বাবর আর তার লোকেরা, নহরের কিনারের আগাছা আর উইলোর আড়ালের পুরো সদ্ব্যবহার করে কোনো ধরণের অবাঞ্ছিত শব্দের জন্ম না দিয়ে তোরণদ্বারের খুব কাছাকাছি জায়গায় পৌঁছে যায়। ওয়াজির খানের সাথে সংক্ষিপ্ত পরামর্শ করে নিয়ে, বাবর চাঁদ মাথার উপরে উঠে না আসা পর্যন্ত তার লোকদের ঝোপঝাড়ের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকার আদেশ দেয়- তোরণদ্বার খুলে দেবার ব্যাপারে বাইসানগারের সাথে তার সেরকমই কথা হয়েছে।
***
অস্বস্তি দূর করতে বাবর একটু নড়ে উঠে। কিন্তু ব্যাপারটা কঠিন। মশার ঝাঁক তাকে এখনও ছেকে ধরে আছে। আর না চুলকে কামড়ের জায়গা থাকতে পারছে না। আসনপিড়ি হয়ে বসে থাকায় তার কাপড়ে কাদা লেগেছে এবং নড়লেই নিচে থেকে প্যাঁচপেচে শব্দ ভেসে আসে, কিন্তু ঘন আগাছার কারণে জায়গাটা বেশ ভাল আড়াল তৈরি করেছে। সে যদি, ঠিক তার মাথার উপরের চারকোণা আকাশের তারা আর চাঁদের আবর্তন দেখে, ঠিকমত সময় আন্দাজ করে থাকে, তাহলে এখানে থানা নেয়ার পরে নব্বই মিনিট অতিবাহিত হয়েছে।
সে যেখানে গুঁড়ি দিয়ে আত্মগোপন করে রয়েছে, সেখান থেকে অবশ্য আশেপাশের এলাকা আর আকাশের এমন বেশি কিছু অংশ দেখা যায় না, যার ফলে সে চাঁদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে। তাকে নিশ্চিতভাবে জানতে হবে আরও কতক্ষণ তাদের এখানে অপেক্ষা করতে হবে। ওয়াজির খানের পিতৃব্যসুলভ উপদেশ অমান্য করে, যে অন্য আর সবার মত তারও মাথা নিচু করে রেখে, সময়ের হিসাবের ভার তার নিজস্ব আরও অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার উপরে ছেড়ে দেয়া উচিত, বাবর মাথা উঁচু করে। আগাছার আড়াল থেকে ভাল করে দেখার জন্য উঁকি দিতে, ওয়াজির খানের পরামর্শে পরিধান করা ইস্পাতের জালিকা দেয়া জ্যাকেট, যেটা তার দেহের মাপের চেয়ে অনেক বড়, কুঁচকে গিয়ে তার বাহুর নিচে বোগলের কাছে খোঁচা দেয়। অসহিষ্ণুভাবে বাবর টানাহেঁচড়া শুরু করে, আলখাল্লার নিচে হাত দেয় এবং চেষ্টা করে কুঁচকে যাওয়া ইস্পাতের জ্যাকেট সোজা করতে। কিন্তু সে বিষয়টা আরও জটিল করে তোলে।
তার ঠিক মুখের সামনে, আগাছার আড়াল থেকে একজোড়া বুনো হাঁস আর্তস্বরে ডানা ঝাঁপটে উঠে। বর্ম ঠিক করতে গিয়ে তার মাত্রাতিরিক্ত নড়াচড়ায় বোধহয় বেচারারা আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বিব্রতভঙ্গিতে সে আবার মাথা নিচু করে, কিন্তু আগাছার আড়ালে মাথা নিচু করতে সে তার কয়েক ফিট দূরে পায়ের আওয়াজ শোনে যা দ্রুত কাছে এগিয়ে আসছে। যদিও যুক্তি তাকে বলে যে সেটা তারই কোনো লোকের পায়ের আওয়াজ, কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে তার মরহুম আব্বাজানের ঈগলের মাথার বাঁটযুক্ত আলমগীর আঁকড়ে ধরে। লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বাঁচাতে লড়তে প্রস্তুত। শব্দটা আরও বাড়তে এবার ওয়াজির খানের কাদামাখা মুখ আগাছার আড়াল থেকে উঁকি দেয়, পেটের উপরে ভর দিয়ে কনুইয়ের সাহায্যে অনেকটা বাইম মাছের মত এঁকেবেঁকে তার দিকে এগিয়ে আসছে। বাবর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবং সেই সাথে কোনো একটা অদ্ভুত কারণে তার মনে হয় যে পিঠে ঢাল আটকানো এবং প্রায় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকার কারণে ওয়াজির খানকে বেঢপ আকৃতির কচ্ছপের মত দেখাচ্ছে।
