গলিটা এবার ডান দিকে আরেকটা তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়েছে, এবং তারপরে সহসাই শেষ হয়েছে। চারপাশে আধো-অন্ধকারে তাকিয়ে বাবর দেখে সে একটা প্রাঙ্গনের মত জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, যার একদিকে, ঠিক তার উল্টোপাশে, তৈমূরের দূর্গপ্রাসাদের উঁচু দেয়াল। গতবারের অভিযানের স্মৃতি আর তার পর্যবেক্ষণ করা পরিকল্পনার কথা স্মরণ করে, সে বুঝতে পারে তারা নিশ্চয়ই দক্ষিণ দিকে এসে পৌঁছেছে। হ্যাঁ, কয়েক’শ গজ সামনে দেয়ালের ভিতরে, পূর্বদিকে বিস্তৃত কোক সরাইয়ের তীক্ষ্ণ দাঁতের মত প্রাচীরের বেষ্টনী দেয়া দূর্গপ্রাসাদ সে দেখতে পায়। বাইসানগার তাদের ভালই পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। আরও খুশির কথা বাবর ঠিক তার মাথার উপরের দেয়ালে কোনো প্রহরী দেখতে পায় না। সম্ভবত তারা কল্পনাও করেনি শত্রু এখান দিয়ে বেয়ে উপরে উঠতে পারে।
যাই হোক, বাইসানগার আর ওয়াজির খানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বাবর দ্রুত আঙ্গিনাটা অতিক্রম করে এবং দূর্গপ্রাসাদের দেয়ালে গায়ে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে দাঁড়ায়। গলিপথে তার লোকেরা এসে উপস্থিত হলে সে ইশারায় তাদেরও একইভাবে দাঁড়াতে বলে। কোনো ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্বে না ভুগে তারা তার আদেশ পালন করে। বাইসানগার নিচু স্বরে কিছু একটা বলতে, কালো আলখাল্লা পরিহিত, গম্বুজাকৃতি শিরোস্ত্রাণ মাথায় দেয়া ছায়ামূর্তির দল আঙ্গিনার পশ্চিমদিকের কোণায় অবস্থিত ভাপ উঠতে থাকা আবর্জনার স্তূপের আড়াল ছেড়ে বের হয়ে আসে। বাইসানগারের সৈন্যদল। তারা এসে নিরবে তাদের সেনাপতিকে ঘিরে দাঁড়ায়।
“সুলতান, সামনের বাঁকের মুখে একটা বন্ধ করে দেয়া তোরণদ্বারের কাছে দূর্গপ্রাসাদের দেয়ালের উচ্চতা সবচেয়ে কম,” বাইসানগার ফিসফিস করে বলে। “আর আমরা সেখান দিয়েই ভিতরে প্রবেশ করবো। আমার লোকেরা মই নিয়ে এসেছে এবং আমি আমার তীরন্দাজদের বলবো নিরাপত্তার আড়াল দিতে।” বাবর আর ওয়াজির খান সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ে। দেয়ালের গায়ের সাথে প্রায় মিশে গিয়ে এবং বাইসানগারের নেতৃত্বে আক্রমণকারী দলটা দূর্গপ্রাসাদের দেয়ালের কোণার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়। সতর্কতার সাথে বাইসানগার একবার চারপাশে তাকিয়ে দেখে এবং তারপরে পেছনে সরে এসে বাবর আর ওয়াজির খানকে ইঙ্গিত করে দেখতে।
দ্রুত একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে তারা সবাই নিশ্চিত হয় যে সবকিছু ঠিক আছে। তোরণদ্বারটা এখান থেকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরে। সহসা এই উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠা বাবরের কাছে অসহ্য মনে হতে থাকে। ওয়াজির খানের আগলে রাখা বাহুর বেষ্টনী থেকে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, সে চিৎকার করে তার লোকদের অনুসরণ করতে বলে, তোরণদ্বার লক্ষ্য করে দৌড়াতে শুরু করে। দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকার কথা সে বেমালুম ভুলে যায় এবং সাথে সাথে সে তীরের বাতাস কেটে এগিয়ে যাবার হুশ শব্দ শুনতে পায় তারপরেই আরেকটা, কোনো। সন্দেহ নেই তার মাতালের