বাবরের মুখ এতটাই শুকিয়ে আছে যে সে কথা বলতে পারে না এবং সে নিচের দিকে তাকায়। সে যা দেখে তা দেখে আবার ঢোক গিলে। বাম হাত দিয়ে বাইসিনগার যদিও তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে, তার ডান হাত শক্ত হয়ে তার পাশে কাঠের দণ্ডের মত ঝুলছে।
বাইসিনগার তার দৃষ্টি অনুসরণ করে। “আপনার চাচার শেষ নির্দেশ পালন করে তৈমূরের আংটি পৌঁছে দেবার শাস্তি। আমি ভাগ্যবান যে এখনও মাথাটা আস্ত আছে, কারণ সমরকন্দের নিরাপত্তার জন্য গ্রান্ড উজিরের আমাকে দরকার আছে।” সে নিজের হৃৎপিণ্ডের গতি প্রশমিত করে এবং চারপাশে তাকিয়ে পালাবার সম্ভাবনা বিচার করতে গেলে হতাশায় দমে যায় যখন দেখে একদল সৈন্য তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা নিশ্চয় অবাক হচ্ছে তাদের দলপতিকে একটা ময়লা পোশাক পরিহিত কৃষক বালকের সাথে কথা বলতে দেখে। সে এখন যদি পালাতে চেষ্টা করে তবে তারা তাকে এক নিমেষে ধরে ফেলবে। “এখন কি করবে?” সে অবশেষে কথা বলে।
“ব্যাপারটা খুব সাধারণ। আমি যদি আপনাকে গ্রান্ড উজিরের কাছে ধরিয়ে দেই তবে আমার কপাল ফিরে যাবে। বিলাসবহুল প্রাসাদে, যেখানে ঝর্ণা থেকে গোলাপজল প্রবাহিত হচ্ছে আর সুন্দরী দাসীরা আমার সব ইচ্ছা পালনের জন্য মুখিয়ে রয়েছে, আমি অনায়াসে নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে পারব।” বাইসিনগারের চোখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। “জীবন অনেক বেশি জটিল। আপনার মরহুম চাচা একজন ভাল শাসক ছিলেন এবং তার শেষ আদেশ যে কোনো মূল্যে পালনের জন্য আমাকে কতৃত্ব দিয়েছিলেন। উজির আমার সম্মান আর অহংকারে আঘাত করেছে। তাকে আমার হাতে তুলে দেবার প্রতিশ্রুতি যদি আপনি আমাকে দেন, তবে আমি আপনার হাতে সমরকন্দ তুলে দেব।”
বাবরের চোখ ঝলসে উঠে। “আমি তোমাকে কথা দিলাম। তৈমূরের রক্ত ধমনীতে বইছে এমন একজন সুলতান তোমাকে কথা দিচ্ছে।”
“আমার সুলতান।” তাদের দিকে যারা তাকিয়ে রয়েছে সবার চোখ এড়িয়ে বোঝা যায় কি যায় না এমন ভঙ্গিতে বাইসিনগার বশ্যতা স্বীকার করে মাথা নত করে।
১.৫ কোক সরাই
০৫. কোক সরাই
সন্ধ্যা নেমে আসতে, ওয়াজির খানকে পাশে নিয়ে বাবর, তার সেনাবাহিনীর তুঙ্গস্পর্শী উত্তেজনায় শিহরিত হতে থাকা একটা দলের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করে, ভরপেট খেয়ে তরবারিতে শান দিয়ে আর পিঠে চামড়ার তৈরি ঢাল বেঁধে যারা পায়ে হেঁটে প্রধান ছাউনি থেকে রওয়ানা দেবার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। প্রথমে তারা তিন রাত আগে নহরের কিনারা ধরে বাবরের অনুসৃত পথ অনুসরণ করবে, কিন্তু তারপরে চাহাররাহা তোরণদ্বার দিয়ে সমরকন্দে প্রবেশের জন্য সংকেতের অপেক্ষায় লুকিয়ে অপেক্ষা করবে, শহরে প্রবেশের এই তোরণদ্বারের পাহারায় নিয়োজিত আছে বাইসিনগার, আর সে বাবরকে সেটা খুলে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
