“বুড়ো খোকা তোমার বাসায় থাকা উচিত ছিল, আগুনের পাশে বসে থেকে তোমার ভেজা পাজামা বদলে দেয়ার জন্য পরিচারককে ডাকতে।”
এক মুহূর্তের জন্য উদ্ধত যোদ্ধাটা হতবাক হয়ে যায় কিন্তু তারপরে বাবর কি বলছে সেটা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরে তার অভিব্যক্তি ক্রোধে ফেটে পড়ে। সে তার চর্মসদৃশ শক্ত হাতে বর্শাটা ধরে বাবরের দিকে এগিয়ে আসে। “পুঁচকে ইঁদুরের ছানা, আমি যদি তোমাকে পিষে না দিয়েছি।”এত দ্রুত সবকিছু ঘটে যে বাবর কোনো প্রতিরোধই করতে পারে না, সে বর্শার মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে ভোঁতা দিকটা বাবরের পেটে বেমক্কা একটা গুতো দেয়।
বাবর টের পায় ধাক্কার চোটে তার পা ভারসাম্য হারিয়েছে আর সে পিছনে ছিটকে পড়েছে। ডুবন্ত মানুষের মত সে হাত নাড়ে, ভয় পায় যে আঘাতের প্রাবল্য তাকে দেয়ালের নিচে ছিটকে ফেলবে। কিন্তু সে টের পায় তার মাথা পেছন দিকে হেচকা টানে নিচু প্যারাপেটের গায়ে বুকে যায়। ক্ষণিকের জন্য তার চারপাশের জগত আলোর ফুলঝুরিতে ভরে উঠে, খানিক আগে নহরের ধারে আগাছার আড়াল থেকে যে বিশুদ্ধ রূপালি নক্ষত্রের দীপ্তির দিকে তাকিয়ে ছিল, সে রকম না অনেকটা উজ্জ্বল এবড়োথেবড়ো আকৃতির একটা জটলা মত যা পিচ্ছিল রক্তের মত লালে জারিত। তার মুখ লবণাক্ত পানিতে ভরে উঠতে সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে সেটা উগরে দেয়। তারপরেও সে ঠিকমত শ্বাস নিতে পারে না- আঘাতটা তার বুকের সব বাতাস বের করে দিয়েছে।
দাড়িঅলা লোকটা তার দিকে আবার ধেয়ে আসে। “খোকা ওটা কেবল শুরু ছিল। ঐ বিদ্রুপের কারণে মারা যাবার আগে তোমার কপালে আরো ভোগান্তি আছে, সে থুতু ফেলে এবং একই সাথে বর্শাটা দিয়ে বাবরের নিতম্বে খোঁচা দিতে চায়। একেবারে সময়মত বাবর গড়িয়ে পাশে সরে গিয়ে আঘাতটা এড়ায় এবং বর্শার ফলা পাথরের মেঝেতে ধাক্কা খেয়ে আগুনের ফুলকি ছোটায়। তার প্রতিপক্ষ গালবকে। দশাসই ওজন হওয়া সত্ত্বেও বিস্ময়করভাবে লোকটার চলাফেরা অনেক দ্রুত। বিশাল ভালুকের মত সে বাবরের দিকে স্থির প্রতিজ্ঞ ভঙ্গিতে ধেয়ে আসে, সে অর্ধেক ঝুঁকে এক হাতে প্রচণ্ড ব্যাথা করতে থাকা পেট আঁকড়ে ধরে দম ফিরে পেতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু অন্য হাতে ঠিকই তরবারিটা ধরা রয়েছে। তার নিঃশ্বাস সবে আগের চেয়ে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এবং সে মাত্র সুস্থির বোধ করতে শুরু করেছে।
