবে কোথায়? কে তাকে আশ্রয় দেবে?” ওয়াজির খান প্রশ্নের ভঙ্গিতে বলে।
ওয়াজির খানকে পাশে নিয়ে বাবর সিঁড়ির বাকি ধাপগুলো অতিক্রম করে কোক সরাইয়ের উপরের তলায় উঠে আসে। সিঁড়ি যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক তার উল্টো দিকে, তার উৎফুল্ল যোদ্ধাদের মাঝ দিয়ে সে রূপার উপরে সবুজাভ-নীল মিনে আর পাথরের কারুকাজ করা একজোড়া দরজা দেখতে পায়।
“জেনানা মহল?” বাবর জানতে চায়।
বাইসানগার সম্মতি প্রকাশ করে মাথা নাড়ে।
মানস চোখে, বাবর সহসা নিজের বোন খানজাদার ভয়ার্ত চোখ দেখতে পায়। সে কেমন অনুভব করতো, যদি তার বোন এমন একটা দরজার পেছনে, বিজয়োল্লাসে উন্মাদ যোদ্ধাদের হাত থেকে। অসহায় ভাবে লুকিয়ে থাকতো? সে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের দিকে ঘুরে তাকায়। “মেয়েদের যেন কেউ অপমান না করে। আমি সমরকন্দ এসেছি এর নতুন সুলতান হিসাবে, রাতের আঁধারে আসা কোনো হন্তারক আমি নই।”
সে তার লোকদের অনেকের ভেতরে তাদের আবেগতাড়িত মুখে আশাহতের বেদনা দেখতে পায়। তারা সম্ভবত বিশ্বাস করে যে, সে এমন কথা বলতে পেরেছে কারণ সে একজন লোকের চাহিদা আর হতাশা সম্পর্কে অসম্পূর্ণ ধারণাযুক্ত এক কিশোর। যাকগে তাদের যা ইচ্ছা তারা ভাবতে পারে। আড়চোখে ওয়াজির খানের দিকে তাকালে সে তার সেনাপতির মুখে প্রসন্নতা দেখে বুঝতে আরও একটা পরীক্ষায় সে উতরে গিয়েছে।
নিচের আঙ্গিনা থেকে নিয়ে আসা মাথায় লোহার পাতযুক্ত দেয়াল চূর্ণকারী দুরমুশের আঘাতে রূপার দরজা কেঁপে উঠে এবং সবুজাভ-নীল পাথরের উজ্জ্বল টুকরো খোলামকুচির মত ছিটকে মাটিতে পড়ে। কিন্তু দরজাটা তারপরেও অনড় দাঁড়িয়ে থাকে। চকচকে রূপার পাতের নিচের কাঠ নিশ্চয়ই সেরকম মজবুত আর হুড়কাও দৃঢ়। তার লোকেরা চতুর্থবারের মত দুরমুশটা দিয়ে দরজায় ধাক্কা দেবার সময় বাবর মনে মনে ভাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দরজার রূপার আস্তরণ ফেটে বেঁকে যায় এবং নিচের কাঠ গুঁড়িয়ে যায়। দু’জন যোদ্ধা তাদের রণকুঠার দিয়ে একজন মানুষ প্রবেশের মত একটা বড় ফোকড় তৈরি করে।
বাবর আর তার লোকেরা কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে, অস্ত্রের ধার পরীক্ষা করে। সে নিশ্চিত যে কোনো মুহূর্তে হারেম রক্ষা করতে এগিয়ে আসা যোদ্ধার হুঙ্কার তারা শুনতে পাবে কিংবা ভেতর থেকে নিক্ষিপ্ত তীরের কারণে বাধ্য হবে ফাঁকা স্থানটা থেকে সরে দাঁড়াতে। তার বদলে কেবল নিরবতাই বিরাজ করে। আর চন্দনকাঠের ভারী মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে যা তাকে শেষবার মায়ের কাছে বসে থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। গন্ধটা তাদের চারপাশে ঘুরপাক খায়, ঘামের সাথে মিশে একটা আলাদা গন্ধের জন্ম দেয়।