“সুলতান, সময় হয়েছে। আমি কি সংকেত দিতে আদেশ দেব।”
কোনমতে হাসি চেপে বাবর মাথা নাড়ে।
ওয়াজির খান যেভাবে এসেছিল সেভাবেই মাথা নিচু করে পিছলে পেছনে সরে যায়। মুহূর্ত পরে, তার আদেশে, রাতের নির্মেঘ আকাশে একটা জ্বলন্ত তীর বিশাল বৃত্তচাপ তৈরি করে আকাশে উঠে আসে, ধূমকেতুর মত জ্বলছে তার জ্বলন্ত পুচ্ছ। আগাছার ভিতরে এবার বাবর উঠে দাঁড়ালে তার পেট গুলিয়ে উঠে এবং উত্তেজনা আর আশঙ্কায় তার পা কাঁপছে টের পায়। তার লোকেরা তার চারপাশে, আড়াল ছেড়ে একে একে উঠে দাঁড়াতে থাকে।
ওয়াজির খানও তার পাশে এসে দাঁড়ায়। “আমরা শীঘ্রই জানতে পারব বাইসিনগার এক কথার মানুষ কিনা।”
“সে তার কথা রাখবে।” বাবর সে ব্যাপারে নিশ্চিত কিন্তু পোড় খাওয়া ওয়াজির খানের মনের সংশয় দূর হয় না, উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন যে তরুণ অনভিজ্ঞ বাবর হয়ত প্রতারিত হয়েছেন।
বাবর আর ওয়াজির খানকে সামনে রেখে, তাদের যোদ্ধারা আগাছার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে এবং আক্রমণাত্মক বিন্যাসে সজ্জিত হয় আর জলাভূমির উপর দিয়ে দ্রুত চারহাররাহা তোরণদ্বারের দিকে এগিয়ে যায়, তাদের পায়ের চামড়ার নাগরা মাঝেমধ্যেই কাদায় আটকে যায় এবং সবাই শান্ত ভঙ্গিতে শ্বাস নেয়। তারা আরও এগিয়ে যেতে বাবর দেখে সুউচ্চ সবুজাভ-নীল তোরণ বা পুঁইপ্রস্তুতকারকদের তোরণের তুলনায় সেটা অনেক ছোট। তোরণদ্বারের দু’পাশে শক্তপোক্ত পাথরের যেনতেনভাবে তৈরি করা বুরুজ নির্মানের সময় দর্শনীয়তার চেয়ে উদ্দেশ্যের বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এবং বাবর এখান থেকেই তোরণদ্বারের ভারী লোহার গ্রিল দেখতে পায়, যা শহরে প্রবেশের সংকীর্ণ গলিপথটা সুরক্ষিত করে রেখেছে। তার মনে হয় ফোকলা দাঁতের কেউ তার দিকে মুখব্যাদান করে হাসছে।
সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ে কিনা দেখতে বাবর চোখ পিটপিট করে চারপাশে তাকালে বুঝতে পারে কোথাও কিছু নড়ছে না- এমন কি তোরণদ্বারের উপরের প্রকোষ্ঠ যেখান থেকে বাইসানগার কপিকল দিয়ে গ্রিল তোলার আদেশ দেবে সেখানেও কোনো আলো জ্বলছে না। কোনো কিছু না ঘটলে সে কি করবে? হয়ত পুরোটাই একটা নির্মম ছলনা। বা এটাও হতে পারে পুরো পরিকল্পনাই ফাঁস হয়ে গিয়েছে আর বাইসানগার এখন কোনো অন্ধকার কুঠরিতে নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে তাদের পায়তারা যন্ত্রণাক্লিষ্ট কণ্ঠে বয়ান করছে।
