সে দেয়াল বেয়ে উঠতে শুরু করে, তার হাত দেয়ালের উপরে হাতড়াতে থাকে, সামান্য বের হয়ে থাকা পাথরের কোণা, এবং চুনের আস্তর খসে পড়ার কারণে দুই পাথরের মাঝে উন্মুক্ত হয়ে উঠা ফাঁক কিংবা রাজমিস্ত্রীদের বাটালির ঘাইয়ের ফলে সৃষ্ট দাগ খুঁজে- যেখানে সে বুড়ো আঙ্গুল কিংবা হাত বা পায়ের কিনারা রাখতে পারে। সে তার ঊর্ধ্বমুখী গতি অব্যাহত রাখে নতুবা সে পড়ে যাবে, এবং প্রতিমুহূর্তে তার হাত নতুন অবলম্বন খুঁজতে থাকে। তৈমূরের রাজমিস্ত্রীরা অসাধারণ কাজ করেছে- হাতের কাজের দক্ষতার কারণেই কি তিনি তাদের সমরকন্দে নিয়ে আসেননি? বড্ড বেশি দক্ষ সম্ভবত, বাবরের ভাবনা সহসা মাটি থেকে বিশ ফিট উপরে একটা ঝকি খায়, যখন তার পা কোনো অবলম্বন ছাড়া শূন্যে ঝুলতে থাকে এবং সে টের পায় কেবল হাতের উপরে ঝুলে থাকার কারণে তার নখ উপরে আসতে চাইছে।
পাথরের মত শুষ্ক আর ধূলোময় মুখে, বাবর কোনো মতে ঝুলে থাকতে চেষ্টা করে, পাগলের মত পা দিয়ে ডানে বামে খুঁজতে থাকে কোনো অবলম্বন পাওয়া যায় কিনা, কিন্তু কেবল মসৃণ পাথরের দেয়ালে তার পা ঘষা খায়। দেহের পুরো ওজন নেবার কারণে তার বাহুদ্বয় প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। তারপরে, যখন তার মনে হতে শুরু করে যে হাত ছেড়ে দিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়াই শ্রেয়, ঠিক তখনই তার ডান পা নরম কিছু একটায় গিয়ে পড়ে শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ঘাসের একটা গোছা, পাথরের ফাটলের গভীরে যার বীজ প্রোথিত। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, বাবর এবার তার ডান পা গোছাটার উপরে রেখে দেখে সেটা ভার নিতে পারে কিনা এবং সেটা তার দেহের ভর কিছুটা সামাল দিলে তার হাতের অসহ্য ব্যাথা কমে আসে।
এক নিমেষের জন্য সে তার চোখ বন্ধ করে। নিজেকে তার ক্ষুদ্র, অরক্ষিত, অসহায়, একটা কীটের মত মনে হয়। কিন্তু সে অন্তত এক মুহূর্তের জন্য বিশ্রাম নিতে পারে। পুনরায় চোখ খুলে, মাথার অবিন্যস্ত চুলের মাঝ দিয়ে তাকিয়ে সে দেখে দেয়ালের শীর্ষদেশ বাড়াবাড়ি ধরণের কাছে সম্ভবত মাথার সাত কি আট ফিট উপরে। সতর্কতার সাথে, অনুসন্ধানী ভঙ্গিতে সে ডান হাত উপরে বাড়িয়ে দেয় এবং মাথার দুই ফিট উপরে বের হয়ে থাকা একটা পাথরের খাঁজ খুঁজে পেতে সে স্বস্তিতে আরেকটু হলে জোরে হেসে উঠত। তারপরে, ডান পা ঘাসের গোছর উপরে রেখে যা তার প্রাণ বাঁচিয়েছে, সে বাম পা ভাঁজ করে এবং উপরের দিকে সেটা রাখার জায়গা পাওয়া যায় কিনা দেখে। পুনরায় সে আরেকটা খাজ খুঁজে পায়- খুব বড় কোনো ফাটল না- সংকীর্ণ একটা খাঁজ, পাথরের গায়ে একটা আড়াআড়ি ফাটল, কিন্তু সেটাই যথেষ্ট। শেষ একটা হেঁচকা টানে, দেয়ালের শীর্ষভাগে সে নিজেকে উপরে টেনে তোলে এবং কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতে থাকে যেন তরবারির ফলা তার আঙ্গুলের উপরে নেমে না আসে।