“তা ইঁদুরের ছানা- শীঘ্রই তুমি তোমার দলের বাকি ধাড়ি ইঁদুরগুলোর সাথে নিচের গোবরের গাদায় গড়াগড়ি খাবে,” লোকটা কথা বলার ফাঁকে বর্শার ফলার তীক্ষ্ণ দিকটা সরাসরি বাবরের মুখের দিকে নিশানা করে। বাবর হীরক দ্যুতিময় শীতল আভাযুক্ত ফলার দিকে সম্মোহিতের ন্যায় তাকিয়ে থাকে। এক মুহূর্তের জন্য তার নিজেকে পক্ষাঘাতগ্রস্থ মনে হয় কোনো ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখাতে অক্ষম, কিন্তু দানবটা তার দিকে বর্শার ফলা দিয়ে আঘাত করেছে, সহজাত প্রবৃত্তির বলে সে ঠিকই বুঝতে পারে তার কি করতে হবে। নিজের সবটুকু ক্ষিপ্রতা আর গতি জড়ো করে সে মাটিতে শুয়ে পড়ে এবং তার আততায়ীর নাগালের কাছ থেকে সরে গিয়ে আগুয়ান বর্শার নিচে দিয়ে তার দিকে গড়িয়ে আসে। তার দেহ দানবটার পায়ে এসে ধাক্কা খেতে সে তার লম্বা ফলাযুক্ত খঞ্জর দিয়ে বদমায়েশটার একটা পায়ের হাঁটুর পেছনের মাংসপেশী দ্বিখণ্ডিত করে দেয়। একটা বিকট আর্তনাদ করে, তার প্রতিপক্ষ একপাশে কাত হয়ে পড়ে যায় এবং পায়ের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়। বাবর টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ায় এবং আবার আঘাত করে। এবার সে লোকটার বাম বোগলের নিচে পাজর লক্ষ্য করে আঘাত করে যা তার বর্ম আবৃত করে রাখেনি। সে অনুভব করে তার খঞ্জরের ফলা মাংসপেশী আর মোটা কার্টিলেজ ভেদ ভেতরে প্রবেশ করে, লোকটার পাঁজরের ভিতরে পিছলে যায়। দানবটা নিচু কণ্ঠে একটা ফ্যাসফেসে আওয়াজ করে এবং সামনের দিকে ঝুঁকে আসে। বাবর তার খঞ্জরের ফলা বের করে আনলে রক্ত ছিটকে বেরিয়ে আসে। সে বিস্মিত দৃষ্টিতে হাতাহাতি লড়াইয়ে প্রথম হত্যা করা লোকটার লাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“সুলতান! সাবধান!” ওয়াজির খান একেবারে ঠিক সময়ে হুঁশিয়ার করে দেয়। এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে, বাবর তার ঘাড় লক্ষ্য করে রণকুঠার নামিয়ে আনা অন্য আরেক আক্রমণকারীকে ভীষণভাবে আঘাত করে। সহসা বাবর আবার জানতে পারে ভয় কাকে বলে। কি আহাম্মক সে এভাবে পেছন থেকে তাকে আক্রমণের সুযোগ দিয়েছিলো। মওকা পেয়ে ওয়াজির খান তার নতুন আক্রমণকারীকে লাথি মেরে ভূপাতিত করে এবং বাঁকা তরবারির মোক্ষম কোপ বসিয়ে দিতে, ছাদের উপরে তার ছিন্ন মাথা গড়াতে থাকে।
দ্বিতীয় সুযোগ লাভ করে কৃতজ্ঞ, বাবর, জানে অনেক অনভিজ্ঞ যোদ্ধাই এই সুযোগ লাভে বঞ্চিত হয়, ইতিমধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে, দু হাতে খঞ্জর আর তরবারি প্রস্তুত, কিন্তু চারপাশে তাকাতে দেখে গ্রান্ড উজিরের রক্ষীবাহিনী ইতিমধ্যে হয় খুন হয়েছে নয়তো প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে। সবাই তারা একজন দু’জনের দল করে একে অন্যের উপরে পড়ে রয়েছে বা পাথরের উপরে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে, তাদের একদা উজ্জ্বল পরিকর এখন রক্তে ভেজা। ছিন্নভিন্ন নাড়িভূড়ি আর গড়িয়ে পড়া মলের গন্ধ নাকে বাবর ঝাপটা দেয়।
