বাবর নিজেকে শান্ত করে চিন্তা করতে থাকে। তার সামনে এখন কি পথ খোলা রয়েছে? কিন্তু মনে মনে সে জানে তার সামনে এই একটাই পথ রয়েছে। তাদের এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এমন কি এখন, জ্বলন্ত তীরের বাঁকান গতিপথের মাধ্যমে যা সূচীত হয়েছে, বাছাই করা চার’শ যোদ্ধার দল ইতিমধ্যে তার তিন রাত আগের যাত্রাপথ পুনরায় অনুসরণ করে স্যাঁতস্যাঁতে সংকীর্ণ সুড়ঙ্গে নেমেছে, যা তাদের শহরের ভেতরে নিয়ে যাবে। সে তাদের পরিত্যাগ করবে না। যাই ঘটুক না কেন, সে তার লোকদের নেতৃত্ব দিয়ে তোরণ আক্রমণ করবেই।
তার মন যখন এসব বিক্ষিপ্ত ভাবনার দোলাচালে আচ্ছন্ন, বাবর তোরণদ্বারের ডান পাশের দেয়ালের উপরে হাতে মশাল ধরা একটা ছায়ামূর্তি দেখতে পায়। যেটা ইচ্ছাকৃতভাবে সে এপাশওপাশ দোলাতে থাকে। একই সাথে বাবর আশেপাশে কোথাও বিশাল একটা পুলির ঘুরতে শুরু করার কর্কশ খরখর আওয়াজ শুনতে পায়। লোহার গ্রীলটা প্রথমে কেঁপে উঠে, তারপরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেন উপরে উঠতে শুরু করে। ওয়াজির খানের দিকে তাকিয়ে সে বিজয়ীর একটা হাসি দেয়, তারপরে আক্রমণের জন্য পূর্ব নির্ধারিত সংকেত চাপা স্বরে বলে উঠে। তার লোকেরা সংকেতটা পুনরাবৃত্তি করতে সে একটা চাপা গমগমে আওয়াজ শুনতে পায়। সংকেতটার কোমল আবেদন, থিতিয়ে আসতে নিজের ভেতরে সে একটা উদ্দীপনা টের পায় যা তাকে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে।
ডান হাতে তার মরহুম আব্বাজানের তরবারি, বাম হাতে খঞ্জর নিয়ে বাবর তোরণদ্বারের বাকি পথটুকু দৌড়ে অতিক্রম করে। লোহার গ্রীল ইতিমধ্যে এক তৃতীয়াংশ উঠে এসেছে। তার লোকেরা তাকে ঘিরে ধরতে গ্রীলের নিচের তীক্ষ্ণ শলাকার খোঁচা থেকে বাঁচতে সে নিজেকে গুটিয়ে একটা বলের মত করে এবং নীচ দিয়ে গড়িয়ে আসে। কুণ্ডলাকৃতি থেকে মুক্ত হয়ে সে লাফিয়ে পায়ের উপরে উঠে দাঁড়ায় এবং অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে, বাতাস কেটে মৃত্যু মুখে নিয়ে ছুটে আসা তীরের অমোঘ শব্দ বা অন্ধাকারে হুল্লোড় তুলে ডিগবাজি দিয়ে ধেয়ে আসা কুঠারের সামান্যতম আভাসের জন্য তার প্রতিটা ইন্দ্রিয় টানটান হয়ে রয়েছে। কিন্তু তোরণদ্বারের উপরের প্রকোষ্ঠ থেকে পাথরের সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে আসা পায়ের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। বাইসানগার এগিয়ে আসে, মুখের অভিব্যক্তি ভাবলেশহীন। “স্বাগতম। আমি আমার কথা রেখেছি।” সে বাবরের সামনে এসে নতজানু হয়। “আমাদের দ্রুত যা করার করতে হবে। গুপ্তচরের দল সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে- এমন কি এখনও হয়ত কেউ আমাদের দেখছে এবং যেকোন মুহূর্তে পাগলাঘন্টি বেজে উঠতে পারে। আমার বিশজন লোক এই তোরণের পাহারায় রয়েছে আর বাকিরা কোক সরাইয়ের নিকটে অপেক্ষা করছে।” শহরের দিকে এগিয়ে যাওয়া একটা অন্ধকার গলির দিকে ইশারা করে সে দেখায়। “আমার সঙ্গে আসুন।”