মত চিৎকার শুনে তীরন্দাজের দল দূর্গের ছাদের। বেষ্টনীর পিছনে এসে হাজির হয়েছে। একটা লম্বা শরযষ্টি বিশিষ্ট তীর তার গালে আঁচড় কেটে যায় পেছনের ভূমিতে গেঁথে যাবার পূর্বে। তীব্র জ্বালার প্রতি সে ভ্রূক্ষেপ করে না। মুহূর্তের উল্লাস ছাড়া আর কিছুই সে অনুভব করে না। সে তোরণদ্বারের দিকে দৌড়ে যায়। কোনমতে অক্ষত দেহে সে সেখানে পৌঁছে, যে পাথর দিয়ে তোরণদ্বার আটকানো সেটার সাথে নিজেকে প্রায় মিশিয়ে দেয়, আশা করে মাথার উপরে ঝুলন্ত সরদল তাকে কিছুটা হলেও আড়াল দেবে। চারপাশে তাকিয়ে সে তার পাশের পাথরের চৌকাঠে একটা গুটিসুটি মেরে থাকা বাঘ খোদাই করা দেখতে পায়, সমরকন্দের শাহী প্রতীক, কান দুটো মাথার সাথে লাগানো আর মুখটা ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে বাঁকানো রয়েছে।
বাইসানগারের তীরন্দাজের দল এখন অবস্থান নিয়ে, দেয়ালের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা রক্ষীদের সমুচিত জবাব দিয়ে চলেছে। বাবর টের পায় কপালের উপর থেকে উষ্ণ তরলের একটা ধারা গড়িয়ে চোখে এসে পড়ছে। আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করে সে টের পায় জিনিসটা রক্ত কিন্তু তার নিজের না। উপরের দিকে তাকিয়ে সে দেখে গলায় শরবিদ্ধ এক সৈন্য দেয়ালের উপরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। হাত উঁচু করে সে লোকটার শরবিদ্ধ জায়গাটা স্পর্শ করতে, সে তাল হারিয়ে ফেলে। মুহূর্ত পরে, বাবরের পায়ের কাছে একটা ভোতা শব্দ করে লোকটার দেহ আছড়ে পড়ে। রক্ত আর শ্লেষ্ম ছিটকে, হতভাগ্য লোকটা কুঁকড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ ছটফট করে এবং তারপরে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া কালো রক্তের মাঝে তার দেহটা নিথর হয়ে যায়।
বাইসানগারের লোকের এখন দেয়ালের গায়ে লম্বা লম্বা কাঠের মই স্থাপন করছে। কাঠের ধাপের দু’পাশে চামড়ার ফালি আটকে মইগুলো তৈরি করা হয়েছে বটে কিন্তু দারুণ কার্যকর মইগুলো। তাদের লোকেরা ইতিমধ্যে মই বেয়ে উঠতে শুরু করেছে, তারা একহাতে কাঠের ডাসা ধরে অন্য হাতে মাথার উপরে ঢাল ধরে রেখেছে উপর থেকে ছোঁড়া তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে।
বাবরের হৃৎপিণ্ড এখনও দুরন্ত গতিতে স্পন্দিত হচ্ছে এবং সে দ্রুত কিছু একটা করতে মরিয়া হয়ে উঠে। সে চারপাশে তাকায় উপরে উঠার অন্য কোনো পথ খোঁজে। তোরণদ্বার ভাঙার কোনো সুযোগ নেই। প্রথম দৃষ্টিতে, পাথরের দেয়াল। মসৃণ দেখায়, প্রতিটা পাথর নিখুঁতভাবে জোড়া দেয়া। ফারগানার বুনো পাহাড় আর দরীতে সে খামোখাই বেড়ে উঠেনি, বাবর নিজেই নিজেকে বলে। ভাল করে তাকাতে সে পাথরের দেয়ালে অনেক ফাটল আর চিড় দেখতে পায় যেখানে হাত। আর পা দিয়ে তার মত হাল্কা পাতলা একজন বেয়ে উঠতে পারবে। তার মরহুম। আব্বাজানের মূল্যবান তরবারি পিঠে ঝুলিয়ে, বাবর গভীর একটা শ্বাস নেয়। শেষবারের মত চারপাশে তাকাতে সে দেখে ওয়াজির খান তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তাকে রীতিমত উদ্বিগ্ন দেখায়। বাবর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় এবং দেয়ালের পাদদেশ দিয়ে দৌড়ে যাবার সময়ে তাকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া তীর ফাঁকি দিয়ে মইয়ের কাছ থেকে দূরে সরে যায়।
