“আসুন।” বাইসানগার তার পাশে দাঁড়িয়ে। তার কাঁধের একটা গভীর ক্ষত থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে আর মুখটা ব্যাথায় শক্ত হয়ে আছে। কিন্তু সেসব পাত্তা না দিয়ে সে কয়েকশ ফিট দূরে কোক সরাইয়ের আবছা অবয়বের দিকে বারবার ইঙ্গিত করে। “গ্রান্ড উজির ওখানেই লুকিয়ে রয়েছে- আমি যদি তাকে ঠিক চিনে থাকি তাহলে ব্যাটা গিয়ে জেনানা মহলে আশ্রয় নেবে।”
নিজের লোকদের অনুসরণ করতে বলে, বাবর হোঁচট খেতে খেতে বাইসানগারে পিছু নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়, যা দেয়াল থেকে নিচের আঙ্গিনায় নেমে গিয়েছে। পড়ে থাকা লাশ আর আধা পিচ্ছিল জমাট রক্তের উপর দিয়ে কোনমতে টপকে যাবার সময়ে একটা মুখের উপরে তার দৃষ্টি আটকে যায়। মুখটা সম্ভবত তারই বয়সী আরেক কিশোর যোদ্ধার। রক্তশূন্য, মৃত্যুযন্ত্রণার নিরব চিৎকারে তার ঠোঁট পেছনে বেঁকে গিয়ে মাড়ি বের হয়ে আছে এবং তার চোখের লম্বা পাপড়ির নিচে বিশাল কালো চোখে দৃষ্টির মায়া মিলিয়ে গিয়ে ফুটে আছে মৃত্যুর বিভীষিকা। বাবর কেঁপে উঠে এবং দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নেয়। ওয়াজির খান তাকে হুঁশিয়ার করে চিৎকার করে না উঠলে তারও একই ভাগ্য বরণ করতে হতো।
বাবর আর ওয়াজির খান এবং তাদের লোকেরা বাইসানগারকে প্রাঙ্গনের উপর দিয়ে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলে দূর্গ আস্তানাকে নিরব আর শান্ত দেখায়। দেয়ালের উপরে একচোট লড়াইয়ের পরে তাদের আর নিরবে এগিয়ে যাবার কোনো মানে হয় না- দূর্গ আস্তানায় তাদের উপস্থিতি এখন আর গোপন নেই। কিন্তু বাবরের লোকদের অনেকেই গরু আর ভেড়া-চোর হবার কারণে তারা নিরবে আর গোপনে এগিয়ে যায়। গ্রান্ড উজিরের বাকী দেহরক্ষী এবং সৈন্যরা সব কোথায়? বাবর আশঙ্কা করে যে কোনো সময়ে তীরের একটা ঝাপটা ধেয়ে আসতে পারে, কিন্তু সে রকম কিছুই ঘটে না।
চার-তলা কোক সরাইয়ের কাছে গোপনে পৌঁছালে তারা সেটাকে রহস্যজনকভাবে নিরব দেখতে পায়, ড্রাগনের হাতল যুক্ত পিতলের চকচকে দরজাগুলো খোলা এবং অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। তৈমূরের কিংবদন্তির দূর্গ। এমন চমৎকার একটা কিছু নির্মাণের জন্য না জানি আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন। দূর্গের প্রতিটা পাথর থেকে শক্তি আর ক্ষমতা যেন ঠিকরে পড়ছে। বাবরের তার মরহুম আব্বাজানের বলা অশুভ গল্পগুলো মনে পড়ে। “তৈমূরের সব সন্তান যারা বিদ্রোহ করেছে এবং সিংহাসনে বসেছে সবাই সেখানেই বসেছে। সিংহাসনের মোহে পড়ে যারা নিজের প্রাণ হারিয়েছে সবাই সেখানেই প্রাণ দিয়েছে। বলা হয় তারা তাদের শাহজাদাকে কোক সরাইয়ে নিয়ে গিয়েছে’ কথাটার মানে সেই শাহজাদা ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে।”