বাইসানগারের কথা শেষ হতে, সামনে, নগর প্রাকারের অভ্যন্তরে কোক সরাইয়ের ছাদে অন্ধকার বিদীর্ণ করে সহসা কমলা রঙের আলোর আভা দেখা যায়- মশাল। তাদের উপস্থিতির খবর সেনাছাউনিতে পৌঁছে গেছে। শিঙার গগনবিদারী আর্তনাদ এবং কর্কশ স্বরে সেনাপতিদের নিজ নিজ লোককে ডাকার শব্দ ভেসে আসতে বোঝা যায় যে বিপক্ষকে চমকে দেবার সুযোগ তারা হারিয়েছে। বাবর ইতস্তত করে না। তরবারি উপরে তুলে গায়ের পুরোটা শক্তি ব্যবহার করে সে তার লোকদের রণহুঙ্কার দেয়- “ফারগানা।” তার কানের পর্দা দপদপ করে, সে সামনের দিকে। ধেয়ে যায়।
গলিটার দুপাশে লম্বা, উঁচু, মাটির ইটের সারিবদ্ধ বাসা যার দরজা নিশ্চিতভাবেই ভেতর থেকে বন্ধ। বাবর এক মুহূর্তের জন্য দরজাগুলোর পেছনে জড়সড় হয়ে বসবাসকারী পরিবারগুলোর কথা ভাবে, যারা দোয়া করছে যেন এই ঝড় শীঘ্রই শেষ হয়। তাদের জানবার কথা না যে সাধারণ নাগরিকদের হত্যা বা লুট করার উপরে সে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তার শত্রুদের অবশ্যই উপযুক্ত মূল্য দিতে হবে, নিরীহ লোকদের রক্তে স্নান করে সে সমরকন্দে তার শাসনকাল শুরু করতে চায় না।
“সুলতান, এই পথে।” বাইসানগার বাবরের বাহু আঁকড়ে ধরে এবং হেঁচকা টানে বামদিকে বাঁক নেয়া একটা সরু গলিতে তাকে নিয়ে আসে। হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে বাবর টলে উঠে এবং আরেকটু হলেই সে আছাড় খেতো। মুহূর্তের জন্য সে তার পেছনে ওয়াজির খানের দিকে তাকায়। গলিটার দুপাশে উঁচু দেয়াল আর ভীষণ সংকীর্ণ। পাশাপাশি একজন বড়জোর দুজন লোক এগিয়ে যেতে পারবে- অতর্কিত আক্রমণের জন্য আদর্শ স্থান। গাঢ় অন্ধকারের ওপাশে তাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে?
“দূর্গে পৌঁছাবার এটা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ।” বাইসানগারের কণ্ঠ তীক্ষ্ণ আর তাতে আর্তি ঝরে পড়ে।
বাবর চোখ সরু করে তার দিকে তাকায়। সে জানে যে তার বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তার লোকেরা এখন তার মাঝে একজন নেতাকে দেখতে চাইছে। এখন ইতস্তত করার কোনো অবকাশ নেই, যখন শত্রুর কণ্ঠস্বর প্রতি মুহূর্তে তাদের দিকে। এগিয়ে আসছে। সে বাইসানগারকে বিশ্বাস করে, যা তাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ওয়াজির খানকে পাশে নিয়ে সে তার লোকদের বলে অনুসরণ করতে এবং ঘুরে দাঁড়িয়ে বাইসানগারের পেছন পেছন গলিতে প্রবেশ করে। বাবর বিস্মিত হয় যে শহর দখলের লড়াই শুরু হতে তার ভিতরের ভয় কোথায় যেন উবে গেছে এখন সেখানে কেবল উত্তেজিত উল্লাস বিরাজ করছে। সব যুদ্ধেই কি একই অনুভূতি হয়? সহসা, পূর্বদিকে খানিকটা দূর থেকে, সে একটা জোরাল হুঙ্কার ভেসে আসতে। তার লোকেরা নিশ্চয়ই সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে এসেছে এবং এখন শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তারা গ্রান্ড উজিরের অনুগত সেনাবাহিনীকে ব্যস্ত রাখবে।