ছাদের কিনারের প্যারাপেটের উপর দিয়ে টপকে সে নিজেকে দেয়ালের উপরের চওড়া অংশে নিয়ে আসে যেখানের পাথর প্রহরীদের পায়ের ঘষায় মসৃণ হয়ে গিয়েছে। বাবর চারপাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখে যে প্রথম যারা উপরে উঠে এসেছে সে তাদের অন্যতম। সে ভেবেছিল তার অনেক সময় লেগেছে কিন্তু কিছুক্ষণের ভিতরে ওয়াজির খানের নেতৃত্বে তার আরও লোক এসে হাজির হয় এবং দড়ির মই বেয়ে উঠে আসবার কারণে সবাই হাঁসফাঁস করছে।
দেয়ালের নিরাপত্তা রক্ষায় যারা নিয়োজিত ছিল, বোধহয় পালিয়েছে। একপা পিছিয়ে এসে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বাবর পালিয়ে যাওয়া কোনো সৈন্যের একপাশে ফেলে যাওয়া একটা রূপা দিয়ে বাধান ঢালের সাথে হোঁচট খায়। সে ঝুঁকে ঢালটা তুলতে যাবে। কিন্তু পেছন থেকে ভেসে আসা একটা শব্দ শুনে সে ঘুরে তাকায়। দেয়ালের ভিতরের দিকে অবস্থিত একটা আঙ্গিনা থেকে উপরে উঠে আসা একটা সংকীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে সমরকন্দের অপেক্ষাকৃত সাহসী সৈনিকের একটা দল হুড়মুড় করে উপরে উঠে আসছে। বাবর, তাদের উজ্জ্বল সবুজ রঙের পরিকর আর বর্শার মাথায় উড়তে থাকা সবুজ নিশান দেখে ধারণা করে, গ্রান্ড উজিরের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দল। একটা হুঙ্কার দিয়ে, বাবর তাদের দিকে ধেয়ে যায়, জানে যে ওয়াজির খান আর তার লোকেরা তাকে অনুসরণ করবে এবং শপথ, হুঙ্কার, আর এলোপাথাড়ি তরবারি ধারালো যোতের ভিতরে নিজেকে আবিষ্কার করে। দেয়ালের উপরের অংশটা যদিও বেশ চওড়া- সম্ভবত দশ ফিট প্রশস্ত- দু’পাশ থেকে শীঘ্রই টপাটপ মানুষ নিচে আছড়ে পড়তে থাকে। কেউ আহত হয়ে নিচে পড়ে, কাউকে আবার অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ঠেলেই ফেলে দেয়। ঘামের উষ্ণ, নোতা গন্ধ তার নাক প্রায় বন্ধ করে দেয়। সে এরপরে যতদিন বেঁচে থাকবে তার স্মৃতিতে এটা যুদ্ধের ঘ্রাণ হিসাবে বিরাজ করবে।
কাঁচাপাকা লম্বা দাড়ির এক দীর্ঘকায় যোদ্ধা ভীড়ের ভিতরে বাবরকে আলাদা করে, তার হাল্কা দেহকাঠামো আর অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়স লক্ষ্য করে লোকটার মাংসল চোখেমুখে ক্রুদ্ধ বিদ্রুপের হাসি খেলে যায়। ইঁদুর শিকারের আগে বাবর বিড়ালের চোখে মুখে এমন ভাব দেখেছে এবং লোকটার অবজ্ঞা বাবরকে ক্ষেপিয়ে তোলে। ওয়াজির খান অনুরোধ করেছিলে যে বাবর যেন এমন কিছু পরিধান না করে যাতে তাকে ফারগানার সুলতান হিসাবে সনাক্ত করা না যায় কিন্তু এই হোঁকা উদ্ধত শুয়োরটাকে সে আজ তার জাত চিনিয়ে দেবে।