“আমার সাথী-যোদ্ধারা, আজ রাতে আমরা আমাদের নিয়তির মুখোমুখি হব। এসো আমরা যোদ্ধার আত্মায় বলীয়ান হয়ে হৃদয়ের সবটুকু সাহস জড়ো করি- লড়াই করার শারীরিক সাহস কেবল না, আমি জানি সেটা তোমাদের ভালই আছে, বরং নহর ধরে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আমাদের জন্য আক্রমণের সংকেত না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈৰ্য্য যেন তোমাদের থাকে। আমরা প্রত্যেকেই তার সহযোদ্ধার বাঁচা-মরার দায়িত্ব বহন করছি। নিজের অবস্থান থেকে আমাদের ভিতরে একজনও যদি পিছিয়ে আসে- অনিচ্ছাসত্ত্বেও বা অসহিষ্ণুতার জন্য- জেনে রেখো, সে আমাদের সবার সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমার বয়স কম হতে পারে, আমি জানি আমি আমার ভূমিকা ঠিকমতই পালন করবো। তোমরা কি আমাকে। প্রতিশ্রুতি দেবে যে তোমাদের দায়িত্বও তোমরা ঠিকমত পালন করবে?”
সমস্বরে সবাই একসাথে চিৎকার করে বলে উঠে “হাঁ, সুলতান।”
সময় আর নষ্ট না করে বাবর অগ্রবর্তী দলটাকে যাত্রা করবার আদেশ দেয়। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুটো সারি তৈরি করে নহরের পাশ দিয়ে তারা কুয়াশার ভিতরে হারিয়ে যায়। পানির যতটা কাছে সম্ভব থেকে, তীরের উইলো গাছে ডালপালা আর ঝোপঝাড়ের সামান্য আড়ালের পুরোটা সদ্ব্যবহার করে তারা এগিয়ে যায়। নিরবে এভাবে পনের মিনিট এগিয়ে যাবার পরে সহসা, সামনের কাতারের সৈন্যদের ভেতরে কেউ সামান্য কেশে উঠে। বাবরের কানে প্রহরী কুকুরের হুঙ্কারের মত জোরাল শোনায় হচিটা। অবশ্য সমরকন্দের দিক থেকে কোনো ধরণের নড়াচড়ার আওয়াজ পাওয়া যায় না। বাবর আবারও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারপরেই সৈন্যটা আবার কেশে উঠে, এবার মনে হয় আগের চেয়েও জোরে এবং মনে হয় অনন্তকাল ধরে কাশতে থাকতে যা আদতে এক মিনিটেরও অনেক কম। এখনও মশার ভনভন আওয়াজ ছাড়া আর কিছুর শব্দ পাওয়া যায় না, অন্ধকারে প্রতিটা মানুষের উন্মুক্ত ত্বকে তারা মহানন্দে কামড়াতে শুরু করেছে।
“সুলতান, আমি তাকে ফেরত পাঠাব,” ওয়াজির খান ফিসফিস করে তাকে বলে। “বাঁচলাম।”
মূল ছাউনি থেকে রওয়ানা দেবার দুই ঘণ্টা পরে, বাবর সঁইপ্রস্তুতকারকদের তোরণদ্বারের কাছের সেই স্থানটা চিনতে পারে, যেখান থেকে সমরকন্দে রেকী করার অভিপ্রায়ে গোপন সুড়ঙ্গের উদ্দেশ্যে সে উঠে গিয়েছিল। আজ রাতে অবশ্য সে তার লোকদের নিয়ে নহরের কিনারা ধরে সামনে এগিয়ে যায়। জ্যোৎস্নার আলোয় প্রসন্ন চিত্তে বয়ে যাওয়া স্রোতস্বিনী আরও একবার তার বন্ধুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যখন উত্তরদিকে বাঁক নিয়ে সেটা চারহাররাহা তোরণদ্বারের মাত্র দুইশ গজ দূর দিয়ে বয়ে গিয়েছে দেখা যায়।