ওয়াজির খান আর বাইসানগার নিজেদের ভিতরে আলাপ করে। ভিতরে প্রবেশের জন্য অধীর বাবর তাদের সাথে এসে যোগ দেয়। “সুলতান, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে,” বাবরের ভিতরের অস্থিরতা লক্ষ্য করে ওয়াজির খান দ্রুত কথাটা বলে। “পুরো ব্যাপারটা একটা ফাঁদও হতে পারে।” বাবর মাথা নাড়ে। সে ঠিকই বলেছে। কেবল অসতর্ক আহাম্মকই হুড়মুড় করে ভেতরে প্রবেশের মত ভুল করবে। বন্ধ তোরণদ্বারের কাছে তাড়াহুড়োর কারণে প্রায় মরতে বসার ঘটনা স্মরণ করে বাবর অনেক কষ্টে নিজের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করে। তারপরেও ওয়াজির খান যখন তার ছয়জন লোককে দেয়ালে প্রজ্জ্বলিত মশাল খুলে নিয়ে সতর্কতার সাথে তাদের ভিতরে প্রবেশ করে দেখতে বলে যে কোনো ধরণের ফাঁদ পাতা আছে কিনা, বাবরকে তখনও অস্থিরভাবে উসখুশ করতে দেখা যায়।
বাবরের কাছে যা কয়েক যুগের মত মনে হয়, বস্তুত পক্ষে, কয়েক মিনিট পরে, লোকগুলো বাইরে এসে জানায় যে আপাত দৃষ্টিতে সবই ঠিক আছে। বাবরের হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠে এবং সে ভিতরে প্রবেশ করে, তার লোকেরা জোটবদ্ধ ভঙ্গিতে তাকে অনুসরণ করে। পিতলের দরজা অতিক্রম করে তারা একটা উঁচু খিলানাকৃতি ছাদের প্রবেশ কক্ষ দেখতে পায় এবং তারপরেই ঠিক সামনে রয়েছে চওড়া নিচু সিঁড়ির ধাপ। ধীরে, সতর্কতার সাথে দপদপ করতে থাকা মশালের আলোয় তারা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করে, সামনের অন্ধকারের দিকে সবাই চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে। ত্রিশ ধাপ ওঠার পরে তারা দ্বিতীয় তলায় এসে পৌঁছে। সামনে সিঁড়ির আরেকটা ধাপ দেখা যায়। বাবর প্রথম ধাপে ইতিমধ্যে পা রেখেছে এমন সময় সে একটা চিৎকার শুনতে পায়।
“সুলতান, নেমে আসুন, শীঘ্রই নেমে আসুন!” বাবর ঝুঁকে পড়তে সামনের অন্ধকার। থেকে ছুঁড়ে মারা একটা বর্শা তার মাথার উপর দিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে চলে যায়, এতটাই কাছ দিয়ে যে তার ঘাড়ের চুল দাঁড়িয়ে পড়ে। নিমেষ পরেই, গ্রান্ড উজিরের দুই ডজন দেহরক্ষীর আরেকটা দল সিঁড়ি বেয়ে তাদের দিকে ধেয়ে আসে। পরের মুহূর্তে বাবর পাগলের মত ডানে বামে মোচড় খেয়ে তরবারি চালাতে শুরু করে। বিভ্রান্তির মাঝে তার তরবারির চেয়ে এখন খঞ্জরই বেশি কাজে আসে। সে শত্রুর ঢালের নিচে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে তার খঞ্জরের ফলাটা উপরের দিকে করে কোপ বসিয়ে দেয়, সে জায়গামত আঘাত করতে পারলে হাতে আর কব্জিতে উষ্ণ রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছে টের পায়। তার লোকেরা তাকে চারপাশে থেকে ঘিরে রেখেছে, হুঙ্কার দিয়ে এবং ঘোঁতঘোঁত শব্দ করতে করতে পুরো দলটা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
